logo
5 : 03 : 25 AM
news image

লালপুরের ময়না রক্তাক্ত আম্রকানন ২৫নং রেজিমেন্ট ধ্বংস

ইমাম হাসান মুক্তি, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি।।
৩০ মার্চ নাটোরের লালপুরের ময়নার আম্রকানন যুদ্ধ দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সম্মুখ যুদ্ধে সাঁওতাল তীরন্দাজসহ ৪০জন বাঙ্গালি শহীদ হন। মুক্তিপাগল জনতা, ইপিআর ও আনসার বাহিনীর হাতে পর্যুদস্তু হয়ে ২৫ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ধ্বংস হয়। যার মাধ্যমে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে জনযুদ্ধে প্রথম বিজয় অর্জিত হয়।
২১ মার্চ ২০২১ সরেজমিন ময়নার আম্রকানন যুদ্ধ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ময়নার প্রান্তরে অবহেলার ছাপ। শহীদ স্মৃতিসৌধের ৫শতাংক জায়গার আশেপাশে আবর্জনার স্তুপ। সংগ্রহশালা ও পাঠাগারের জন্য নির্ধারিত ২শতাংশ জমিতে অবকাঠামো না হওয়ায় বান (মাচা) দিয়ে লাউগাছের চাষ হচ্ছে। কালের সাক্ষী বুলেটবিদ্ধ আমগাছটি মৃতপ্রায় বেঁচে আছে। সাতজন শহীদের গণকবর অরক্ষিত জঙ্গলে পরিণত হয়ে আছে। দেখে মনে হয়েছে, যাদের জন্য আজ আমরা স্বাধীন তাদের স্মৃতিগুলোকে আমরা কতই না অবহেলার সাথে দেখি। জাতির বীর সন্তানদের প্রতি এই আমাদের সম্মান!
২৫ মার্চ ১৯৭১ কালরাতে দেশব্যাপি গণহত্যার নীলনকশার অংশ হিসেবে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট রাজশাহী শহরে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। রাজশাহীতে অবস্থানরত লালপুরের আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট বীরেন সরকার, শিল্প ব্যাংকের ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান এবং জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত সদস্য মো. নাজমুল হক সরকারসহ (চারঘাট-লালপুর-বাগাতিপাড়া-বড়াইগ্রাম) অনেকে শহীদ হন এই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। একই সময়ে পাবনায় খানসেনারা গণহত্যা চালায়। এই হত্যাযজ্ঞ মুক্তিকামী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। ২৭ মার্চ পাবনায় মুক্তিবাহিনী ও জনতার প্রতিরোধে ৮০জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ১৮জন আহত হয়। পাবনার সশস্ত্র গণবিদ্রোহ এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চরম দুরাবস্থার খবর ওয়ারলেসে পৌছে যায় রাজশাহীতে ২৫পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শাফকাত এবং ডেপুটি কমান্ডিং অফিসার মেজর রাজা আসলামের কাছে। ২৮ মার্চ সকালে মেজর রাজা আসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পাবনায় আক্রান্ত অবশিষ্ট সৈন্যদের উদ্ধার করে রাজশাহীতে নিয়ে আসার জন্য। অবস্থা বেগতিক দেখে মেজর রাজা আসলাম ২৯ মার্চ প্রায় ৪০জন সেনা নিয়ে রাজশাহীর দিকে রওনা দেন। কিন্তু নাটোরে ছাত্র-জনতার রাস্তা প্রতিরোধের সংবাদ পেয়ে তারা ঈশ্বরদী অভিমুখে যাত্রা করেন। দাশুড়িয়াতে পৌঁছলে জনতার চরম বাধার সম্মুখীন হয়ে উত্তর দিকে গ্রামের রাস্তা দিয়ে গোয়ালবাথান হয়ে মুলাডুলি গোডাউনের পূর্ব পার্শ্ব দিয়ে পুনরায় রাজশাহী মহসড়কে ওঠেন। পাকবাহিনীর আগমনের বার্তা পেয়ে আগেই বীর বাঙালি অসংখ্য গাছ কেটে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। নিরুপায় হয়ে খানসেনারা পাকা সড়কের পশ্চিমে পূণরায় কাঁচা রাস্তায় প্রবেশ করে। লালপুরের মাঝগ্রাম রেলগেট (ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ) পার হয়ে টিটিয়া, সুন্দরবাড়িয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে চাঁদপুর (কদিমচিলান ইউনিয়ন) পৌঁছায়। সেখান থেকে আনুমানিক ভোর সাড়ে ৫ টার সময় লালপুরগামী মনির উদ্দিন আকন্দ সড়ক হয়ে গোপালপুরের দিকে রওনা করে। হানাদারদের গোপালপুর পৌঁছার পূর্বেই জনতা তাদের আগমনের বার্তা পেয়ে রেল লাইনে ওয়াগন দ্বারা ব্যারিকেড দেয়। এই প্রতিরোধের মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন, অব্দুল গফ্ফার খান, আখতার মিয়া, আমজাদ হোসেন নান্নু, মসলেম উদ্দিন (আনসার কমাণ্ডার) প্রমুখ। সুগার মিলের ১৭জন আনসার এই প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দেন। হানাদারদের কনভয়ে ছিল দুটি পিকআপ, চারটি জিপ ও দুটি ট্রাক। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং পূণরায় আকন্দ সড়ক অনুসরন করে। এ সময় আকন্দ সড়কের দুই পার্শ্বে শতশত বিক্ষুব্ধ জনতা জড়ো হওয়ার দৃশ্য দেখে বিভ্রান্ত হয়। উপায়ন্তর না পেয়ে বিক্ষিপ্তভাবে গুলি ছোড়ে এবং গুলির আঘাতে তৎক্ষণাৎ কয়েকজন শহীদ হন। সেই আঘাত নিয়ে এখনো জীবিত আছেন নান্দরায়পুর গ্রামের অনিল চন্দ্র সরকার, ওয়ালিয়া গ্রামের জবান আলী ও রুস্তম আলী। তারপরও কনভয়টি সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা পথিমধ্যে বিজয়পুর ও বামনগ্রাম সীমান্তে অবস্থিত ইছামতি খালের উপর অবস্থিত ব্রিজের পশ্চিম পার্শ্বের রাস্তা আড়াআড়িভাবে কেটে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এমতাবস্থায় সেনারা রাস্তায় খালকাটারত ৪/৫ ব্যক্তিকে হাতেনাতে ধরে শুকিয়ে যাওয়া খালিশাডাঙ্গা নদীর দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু নদীতে নামার পর আর কোন উপায় না পেয়ে নদীর উত্তর পাড়ে ময়না গ্রামে সৈয়দ আলী মোল্লা ও নওয়াব আলী মোল্লার বাগান ঘেরা বাড়ি দখল করে সকাল ১০ টায়। এ সময় হানাদার বাহিনী বাড়ির চারকোণায় চারটি মেশিনগান স্থাপন করে আমগাছের নিচে গাড়ি পার্কিং করে। তাদের আগমনে অনেকে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মসলেম মোল্লার বাড়ির পেছনে আশ্রয় নেয়। আশ্রয়কৃতদের মধ্যে মসলেম মোল্লা, কাশেম, কেরামত ও ছাত্তারকে হানাদার সেনারা ধরে আনে ও আমগাছের সাথে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে এবং অনেককে আটকে রাখেন। বীর বাঙালিও পিছু হটবার মানুষ নয়। তারাও ধৃত ব্যক্তিদেরকে উদ্ধারের জন্য গ্রামের চর্তুদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে। এদিকে গোপালপুর সুগার মিলের কর্মকর্তা লে. আনোয়ারুল আজিম এবং শ্রমিক নেতা সুশীল কুমার (পাল বাবু) টেলিফোনে মহকুমা কর্মকর্তা কামাল হোসেন ও আওয়ামী লীগ নেতা শঙ্করগোবিন্দ চৌধুরীকে লালপুরে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের বার্তা দেন। মহকুমা কর্মকর্তা ময়নার যোদ্ধাদেরকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে কিছু পুলিশ ও আনসার সদস্যকে একটি জিপ ও ট্রাকসহ প্রেরণ করেন।
ইতোমধ্যেই সমগ্র লালপুর, বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, রাজশাহীতে খানসেনাদের আগমনি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার-হাজার বীর বাঙালি ময়না প্রান্তরে একত্রিত হয়। এ সময় হামিদুল হক (পোড়াবাবু), মাহাবুবুর রহমান সেন্টু, নায়েক বাবর আলী, আনসার কমান্ডার মেহের আলী, মোজাম্মেল হোসেন, আনসার গমেজ উদ্দিন, জাফর আলী, পুলিশ কর্মকর্তা জাফর আহম্মেদসহ তার বাহিনীর কিছু সদস্য, সরদহ ইউনিটের ইপিআর সদস্যদের এবং সুগার মিলের আনসার সদস্য নিয়ে গঠিত একটি সশস্ত্র বাহিনী ময়নার প্রান্তরে জনতার সাথে মিলিত হয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
চতুর্দিক থেকে প্রতিরোধে জনতার ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে হানাদার বাহিনী দিশেহারা হয়ে প্রথমে ভয় দেখানোর জন্য কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে, তাতেও প্রতিরোধকারী জনতাকে গতিপথ থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়; তখন তারা জনতাকে লক্ষ করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। জনতাও তীর-ধনুক, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন।
পাকিস্তানিরা যাতে পিছু হটতে না পারে, সেজন্য একদল প্রতিরোধী সাবল-কুড়াল-কোদাল দিয়ে হানাদারদের পেছনে, নদীর ওপর যে ব্রিজ ছিলো, তা ভাঙতে লেগে যায়। নাটোর থেকে প্রতিরোধে অংশগ্রহণকারী শৈলেন্দ্র কুমার মঙ্গল নামে এক যুবক একটি খেজুর গাছে ওঠেন। পাকিস্তানিদের অবস্থা দেখে নিচে যারা হানাদারদের লক্ষ করে গুলি বা ঢিল পাটকেল ছুড়ছেন, তাদের সে তথ্য দেওয়ার জন্য তার এই গাছে ওঠা। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী মঙ্গলকে গাছে উঠতে দেখে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। মঙ্গল গুলিবিদ্ধ হয়ে গাছ থেকে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। তৎক্ষণাৎ তাঁর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কয়েকজন এসডিও-র দেওয়া গাড়ি নিয়ে নাটোর হাসপাতালে যান। আহত শৈলেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী মঙ্গল ওই রাতে নাটোর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শুধু নাটোর মহকুমায় নয়, সাবেক রাজশাহী জেলার শৈলেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী মঙ্গল হানাদার বাহিনীর গুলীতে প্রথম শহীদ যোদ্ধা।
ময়না প্রান্তরের প্রতিরোধ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের উদ্ধার করার জন্য ৩০ মার্চ ১৯৭১ দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে কয়েকটি হেলিকাপ্টার আসে এবং হেলিকাপ্টার থেকে ব্যাপকভাবে গুলি ও বোমাবর্ষণ করে। কিন্তু প্রতিরোধী বাঙালিরা কী এক অসীম অদম্য সাহসে গুলিবিদ্ধ হয়েও তাদের অবস্থান থেকে এক তিলও পিছু হটেনি। প্রতিরোধীরা হেলিকাপ্টারকে লক্ষ করে রাইফেল দিয়ে গুলিবর্ষণ করে। এমতাবস্থায় জনতার শক্ত অবস্থান দেখে তাদের পরাজয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত বুঝে সঙ্গীদের ময়নার মাঠে নিয়তির হাতে সঁপে দিয়ে উদ্ধারের জন্য আগত হেলিকাপ্টারটি পালিয়ে যায়। সারাদিন-সারারাত্রি হানাদার বাহিনী অবরুদ্ধ থেকে কেউ কেউ ভোরবেলায় আখক্ষেতে আত্মগোপন করে। আবার কেউ কেউ আখক্ষেতে দিয়ে পালিয়ে কারো বাড়িতে গিয়ে অস্ত্র দেখিয়ে মহিলাদের শাড়ি নিয়ে পরে পালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। কিন্তু শাড়ি বা বোরকা পরলেও এত বিশালদেহী মহিলা যে বাঙালি গৃহে একজনও নেই, সেটা তাদের দেখে প্রতিরোধীরা স্পষ্ট বুঝে যায়। আর সে কারণেই হানাদার ঘাতকদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাতেনাতে ধরতে সক্ষম হয়। এদিকে ৩১ মার্চ সকালে পাকিস্তানিদের নিক্ষিপ্ত একটি শেল চামটিয়া গ্রামের আফসার আলীর বাড়িতে পড়ে। শেলটি বিস্ফোরিত হলে আফসার আলীর স্ত্রী জমেলা খাতুন ও সন্তান রাজলু নিহত হন। চামটিয়া হত্যাকাণ্ডের সংবাদ ময়না প্রান্তরে পৌঁছালে বিক্ষুব্ধ জনতা ধৃত পাকিস্তানিদের ওপর আরো বেশি চড়াও হন। স্বজন হারানোর ক্ষোভে তারা অনেককে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। মেজর রাজা আসলামকে মুক্তিযোদ্ধা আনিসুল হক ময়নার অনতি দূরে সিঅ্যান্ডবি রোডের একটি গর্তের চারদিকে জঙ্গল ঘেরা স্থানে প্রথমে দেখতে পেয়ে তাকে ধরে ফেলেন। ধৃত পাকিস্তানি হানাদারদের গোপালপুর মিলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়। বিক্ষোভকারী জনতা ধৃতদের তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রবল চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু জেনারেল ম্যানেজার লে. আনোয়ারুল আজিম মিলের সিকিউরিটি অফিসার সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেন যে, ধৃত বন্দি তিন সদস্যকে মহকুমা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেবেন। তারা বন্দিদের সম্পর্কে কোনো ব্যবস্থা নেবেন না। জনতার চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলে জেনারেল ম্যানেজার তিন বন্দিকে তার বাসভবনের পিছন দিয়ে ট্রাকে তুলে লালপুর থানার দিকে রওনা দেন। লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট হাই স্কুলের কাছে ট্রাক যেতেই জনতা পূণরায় ট্্রাকটি ঘিরে ফেলে। বন্দিদের তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য প্রবল চাপ প্রয়োগ করে। আজিম সাহেব ও নেতৃত্বস্থানীয় অন্যান্য ব্যক্তিরা জনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মেজর আসলাম সেই ক্ষিপ্ত জনতাকে দেখেও চিৎকার করে বলেন, ‘হামকো ছোড়দে, নেহিতো ইহা বোম গিরেগা’। বিক্ষুব্ধ জনতা রাজা আসলামের এই কথা শুনেই ট্রাকের ওপর চড়াও হয়ে জোরপূর্বক ট্রাক থেকে ছিনিয়ে নেয়। ১ এপ্রিল ১৯৭১ মেজর রাজা আসলামকে লালপুর হাইস্কুল মাঠে হামিদুল হক (পোড়াবাবু) গুলি করে হত্যা করেন। ধৃত অপর দুইজন গণপিটুনিতে নিহত হন। এছাড়াও বাগাতিপাড়া, আড়ানিসহ বিভিন্ন এলাকায় পলায়নরত বেশ কিছু সেনা জনতার কাছে ধরা পড়ে এবং জনতার পিটুনিতে নিহত হন। আর এভাবেই ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ধ্বংসে রূপান্তরিত হয়।
আমগাছটি ‘জীবন্ত স্মৃতিসৌধ’
আমগাছটি কেউ আর কোনো দিন বিক্রি করতে পারবে না। এটি এখন অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। একাত্তরে এই গাছের সঙ্গে আট মুক্তিযোদ্ধাকে বেঁধে গুলি করা হয়েছিল। তাদের সাতজন মারা যান। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আব্দুস সামাদ নামে একজন। তিনিও মারা গেছেন। গাছটি এখনো বেঁচে আছে। আছে গায়ে বুলেটের চিহ্ন। মালিক গাছটি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা গাছটি কিনে নিয়ে ২০১৪ সালের ৩০ মার্চ এটিকে ‘জীবন্ত স্মৃতিসৌধ’ ঘোষণা করেন।
লালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইসাহাক আলী জানান, গাছটির মালিক আবু রায়হান মোল্লা অত্যন্ত গরিব মানুষ অভাবের কারণে সম্প্রতি গাছটি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি তারা জানতে পেরে উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গাছটি কেনার প্রস্তাব দেন। বাজারদর হিসেবে গাছটির দাম হয় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। তারা সেই টাকা দিতে চাইলে রায়হান রাজি হন। গাছটি যত দিন বাঁচে রায়হানের পরিবার গাছের ফল ভোগ করবে। কিন্তু কোনো দিন কাটতে পারবে না। কেনার পর গাছটিকে তারা ‘জীবন্ত স্মৃতিসৌধ’ ঘোষণা করেছেন।
ময়না প্রতিরোধযুদ্ধে শহীদের প্রাপ্ত নামের তালিকা
সৈয়দ আলী মোল্লা, মসলেম আলী মোল্লা, আবুল কাশেম মোল্লা, আয়েজ উদ্দিন মোল্লা, খন্দকার নুরুন্নবী মন্টু ওরফে রাঙ্গা, কেরামত আলী শেখ ওরফে কিয়ামত, খাইরুল আনাম ছাত্তার, বকস সরদার, করম আলী, আবেদ আলী, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল কুদ্দুস, কালু মিয়া, সেকেন্দার আলী, আছের উদ্দিন, জয়নাল আবেদিন, কেরু ফকির, নুরুন্নবী, ইয়াছিন আলী, যুধিষ্ঠির প্রাং,
শৈলেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী ওরফে মঙ্গল, সায়ের উল্লাহ মুন্সী, আব্দুল লতিফ মুন্সী,
আব্দুল গফুর, নুরুল ইসলাম সরদার, তইজ আলী, জাহাঙ্গির হোসেন, সাদের আলী, নাসির উদ্দিন, কালু শেখ, কুদ্দুস শেখ, সামাদ শেখ, সাবেদ আলী প্রমুখ। আরো অনেকের নাম পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ময়না প্রতিরোধযুদ্ধে আহতদের কয়েকজন
আমির হোসেন, ওসমান সরকার, আইয়ুব আলী প্রামানিক, আবু বক্কারক, ভবেশ চন্দ্র বিশ্বাস, হেকমত আলী, অভিলাস মাল, অনিল চন্দ্র সরকার, রুস্তম আলী, নজরুল ইসলাম নজু, আরব আলী শেখ, ডা. নদের আলী, খোরশেদ আলী, আব্দুল কাদের, হেলাল উদ্দিন, আব্দুল মোল্লা, হরেন্দ্রনাথ, সাহাদৎ হোসেন, শঙ্কর দাস, আহম্মদ আলী, তবিবর রহমান, সুধীরচন্দ্র বিশ্বাস, সুশীল রায়, বার্নাড কস্তা, মোমেনা খাতুন, রাজিয়া বেগম, আলমগীর হোসেন, মার্সেল পালমা, হারুণ-আর রশিদ, শ্যামলকুমার দাস, কানাইলাল সরকার, মমতাজ উদ্দিন, গোফুর আলি, তোফাজ্জল হোসেন, মনিরুল ইসলাম, ইদ্রিস আলি, নজরুল ইসলাম, নিতাইচন্দ্র সরকার, আব্দুল হক, গোলাম মোস্তফা, গিয়াস উদ্দিনসহ আরো অসংখ্য ব্যক্তি।
যুদ্ধে ময়না গ্রামের শহীদ সৈয়দ আলী মোল্লার ছেলে মো. ইদ্রিস আলী মোল্লা (৭২) ও মো. আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘আমার বাবা ছাড়াও চাচা আয়েজ উদ্দিন মোল্লা, প্রতিবেশি মসলেম উদ্দিন মোল্লা, কাসেম আলী মোল্লাসহ অনেকে শহীদ হয়েছেন।  আজও ময়নার যুদ্ধে শহীদ ও আহতদের কেউ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। ১৯৯৮ সালের ৩০ মার্চ ৫শতাংশ জমিতে নির্মিত ‘ময়না শহীদ স্মৃতিসৌধ’ উদ্বোধন করেন সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মমতাজ উদ্দিন। স্থানীয়রা শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা ও পাঠাগারের জন্য দুই শতাংশ জমি প্রদান করলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমনকি গণকবরটি সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শহীদদের স্মৃতির সম্মানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ময়না শহীদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি বছর তারা ৩০ মার্চ আলোচনা সভা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সরকারি উদ্যোগে এখানে তেমন কোন অনুষ্ঠান হয় না। তবে প্রতিবছর ৩০ মার্চের আগে কিছু সাংবাদিক এসে বিভিন্ন তথ্য নিয়ে যান। কিন্তু তার কোন ফল এখনো পাইনি।’
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মুল বানীন দ্যুতি জানান, উপজেলার সবগুলো গণকবর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে সমন্বয় কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
লালপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইসাহাক আলী বলেন, ‘দেশের একমাত্র পাকবাহিনীর সাথে জনযুদ্ধ সংঘটিত হয় ময়না প্রান্তরে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে স্বঅর্থায়নে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও বুলেটবিদ্ধ আম গাছটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। গণকবরের জায়গা কেনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু মালিক বিক্রি করতে চাচ্ছেন না।’
তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে জমি অধিগ্রহণ পূর্বক গণকবর সংরক্ষণ, স্মৃতিসৌধের মর্যাদা রক্ষা, সংগ্রহশালা ও পাঠাগার নির্মাণে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।’  
৫৮ নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বকুল ময়নার যুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করে দিলে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবেন। তিনি লালপুরের সবগুলো গণকবর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top