logo
news image

আমাদের গ্রামের ঈদের একাল-সেকাল

-মো. আকতারুল ইসলাম।।
গ্রাম প্রধান বাংলাদেশের এককালে অজ এবং অভাব শব্দ দুটি একে অপরে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল। বহুল প্রচলিত ছিল অজ পাড়া-গাঁ। এই অজ পাড়াগাঁয়ে শক্তভাবে বাসা বেধে ছিল অভাব।  আজ গ্রামের অগ্রভাগ থেকে কেটে গেছে অজ আর দুরের পথ ধরেছে অভাব। অজ পাড়া গাঁয়ে অভাব জেঁকে বসে ছিলো শতশতবছর আগে থেকেই। আমাদের বাপদাদারা এই অভাবের কষাঘাতে জীবনের বেশি সময় অতিবাহিত করেছেন। আউশ-আমন ছাড়া তো ধান ছিলো না। অভাবে পড়লে না খেয়ে থাকা ছাড়া বিকল্প কিছু ছিলো না।  অভাবের তাড়নায় লোকজন শাক পাতাড়, খেষাড়ি, মশুর সিদ্ধ, প্যাড়া কিংবা গমের রুটি, জাউ খেয়ে কাটিয়েছে দিনের পর দিন। আমাদের জন্মও সেই অজ পাড়াগাঁয়েই। নাটোরের লালপুরে সত্তরের দশকের শেষ দিকে। আমার স্মরণের দেয়ালে সাঁটানো আশির দশকের দিনগুলোর স্মৃতি। আশির দশকে দেখেছি একগ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাওয়া রাস্তা ছিলো পায়ে হাঁটা পথ। কোথাও ছিলো ডহর। আশির দশকে ডহরে মাটির রাস্তা হয়েছে। ঢাঁকা পড়েছে ডহরের বিন্নি। গরুর গাড়িই ছিলো প্রধান বাহন। দৈনন্দিন কৃষি কাজই সকলের পেশা। আশির দশকে সেখানে ঈদের চাঁদ রঙিন হয়ে উঠেনি কখনো। ঈদের আগে নতুন পোশাক গ্রামের দু'একটি পরিবার ছাড়া সবার গায়ে উঠেনি।  রোজার ঈদে নামাজ পড়ে সমাজের সবাই মিলে খিচুড়ি খাওয়া আর দল ধরে দশ মাইল দুরে পায়ে হেঁটে বাঘায় ঈদের মেলায় যাওয়ায় ঈদের মুল আনন্দ ছিলো। আর কোরবানির ঈদে নামাজ পড়ে এসে খিচুড়ি খেয়ে সমাজের দু'একজনের কোরবানি থাকলে জবাই করা, গোস্ত কাটা সবাই মিলে তাতে সহযোগিতা করাই ছিলো ঈদের মুল আনন্দ।
তবে আমাদের ছোট বেলার ঈদের নামাজ পড়ার আনন্দ ছিলো বেশ। দু'তিন গ্রামের সবাই এক ঈদগাহে নামাজ পড়তাম। যাদের বাড়িতেই দু"তিন জোড়া গরু থাকতো রোজার ঈদে বাঘার মেলা বেড়ানোর জন্য আমরা যারা স্কুলে পড়ি তারা কয়েকদিন আগে থেকে বেশি বেশি ঘাস কেটে ঘাস গুছিয়ে রাখতাম যাতে ঈদের কয়েকদিন গরুর ঘাসের চিন্তা না থাকে। দিনে দিনে দু'চার টাকা করে গুছিয়ে কয়েক টাকা হলে তা দিনে মেলা বেড়ানোর মজা ছিলো সবচেয়ে আনন্দের। দিনে দিনে টাকা গুছিয়ে সে টাকা মেলায় কেনাটাটা ছিলো মহা আনন্দের। একবার আমার ছোট ভাই মেলা দেখার জন্য আব্বার কাছে টাকা চেয়েছে। টাকা নাই বলে তাকে টাকা দিয়েছেন দেড় টাকা। কান্নাকাটি করে দেড় টাকা না নিয়ে দেড় টাকা ছুড়ে ফেলে দিয়ে খালি হাতই হাঁটা ধরলো ১০/১২ মাইল দুরের মেলার রাস্তা। আশির দশকে বাঘা-লালপুর রাস্তা পুরো পাকা হয়নি। বাঘা অংশে কিছুটা পাকা হয়েছিল। তাছাড়া লালপুর পর্যন্ত সবটুকু ছিলো হেয়ারিং। আন্তঃউপজেলা রাস্তার ছিলো এই অবস্থা সেখানে গ্রামের রাস্তার অবস্থা বলাই বাহুল্য। কত হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে। একটি উদাহরণেই বোঝা যায়।  ১৯৮৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী ছিলো আমার চাচাতো দু'বোনের বিয়ে। আগের দিনে সেই চাচার বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতেরা আমার এক চাচাতো ভাইকে ছুরিকাঘাত করলে ভোরে গরুর গাড়িতে করে লালপুর উপজেলা হাসপাতালে নেয়া হয়। গরুর গাড়িতে হাসপাতালে নিতেই যায় তিন চার ঘন্টা। তখন ছিলো না কোন এ্যাম্বুলেন্স ছিলো না কোন মাইক্রো সার্ভিস। ঘন্টার পর ঘন্টা বিনা চিকিৎসায় পর অনেক চেষ্টায় বিকেলে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের এমডির গাড়িতে  করে সন্ধ্যায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছায় সারাদিন বিনা চিকিৎসা আর অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে ঐ চাচাতো ভাইটিকে আর বাঁচানো যায়নি। তখন এলাকায় বিদ্যুৎও ছিলো না  অনেক চেষ্টায় ২০০১/২ বিদ্যুৎ এনেছি। হারিকেন আর বাতির আলোয় পরে আমার মতো অনেকই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বারান্দায় পা রেখেছি। এতো প্রতিকূলতায় সকলে মিলে ঈদের নামাজ শেষে অতি মমতায় সমাজে দু'একটি কোরবানির পশু জবাই করে অন্তর দিয়ে বন্টন করেছি। তাতে ছিলো অনন্য ভ্রাতৃত্ববোধ। ছিলো সমাজের শক্ত গাঁথুনি।
আজ গ্রামের প্রতিটি রাস্তা পাকা হয়েছে। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি পাকা হয়েছে। কেউ আর দুপুরে না খেয়ে থাকে না। প্রতিটি লোকই ঈদে নতুন পোশাক পরে। ঈদের আগে কেনা কাটার কমতি নেই কারো। অজ পাড়াগাঁয়ের তকমা বিলিন হয়েছে। অভাব অধিকাংশের পরিবার থেকে বিদায় নিয়েছে। গ্রামের প্রায় সব মানুষেরঘরে খাবার আছে, হাতে আছে টাকা। শুধু তাই নয় সরকারেরও সক্ষমতা বেড়েছে হাজারগুন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় গ্রামের গরীব লোকগুলোকে সহায়তার গণ্ডির মধ্যে নিয়ে এসেছে। গ্রাম পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে ঈদের আগে সরকারের খাদ্য সহায়তার চমৎকার ব্যবস্থাপনা ঈদ আনন্দকে বাড়িয়ে দিয়েছে।  আবার গ্রামে ঈদ কোরবানি দেয়া লোকের সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুন। গ্রামেই লাখ টাকার গরু কেনা বেচা হয়েছে অনেকগুলো। আমরা যারা এখন শহুরে রাস্তার ক্লান্তিকে পায়ে মাড়িয়ে শেকড়ের টানে, মায়ার টানে মাটির টানে ঈদ আনন্দে অন্তর পূর্ণ করতে গ্রামে আসছি। তবে গ্রামের সমাজের গাঁথুনিটা সেকালের থেকে একালে অনেকটায় আলগা হয়ে গেছে। গ্রামের এক সমাজ ভেঙে হয়েছে তিন-চারটি। মমত্ববোধ আর ভ্রাতৃত্ববোধের ঘাটতির পরিধি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তারপরও বাড়ি আাসার আগে মন বলে উঠে "স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার"। আবার শহরের অনেক লোককে বলতে শুনি "ঈদ আসছে গ্রাম আগের মতোই টানে, আবেগটাও আছে কিন্তু বাবা-মা নেই কোথায় যাবো"? তাদের এই আবেগের মুল্য দিতে পারবো না। তাঁদের কষ্টটা পূরণ হবার নয়। তাঁদের জন্য আমাদের সমবেদনা। গ্রামের ঈদ সবারই হৃদয়ের অনুভূতির জায়গাটা দখল করে থাকে আমৃত্যু। গ্রামের ঈদের যে আবেগ তা একালের হোক কিংবা সেকালের হোক সবার হৃদয়কেই নাড়া দেয়। আমাদের বোধকে জাগ্রত করে। তাই তো আমরা পথের কষ্টকে গায়ে না মেখে বারে বারে ফিরি নিজের অথবা বাপ-দাদার নাড়ি পোঁতা গ্রামে। ঈদ আমাদের নিজকে চেনায়। তাই তো ঈদের আগে গণমাধ্যমেও খবর হয় নাড়ির টানে ছুটছে মানুষ। এরই নাম ঈদ, এরই নাম আনন্দ। আমাদের হৃদয়ে থাকুক আমাদের গ্রাম। সবার ঈদই হোক আনন্দময়। নিরাপদ হোক সকলের ঈদ যাত্রা।  সকলকে ঈদ শুভেচ্ছা।

× মো. আকতারুল ইসলাম: সিনিয়র তথ্য অফিসার, (জনসংযোগ কর্মকর্তা) শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top