logo
news image

শুভ জন্মদিন শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়

ইমাম হাসান মুক্তি, লালপুর (নাটোর)
দেশের উষ্ণতম ও সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত এলাকা নাটোরের লালপুরে ১৮৩৫ সালের দিকে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৬৭ সালে পুঠিয়ার মহারানী শিক্ষা বিস্তারের সুতিকাগার ‘শরৎ সুন্দরী মধ্য ইংরেজি স্কুল’ ও একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৫ সালের ৬ মে ‘চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়’ নামকরণ হয়। পরবর্তীতে ১৯৪১ সালে ‘শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়’ নামকরণ করে কলিকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন মুঞ্জরী পায়।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস :
প্রমত্তা পদ্মার নৈসর্গিক বেলাভূমি, পললউর্বর শস্যে ভরা প্রান্তর ও জনকোলাহলময় এক জনপদে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে ‘লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়’।
জানা যায়, স্থানীয় ভূস্বমী ও শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে লালপুরে ১৮৩৫ সালের দিকে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় এখানে মুন্সেফ চৌকি, সাব-রেজিস্টার অফিস প্রভৃতি ছিল। পরবর্তীতে পুঠিয়ার মহারাণী নিজ নামে ১৮৬৭ সালে ‘শরৎ সুন্দরী মধ্য ইংরেজি স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
জীবনাবসান :
পুঠিয়া রাজবংশের ‘পাঁচআনি’ শাখার বড় তরফের রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মহারাণী শরৎ সুন্দরী দেবী (১৮৬৫-১৮৮৬ খ্রি.) রাজত্ব পান। শরৎ সুন্দরীর মৃত্যুর পর ছেলে যতীন্দ্র নারায়ণের স্ত্রী মহারাণী হেমন্ত কুমারী দেবী জমিদারীর দায়িত্বভার পান।
বিদ্যালয়টি ১৯৩১ সালে ভষ্মীভূত হয়। সেই সাথে অর্থিক অনুদান বন্ধ করে দেওয়ায় শিক্ষকদের বেতন ও শিক্ষাউপকরণ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কিছু দিন কোন দোকান ঘর বা গাছের তলায় শিক্ষার কাজ চলে। ১৯৩৪ সালে দুর্দশা চরমে পৌঁছালে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি স্কুল:
স্থানীয় বুধপাড়ার জমিদার যতীন্দ্রনাথ কুন্ডু ও দেবেন্দ্রনাধ কুন্ডু তাঁদের স্বর্গীয় পিতা চন্দ্রনাথ কুন্ডুর স্মৃতিতে এই বিদ্যালয়টি পরিচালনার উদ্যোগ নেন। ১৯৩৫ সালের ৬ মে বৃটিশ-ভারত-সম্রাট পঞ্চম জর্জের ‘রজত জুবিলী’ দিবসে ভিত্তি স্থাপন করে ‘চন্দ্রনাথ মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়’ নামকরণ হয়। ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ২৫ জন ছাত্রকে নিয়ে পাঠদান শুরু হয়। ১৯৪১ সাল পর্যন্ত এ নামেই চলে।
শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়:
বিদ্যালয়টি ১৯৪১ সালে জমিদার বাবু দেবেন্দ্র নাথ কুন্ডুর স্ত্রীর নামে ‘শ্রী সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়’ নামকরণ করে কলিকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন মুঞ্জরী পায়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৯৪৫ সালে প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন।
অব্যাহত এগিয়ে চলা :
সমাজ হিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী স্থানীয় ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলে। যাঁদের নাম উল্লেখযোগ্য-প্রয়াত দেবেন্দ্রনাথ কুন্ডু, প্রয়াত জোতিন্দ্রনাথ কুন্ডু, প্রয়াত শিবপ্রসাদ আগরওয়লা, প্রয়াত সতীশ চন্দ্র সরকার, মরহুম জমির সেখ, মরহুম উমির সেখ, প্রয়াত সৌদামিনা দাস, প্রয়াত ননীবালা দাস, প্রয়াত কৃষ্ণপদ সরকার, প্রয়াত তারাপদ সরকার, প্রয়াত যতীন্দ্রনাথ সরকার, মোছা. মাহেদা খাতুন, মরহুম আফসার আলী মন্ডল, মো. আকবর আলী মালিথা প্রমুখ।
সরকারি সহায়তা :
পূর্বপাকিস্তান সরকারের সরবরাহ সচিব সৈয়দ মুহাম্মদ আফজাল ১৯৪৮ সালের ২৮ জুন বিদ্যালয়ের মুল ভবনের ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার ‘দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী’ পরিকল্পনা উন্নয়নে অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৭৬ সালে বিদ্যালয়টি পাইলট স্কীমভূক্ত ও ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি অনুদান পায়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং ২০০১ সালে এইচএসসি (ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা-বিএম) শিক্ষাক্রম অনুমোদন ও এমপিওভূক্ত হয়। ২০১২ সালে বিদ্যালয়টি মডেল প্রকল্পভূক্ত হয় ও তিনতলা ভবন নির্মিত হয়।
শিক্ষার মান ও সহশিক্ষা কার্যক্রম :
বর্তমানে বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ২৯৩ জন। শিক্ষক ও কর্মচারী ৪২ জন। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক। পাশাপাশি খেলাধূলায় রয়েছে জাতীয় পর্যায়ে কৃতীত্ব। স্কাউট ও বিএনসিসি দল রয়েছে। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রয়েছে অনন্য ভূমিকা। বিদ্যালয়ের প্রকাশনা ১৯৬৫ সালে স্মরণিকা ‘মুকুলিকা’, ১৯৮৮ সালে বার্ষিকী ‘মঞ্জুরী’ ও সার্ধশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ২০২০ সালে ‘প্রস্ফুটন’ আত্মপ্রকাশ করে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা :
বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে বিদ্যালয়ের ৬৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। অনেকে শহীদ হয়েছেন।
কৃতীদের আঁতুড়ঘর :
ভারত বিখ্যাত সমাজহিতৈষী ও রাজনৈতিক অশ্বিনী কুমার দত্ত ১৮৬৭ সালে স্কুলের প্রথম ছাত্র ছিলেন। তাঁর বাবা ব্রজমোহন দত্ত সে সময় লালপুর মুনসেফ চৌকির সাব-জজ ছিলেন।
যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সংগঠক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মরহুম হুজ্জোত আলী প্রামানিক ১৯৬০ সালের ছাত্র ছিলেন। এছাড়াও বহু কৃতী বিভিন্ন পর্যায়ে অবদান রাখছেন।
অতৃপ্তির গ্লানি :
দেড় শতাধিক বছর আগে জ্ঞানান্ধকার যুগে ১৮৬৭ সালে অংকুরিত সুপ্ত ভ্রƒণ ১৯৪১ সালে যৌবন সুষমায় বিকশিত হয়। ১৫৫ বছরের প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞানবৃদ্ধ পৌঢ়ত্বেরকাল অতিক্রম করছে। কিন্তু জাতীয় করণের সব শর্ত পূরণে সক্ষম প্রতিষ্ঠানটি আশাকরি সরকারের সুদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে না।

ইমাম হাসান মুক্তি:
সাবেক শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক; অধ্যক্ষ, মাজার শরীফ টিবিএম কলেজ, লালপুর, নাটোর।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top