logo
news image

মামলা বেড়েছে মাদকের মামদো ভূত কমেনি

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
নিত্যনতুন মাদকদ্রব্যে ছেয়ে গেছে বাজার-ঘাট, ছেয়ে গেছে দুনিয়ার চারদিক। মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় থেমে নেই। মাদকের আগমন, গ্রহণ, ব্যবসা, পাচার কোন কিছুতেই নেই ডর, নেই কোন ভয়। কিছু মানুষ আইন-কানুনকে তো ভয় করেই না। ভয় করতে চায়না মৃত্যুকেও। জীবন তাদের কাছে কোন দামী বিষয় নয়। টাকা উপার্জন করাটাই তারে কাছে মুখ্য বিষয়। টাকার কাছে মাদক জিম্মি, মাদকের ব্যবসা জিম্মি।
একনো পুরনো ধারণায় বলা হয়, ভৌগলিক কারণে আমরা মাদকের কাছে ধরাশায়ী। ভূ-আঞ্চলিক কারণে মাদকের উৎপত্তির নিকটস্থ ত্রিভূজের সীমানায় বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় মাদক প্রবেশে করার সুযোগ পাচ্ছে অনায়াসে। তাই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারীরা তাদের অবৈধ ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে, এ দেশীয়দের টাকা দিয়ে প্রলুব্ধ করে গোপনে নিয়োগ দিচ্ছে। তাতে এ দেশের কিছু সুবিধাবাদী পেশী শক্তি ও রাজনৈতিক ক্ষমতাধরকে হাত করে ফেলেছে। এর প্রভাবে বিশাল এক চক্র মাদকের সংগে সক্রিয়ভাবে জড়িত হচ্ছে।
কিন্তু করোনাকালে এদেশে মাদকের প্রবেশের প্রকৃতি পর্যালোচনা ও ব্যবহারের ব্যাপ্তি অবলোকন করলে দেখা যায় অতীতের মাদকসংক্রান্ত কারণগুলো এখন ততটা সক্রিয় নয়। অধুনা এর জায়গা দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগের নানা গণমাধ্যম।
ক’বছর আগের হিসেবে বলা হ’তো আমাদের দেশে মাদককাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৪০ থেকে ৪৫ লক্ষ। করোনার এক বছরের মধ্যে ২০২০ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭৫ লক্ষ। ২০২২ সালে জানুয়ারী মাসে তা বেড়ে হয়েছে এক কোটি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে একটি টিভি চ্যানেলের এক আলোচনায় গত ০৭,০২,২০২২ তারিখে বলা হয়েছে, দেশে মাদকসেবীর এই সংখ্যা আরো অনেক বেশী হতে পারে। যেহেতু ঘরে বসে মাদকের অর্ডার দিয়ে সহজে হাতের নাগালে তা পৌঁছে যায়, সেহেতু এর সঠিক সংখ্যা নিরুপণ করা দু:সাধ্য। ই-বিজনেস চালু হবার পর থেকে মাদকের প্রবাহ অতি সহজ হয়েছে। তাই এক প্রতি কৌতুহল বেড়েছে। সাথে বেড়েছে নিত্যনতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা। তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারে অপরাধ বেড়েছে। এসব অপরাধের ৮৯% মাদক গ্রহণ ঘটনার সংগে জড়িত।
২০২১ সালে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিত্তশালী পরিবারের কতিপয় স্কুল-কলেজ ও বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ক্রিষ্টাল মেথ ও আইস সেবনের প্রবণতা ও এর উৎস যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেছে তাদের সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এসব দামী মাদকের পরিচয় পেয়েছিল। যার উৎসস্থল ছিল কুরিয়ারে প্রেরণকারী ইউরোপের কিছু ধনী দেশ। যেখানে মাদক ও ব্যাথাবিনাশী ওষুধ নিয়ে অতি উন্নত মানের গবেষণা করা হয়। আমাদের দেশের বিত্তশালী ঘরের উঠতি তরুণরা করোনাকালে ইন্টারনেটে পাঠগ্রহণ করার সুবাদে সেগুলোর সন্ধান পেয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ নিজেরাই বিদেশে অধ্যয়নরত। অথবা কেউ বিদেশে পড়ুয়া সহপাঠিদের মাধমে মাদক গ্রহণে জড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে আসক্তি জন্মালে করোনার সময় দেশে ছুটিতে থাকাকালীণ নিজেরাই সেসব ভয়ংকর মাদকের অর্ডার দেয়া ও মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদেরকে লুকিয়ে গোপনে ব্যবহার শুরু করে।
তাই ডিজিটাল এই যুগে মাদকের রুট সঠিকভাবে চিহ্নিত করা বেশ দু:সাধ্য হয়ে পড়েছে।
তরুণ ছেলেদের পাশাপাশি তরুণীরাও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে। টিকটক প্রকৃতির অনুষ্ঠান করতে ইয়াবা, ফেন্সিডিল চাই। কিছুদির পূর্বে এক টিকটক তৈরীকারী মাদকসেবী চলন্ত ট্রেনের ছাদে উঠে ছবি ধারণ করার সময় বৈদ্যুতিক তারের সাথে জড়িয়ে প্রাণ হারিয়েছিল।
অনলাইন ভিত্তিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গজিয়ে উঠা বিভিন্ন চমকপ্রদানকারী ভিডিওতে অংশগ্রহণের পর অনেক তরুণীকে বেদেশে পাচার করা হয়েছে খাদ্য ও পানীয়তে মাদক সেবন করিয়ে। ভারতের গুজরাটে পাচার হওয়া এক তরুণী দীর্ঘদিন পর তার এক অতিথিকে অনুরোধ করে সেদেশের সিম সংগ্রহ করে দেশে তার মাকে ফোন করে জানিয়েছিল তার অবস্থান ও দু:সহ জীবনের কাহিনী। পরে তাকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনা হলে সে তার দু’বছরের দু:সহ জীবনের বর্ণনা গণমাধ্যমে ফাঁস করে দিলে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এতে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া দিয়ে ঘর থেকে অজানার উদ্দেশ্যে বাইরে বের হওয়াটাই তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঘরের বাইরে অপরাধী চক্র তাকে জোর করে পানীয়তে মাদক গিলিয়ে অজ্ঞান করে দেশের বাইরে পাচার করে দেয়।
দেশে ২০১৮ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরী হয়েছে। ২০২০ সালে সেটার কঠোর প্রয়োগ সম্বলিত ধারা সংযোজন করে সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু মাদক আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা শোনা যায় না। মাদকের দায়ে ধরে আনা অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে এসে আবার পূর্ণদ্যেমে মাদক সংক্রান্ত অপরাধ শুরু করে।
তাই আজকাল শুধু নৌপথ, বিমানবন্দর ও স্থলের সীমান্তই নয়- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের কুফলকে তরুণদের মাদকাসক্ত হবার পিছনে প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে। এছাড়া ভিআইপি ও তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে সাঙ্গ বা আত্মীয়স্বজনদের লাগেজ ও প্রবেশপথকে দামী মাদক ও ওষুধ প্রবেশের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
আমাদের মাদক নিয়ন্ত্রণ বাহিনী মাদক ব্যবসায়ীদের মত ধূর্ত ও স্মার্ট হয়নি এখনও। মাদকের পৃষ্ঠপোষকতাকারী গডফাদাররা তাদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী। তাদের শক্তির এত উৎস কি গোয়েন্দাদের অজানাই থেকে যাবে? অনেকে বলেন, তাদের ধরা হয় না অথবা ধরা যায় না কেন?
তারা শুধু মাদক-ফড়িয়াদের কান টেনে ধরে আনে আর ফোন পেলে ছেড়ে দেয়ার কাজটি করে। ছোট ব্যবসায়ীদের ধরে আনা আর দ্রুত জামিন দেয়ার জন্য আইনী বা স্বজন্য ব্যবস্থার প্রবণতা বৃদ্ধি পেলে দেশ থেকে কখনোই মাদক নির্মূল করা যাবে না। কারণ, এই প্রক্রিয়ায় প্রতি পদে, প্রতি ঘাটে ঘাটে অবৈধভাবে টাকার খেলা থাকায় বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ ভূমিকা পালন করে মাত্র। আর এজন্য মাদক ব্যবসায়ীরা আগেই বড় বাজেট তৈরী করে রাখেন। সেটা তারা দালালদেরকে আগেই অবহিত করে মাদক পাচারে অভয় দান করেন। তাই দালালরা মাদক ও সোনা পাচারে কখনো ভয় পায় না। তারা জানে তাদের গড ফাদাররা তাদেরকে ছাড়িয়ে আনবেই। আমাদের দুর্বল নজরদারী এসব মাদক সম্রাটদের ‘বিগ বাজেটের’ নিকট নতজানু। দেশের অভ্যন্তর মাদকে সয়লাব হয়ে যাবার কাহিনী এসব বড় অংকের বাজেটের টাকার খেলায় হেরে যাচ্ছে। বড় বাজেট হাতে নিয়ে মাদক চক্রদের অপতৎপরতা এজন্য বহুলাংশে দায়ী।
মাদক নিয়ন্ত্রণে আমাদের শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ালে হবে না। মন পকেটের নৈতিকতা বাড়ানোর কাজে কর্মীদেরকে প্রণোদনামূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারণ, আমরা তলে তলে ক্ষয়ে গেছি। এবং দিন দিন আরো বেশী লোভী হয়ে সহজে অপরাধীদের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হয়ে পড়ছি। এ বিষয়টিতে গভীরভাবে নজর দিয়ে নৈতিক নীতিমালা তৈরী করা আশু দরকার।
মানুষের মনের মধ্যে থেকে মানবিক গুণাবলী শতভাগ হারিয়ে গেলে তারা উদ্ব্ভ্রান্ত হয়ে যায়। কিছু মানুষ দয়া-মায়া, নৈতিকতা হারিয়ে মানুষকে সেবা দেয়ার নাম করে পক্ষান্তরে মেরে ফেলার ব্যবসায় সরাসরি জড়িত। বেপরোয়া মাদকচক্র সেই গোত্রভূক্ত হয়ে মানবতার নিষ্পেষণে নিষ্ঠুর খেলায় সহযোগী হয়ে উঠেছে। দেশে এই ধরণের আরো কতশত জালিয়াত ও তাদের দোসর বা চক্র আছে তাদেরকেও দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। একটা চিরসত্য হলো এই চক্রের অনৈতিক যোগসূত্র। তাই এদেরকে চিহ্নিত করে অচিরেই নির্মূল করা দরকার। শিক্ষিত ও ক্ষমতাধর হবার নামে অবৈধ বখরাভোগী, পেশাদারী চোর-ডাকাতদেরকে আর কোথাও, কোন দায়িত্বশীল পর্যায়ে রাখা উচিত নয়।
প্রতিদিন যে পরিমাণ মাদক ধরা পড়ে তার সামান্যই জনসমক্ষে দেখানো হয় বলে প্রচলিত। একজন বিখ্যাত এডভোকেট বলেছেন, এর মূল কারণ অবৈধ বিনিময়ে সহজে জামিন প্রাপ্তিলাভ করা। কারণ সকল অবৈধ বড় টাকার উৎস মাদক। ঘাটে ঘাটে সবাই এই টাকার ভাগ পায়। সেজন্য মাদকের আগ্রাসন বন্ধ করা যায় না। এই অবস্থা অলিখিতভাবে ব্যাপকতা পাওয়ায় অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ আজও শুধু একটি অসাড় অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এজন্য মাদকের ভয়ংকর থাবায় অকল্পনীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। অদূর ভবিষ্যতে এর মাশুল দেয়া খুব কঠিন হয়ে পড়বে। মাদকের পারদ করোনার পারদের চেয়ে বেশী উর্দ্ধমুখী, বেশী ক্ষতিকর ও ভয়ংকর এর প্রভাব। তাই শুধু মামলা দিয়ে পুড়িয়া বিক্রেতাদের পার্ক বা রাস্তাঘাট থেকে ধরে এনে হয়রানী করে ফোন পেয়ে ছেড়ে দিলে সেটার কোন ভাল সমাধান নেই। এভাবে শুধু মামলা বাড়বে, বিবৃতি বাড়বে- মাদকের ব্যবসা ও ব্যবহার কোনটাই কমবে না।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: fakrul@ru.ac.bd

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top