logo
news image

বীরাঙ্গনা ইটভাটার শ্রমিক

ইমাম হাসান মুক্তি, লালপুর (নাটোর)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্ষিত নারীদেরকে ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দিলেও ৫০ বছরে সে স্বীকৃতি পাননি রোকেয়া বেগম রাকিয়া (৬৭)। নাটোরের লালপুরের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের এই বীরঙ্গনা এখন ইটভাটার শ্রমিক।
বৃহস্পতিবার (৯ ডিসেম্বর ২০২১) সরেজমিন দেখা যায়, ইটভাটা চালুর প্রস্তুতি হিসেবে পুরুষদের সাথে মাটি টানার কাজ করছেন রোকেয়া বেগম। বয়সের কারণে কাজ করতে কষ্ট হলেও পেটের দায়ে বাধ্য হয়েছেন।
এমএইএ ইটভাটা মালিক মো. হাসেম আলী বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে রোকেয়া তার ভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।
রোকেয়া বেগম ও তার পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২০ জুলাই। নাটোরের লালপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধার গ্রাম রামকৃষ্ণপুরে অতর্কিত ঢুকে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। অত্যাচর, বাড়িঘর লুট ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়। অস্ত্রের মুখে নারী ধর্ষণেও মেতে ওঠে।
একাত্তরে ১৭ বছরের যুবতী রোকেয়া বাবা-মা, ভাই-বোনের সামনেই সম্ভ্রম হারানোর মানসিক কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন। পিতা হায়াৎ মালিথা ও মা মরিয়ম নেছার ঘরে ছিল বড় ভাই হাবিবুর রহমান, ১৫ বছর বয়সী বোন সাকিয়া ও ছোট ভাই ১২ বছরের আজহার আলী।
এর আগে ৫ মে লালপুর-গোপালপুর সড়কের শিমুলতলা নামক স্থানে তার বড় ভাই টমটম (ঘোড়ার গাড়ি) চালক হাবিবুর রহমানসহ গাড়িতে থাকা ৬ জন যাত্রীকে পাকবাহিনী গুলি করে হত্যা করে।
তার ভাই আজহার আলী বলেন, বাবা-মা অনেক অনুনয়-বিনয় করে কোন লাভ হয়নি। তার সামনে বোনের প্রতি অসভ্য আচরণ সহ্য করতে না পেরে হাঁসুয়া হাতে ওদের দিকে ছুটে গেলে বাবা বাধা দেন। এ সময় মা ও বাবা দু’জনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
এ ঘটনার কয়েকদিন পর বন্যার পানিতে সাঁতরে বাথানবাড়ি ও রগমারি হয়ে ভারতের জলঙ্গিতে পৌঁছেন। কলিমপুর শরনার্থী শিবিরে ৫ মাস থাকার পর দেশে ফিরে আসেন।
স্বাধীনতার দেড় বছরের মাথায় নিমতলীর ছইর মোল্লার ছেলে ছোয়াহা’র সাথে রাকিয়ার বিয়ে হয়। কিন্তু যুদ্ধকালীন ঘটনা জানার পর স্বামী তাকে তালাক দেন। এরপর বুধপাড়া গ্রামের আজিজ শেখের সাথে বিয়ে হয়। এই স্বামী মারা গেলে গোপালপুর (মাধবপুর) গ্রামে দিনমজুর সন্তানের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে ইটভাটায় কাজ করে জীবন-যাপন করছেন।
রোকেয়া বেগম রাকিয়া বলেন, বীরঙ্গনার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছেন কয়েক বার। কিন্তু লাভ হয়নি। স্বীকৃতি পেলে সব কষ্ট ভুলে থাকবেন তিনি।
বৃহস্পতিবার উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোত্তালিব বলেন, বীরঙ্গনা রোকেয়া বেগম রাকিয়ার আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মুল বানীন দ্যুতি বলেন, বীরঙ্গনার স্বীকৃতির জন্য রোকেয়া বেগম রাকিয়ার আবেদন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top