logo
news image

বৈষ্ণব গোঁসাই আশ্রমে নবান্ন উৎসব

ইমাম হাসান মুক্তি, লালপুর (নাটোর)
মানুষের ভাবদর্শন সত্যিই কত স্নিগ্ধ। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর ঈশ্বর-ভাবনা, সব এখানে মিলেমিশে একাকার। বৃক্ষরাজিতে আশ্রয় নিয়েছে পাখিকুল। সদর দরজায় পেখম মেলে রেখেছে ময়ূর। একটু সামনে এগোলে সারি সারি সুপারিগাছ। শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের সৎসঙ্গ সেবাশ্রমের সবকিছুই যেন বুঁদ হয়ে আছে পরম প্রাপ্তির আকাক্সক্ষায়। তিন শতাধিক বছরের পুরোনো নির্জন এ স্থানটি প্রায়ই ভক্তদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে।
নাটোরের লালপুর উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রাম। এখানেই ৩২ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ফকির চাঁদ বৈষ্ণবের মন্দির ও সমাধি। গ্রামবাসীদের কেউ বলেন সাধুর আশ্রম, আবার কেউ বলেন গোঁসাইবাড়ি। কথিত আছে, একসময় এখানে দেশের যোগী সম্প্রদায়ের একটি কেন্দ্র ছিল, এখনো আছে। প্রতিবছরের ন্যায় গত ৫ ডিসেম্বর ২০২১ দুই দিনব্যাপী ৩২৪তম নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। নারী-পুরুষনির্বিশেষে ভক্তরা আশ্রমে পৌঁছেই শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাই ও তাঁর শিষ্য সাধুদের সমাধিতে ভক্তি-শ্রদ্ধা জানান। একই সময়ে আশ্রম প্রাঙ্গণে চলে মেলা।
উৎসবের প্রথম দিন আশ্রম প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে বসে গোঁসাইয়ের ভক্তরা কলার পাতায় খিচুড়ি, পাঁচ তরকারি ও পায়েস খান। গোঁসাইজীর আবির্ভাব ও জীবন-চরিত আলোচনা। সেবা লাভের আশায় নানা পদ্ধতিতে করেন মানত। প্রিয় এই জায়গার উন্নয়নে সাধ্যমতো দানও করেন তাঁরা।
আশ্রমের প্রধান ফটকে লেখা রয়েছে বাংলা ১১০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোঁসাইয়ের সৎসঙ্গ সেবাশ্রম। নি:সন্তান-বন্ধ্যা নারীরা অক্ষয় তলায় বটগাছের নিচে সদ্য স্নান শেষে ভেজা কাপড়ে বসে আঁচল বিছিয়ে সন্তান লাভের জন্য ভীখ মাংগছেন। কথিত আছে, যদি গাছের ফল বা পাতা আঁচলের ওপর পড়ে তাহলে নি:সন্তান নারী সন্তান লাভ করবে।
ধ্যান-তপস্যার জন্য রামকৃষ্ণপুর গ্রামে একটি বটগাছের নিচে আসেন ফকির চাঁদ বৈষ্ণব। সেখান থেকেই বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার শুরু করেন তিনি। বৈষ্ণব হলো সনাতন ধর্মের একটি শাখা সম্প্রদায়। তাঁর শিশ্য পরান চাঁদ এখানেই পরলোক গমন করেন। আর মোহন চাঁদ ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন থানার ঘটিকা গ্রামে গিয়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে ধর্ম প্রচার করেন। তিনি সেখানেই সমাধিস্থ হন।
তাঁতি পরিবারে জন্ম নেওয়া ফকির চাঁদ বৈষ্ণব ছিলেন অবিবাহিত। তার বাবার নাম নবকৃষ্ণ, মা যশমতি। সেই সময় সহযোগী পরাণ চাঁদকে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তিতে যেতেন তিনি। কিন্তু তারা বিভিন্নভাবে মানুষের নিগ্রহের শিকার হতেন। এ কারণে আর ভিক্ষাবৃত্তিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ফকির চাঁদ। এমন সময় গ্রামে দেখা দেয় কলেরা। এতে মানুষের প্রাণহানি হতে লাগলো। তখন গ্রামের মানুষ তার কাছে গেলে তিনি অভয় দেন। এরপর কলেরা বন্ধ হয়ে যায়। এতে সন্তুষ্ট হয়ে স্থানীয় জমিদার মদনমোহন আশ্রম তৈরিতে জমি অনুদান দেন তাকে। তার বৈষ্ণব তত্ত্বের সুবাদে তৈরি হয় হাজার হাজার ভক্ত। এখনও তাদের সমাগম দেখা যায় প্রতিদিন।
উৎসবে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্ত ও সাধক সমবেত হন। এসব আয়োজনে ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের আবির্ভাব, তার জীবন চরিত্রের ওপর আলোচনা, গীতা পাঠ অনুষ্ঠান ও সুধী সমাবেশ হয়। আশ্রমের সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে প্রতিদিনের খরচ চালানো হয়। সাধুদের আহারের জোগাড় আশ্রমই করে থাকে। এক্ষেত্রে আশ্রমের পুকুর-জমি থেকে আয় ও ভক্তদের দানই ভরসা।
উৎসবের সময় আশ্রমে এসে স্নান করে নতুন সাদা কাপড় পরে ভাবের দীক্ষা নিতে হয় বৈষ্ণব ধর্মের ভক্তদের। প্রধান সেবায়েত ভাব মন্দিরে তাকে ভাবদীক্ষা দেন। ভক্ত তার নিজের পছন্দের যেকোনও সাধুর কাছ থেকেও দীক্ষা নিতে পারেন। এছাড়া রয়েছে ‘ইষ্টবীথি’র সুযোগ। এটি হচ্ছে, রোজ এক টাকা বা সাধ্যমতো যেকোনও পরিমাণ টাকা জমা করা। এভাবে বছরান্তে জমানো অর্থ দিয়ে তিনি সাধুসেবা করতে পারেন।
অতিথিশালায় যতদিন খুশি থাকা যায়। নিয়ম অনুযায়ী এখানে নিরামিষ খেতে হয়। নিত্যদিন সকালে ফকির চাঁদের মঠে প্রধান সেবায়েত সাধুরা খালিপেটে ফল-মূল, দুধ, মিষ্টান্ন দেওয়ার পর তা খেয়ে থাকেন। দুপুরে ভাত, ডাল, সবজি আর রাতে সকালের মতো খাবার বেছে নেন তারা।
আশ্রমের ৪৮তম প্রধান সেবাইত শ্রী পরমানন্দ সাধু বগুড়ার জোড়া গ্রাম থেকে ২০১৪ সালে আসেন। ২০১৬ সালে প্রধান সেবাইত হন। তাঁরা বংশ পরম্পরায় সাধু হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গাইবান্ধার দুলালী গ্রামের ভক্ত প্রাণবন্ধু বর্মন (৮১) বলেন, ‘বংশ পরম্পরায় ছোট থেকেই আমি এখানে আসছি। টানা ৯ বছর ধরে গোঁসাই ভক্ত কমিটির সভাপতি হিসেবে সেবা দিচ্ছি। এখানে এলেই আমি অজানা এক মায়ায় হারিয়ে যাই, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’
রাজশাহীর পুঠিয়ার ভক্ত অনিক কুমার (৭২) বলেন, তিনি ভক্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন। এ বছর উৎসবে ১২ থেকে ১৫ হাজার ভক্ত এখানে এসেছেন। দুই দিনের থাকা ও খাওয়ার সব ব্যবস্থা আশ্রমের পক্ষ থেকে করা হয়ে থাকে।
বাল্যসাধু হওয়ার ব্রত নিয়ে গাইবান্ধার ছাবরহাটি থেকে এসেছেন অপূর্ব বর্মন (১৪)। নাপিত বীরেন শীল তার চুল কেটে দিয়ে সাধু হিসেবে দীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করছেন।
আশ্রমের প্রধান সেবাইত শ্রী পরমানন্দ সাধু বলেন, দুড়দুড়িয়ার নওপাড়া (রামকৃষ্ণপুর) গ্রামে বাংলা ১১০৪ সালে একটি বটগাছের নিচে আস্তানা গাঁড়েন ফকির চাঁদ বৈষ্ণব। ধ্যান-তপস্যা ও বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার শুরু করেন। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে দোল পূর্ণিমা, জ্যৈষ্ঠ মাসে গঙ্গা স্নান ও অগ্রহায়ণ মাসে নবান্ন উৎসব উপলক্ষে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্ত সাধক সমবেত হন।
১২৭৪ সনে সাধু ফকির চাঁদ বৈষ্ণবের অদৃশ্য হওয়ার পর (বাংলাদেশের প্রথম গোঁসাই সমাধি বলে জানা যায়) আশ্রমটি কালের সাক্ষী বহন করছে গোঁসাইয়ের দেখানো মার্গ ও মানবতার স্মৃতি। প্রায় ৪৫ ফুট উচ্চতার নিপুণ নকশা খচিত প্রধান ফটকে লেখা আছে ‘স্থাপিত ১১০৪ বাংলা’, অর্থাৎ আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এটি নির্মিত। এখানে ৩২ বিঘা জায়গা জুড়ে রয়েছে ফলজ বৃক্ষ, পূজনীয় ফুলের গাছ ও শানবাঁধানো দুইটি সুবিশাল পুকুর। জনশ্রুতি আছে, এক সময় বিনা অনুমোতিতে পুকুরের মাছ নিয়ে গিয়ে রান্না করলে তা সিদ্ধ হতো না এবং খাওয়া যেত না।
আশ্রমের প্রবেশ পথে রয়েছে ময়ূর, বাঘ ও বিভিন্ন প্রাণির মূর্তি এবং লতা-পাতা কারুকার্য খচিত সুবিশাল ফটক। দ্বিতল এই প্রবেশ পথের ওপর তলাটি সাধারণত ব্যবহৃত হতো অতিথিশালা হিসেবে। কারুকার্য খচিত প্রবেশ পথের বাম পাশে বিশাল দিঘি। আখড়া প্রাঙ্গণে খালি পায়ে প্রবেশ করতে হয়। প্রধান ফটক পার হয়েই ডান পাশে রয়েছে ভক্ত সাধু ও সাধু মাতাদের আবাসন। বাম পাশে রয়েছে সাধুদের সমাধি মন্দির। একটু সামনেই রয়েছে শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণবের চার কোনা প্রধান সমাধি স্তম্ভ। বর্গাকৃতির ৪০ ফুট সমাধি সৌধের রয়েছে আরেকটি ৩০ ফুট গৃহ। এর একটি দরজা ছাড়া কোন জানালা পর্যন্ত নেই। মূল মন্দিরে শুধুমাত্র প্রধান সেবাইত প্রবেশ করেন। কাথিত আছে, মন্দিরের মধ্যে সাধু ফকির চাঁদ স্বশরীরে প্রবেশ করে ঐশ্বরিকভাবে স্বর্গ লাভ করেন। তার শবদেহ দেখা যায়নি। তাঁর পরিধেয় বস্ত্রাদি সংরক্ষণ করে সমাধি স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। গম্বুজ আকৃতির সমাধির উপরিভাগ ঘেরা রয়েছে। ঘরের দেওয়াল ও দরজায় বিভিন্ন গাছ, লতা-পাতা খচিত কারুকার্য শোভা পাচ্ছে। ভেতরে রয়েছে ঝাড় বাতি। সোনা, রোপা ও কষ্ঠি পাথরে তৈরি মূল্যবান কারুকার্যগুলি চুরি হয়ে গেছে।
আশ্রমের মধ্যে রয়েছে বিশাল আকৃতির এক কুয়া। যার একটি সিঁড়ি পথ রয়েছে পাশের রান্না ঘরের সাথে সংযুক্ত। এই সিঁড়ি পথে সাধুরা রান্নাসহ পানিয় জল সংগ্রহ করতেন। বর্তমানে কুয়ার পানি ব্যবহার অযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। তার পাশেই রয়েছে ভক্তদের জন্য আরেকটি কুয়া। বড় বড় মাটির চুলায় রান্না হয় ভক্তদের প্রসাদ।
আশ্রম চত্ত্বরে রয়েছে ভক্ত-সাধুর সমাধির প্রধান কয়েকজন হলেন, ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাই (১২৭৪), পরাণ চন্দ্র সাধু (১৩০৭), মহেন্দ্র যোগেন্দ্রময়ী মাতা (১৩৩৫), অমৃত যোগে জয় মঙ্গল সাধু (১৩৩৬), সুন্দর মাতা (১৩৪১), সুখময়ী মাতা (১৩৪৩), শতদল মাতা (১৩৮১) প্রমুখ।
আশ্রমের সাধু ও মাতারা হলেন, ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাই, ক্ষেপীমাতা, মোহন চাঁদ, পরান চাঁদ, গোবিন্দ সাধু, প্রেমানন্দ সাধু, রামচরণ সাধু, বড় হরিসাধু, বেনীমাধব সাধু, যুধিষ্ঠীর সাধু, ছোটহরি সাধু, রাজকুমার সাধু, ধনী সাধু, জয়মঙ্গল সাধু, মেঘনাদ সাধু, স্বরূপ সাধু, প্রানবন্ধু সাধু, বলরাম সাধু, দুর্লভ সাধু, মহেশ সাধু, সত্য সাধু, উজ্জ্বলা মাতা, সাগরী মাতা, জয়মনি মাতা, কুঞ্জ মাতা, রাসমনি মাতা, গুণময়ী মাতা, কামিনী মাতা, সেতু মাতা, সুখী মাতা, সদানন্দ সাধু প্রমুখ।
পরিচালনা কমিটির সভাপতি শ্রী সঞ্জয় কুমার কর্মকার বলেন, এই আশ্রমে ৩২৪তম নবান্ন উৎসব উদযাপিত হয়েছে। আশ্রমটি পরিচালনার জন্য কমিটি গঠন করে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আশ্রম প্রাঙ্গনে সিএস রেকর্ড অনুযায়ী ১০.৫০ একর (আরএস ১০.২৮ একর), নওপাড়া মৌজায় ০.৬৮ একর, রাজশাহীর বাঘার সুলতানপুর মৌজায় ১.১০ একর এবং নওগাঁর আত্রাইয়ে ১ একরসহ মোট ১৩.২৮ একর জমি আশ্রমের নামে আছে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top