logo
news image

দুনিয়া কাঁপানো বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা জুলভার্ন

জালাল উদ্দীন বাবু।।
অথচ ৪০ বছর ছিলেন চিলে কোঠার বন্দী (প্রথম পার্ট)
 জুল ভার্নের কল্পনায় যেনো আজকের বাস্তব বিজ্ঞান।  বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। যুগের চেয়েও অনেক যুগ এগিয়ে থাকা মানুষ একজন মানুষের  নাম জুল ভার্ন। আসলে তাকে কোনো বিশেষনেই বিশেষায়িত করা যায় না। কারন তার প্রতিটা লেখাই এক বিস্ময়।  বিজ্ঞানের যে সকল আবিষ্কার নিয়ে আজ আমরা গর্ব করি সেই গর্বের বস্তু গুলোতে চড়ে তার গল্পের নায়কেরা সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে। শুধু তাই না তার বাস্তোবিক প্রয়োগ করেছে। উড়োজাহাজ, রকেট,  সাবমেরিনের বাস্তবিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ, মহাকাশ ভ্রমণ ও সমুদ্রের তলদেশে ভ্রমণ, বেলুনে ভ্রমন, মেট্রো রেল ভ্রমণ সকিছুই জেন ছিল তার হাতের খেলনা। এই সব ভ্রমনে তিনি যা দেখেছেন যা বর্ণনা করেছেন তাও আজ প্রায় সবই বাস্তব। পাতাল অভিযান, মেরু অভিযান, শুকনা মরিভুমিতে শহর গড়া সব খানেই তার অবাধ বিচরন। টেলিফোনে কথা বলা এমন  কি ভিডিও কনফারেন্স এ কথা বলেছে   তার গল্পের নায়কেরা  তার চেয়েও বড় বিস্ময় প্রিয় পাঠক তিনি যখন এই ভাবে কল্পনার জগতে তার নায়কদের ঘিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন ইচ্ছে মত সেই সময় প্রায় ৪০ বছরের অধিক কাল তিনি এক চিলে কোঠাই প্রায় বন্দী জীবন-যাপন করতেন।
জুলভার্ন এর জন্মঃ
পুরোনাম  জুল গাব্রিয়েল ভার্ন (ঔঁষবং এধনৎরবষ ঠবৎহব)।  জন্ম ৮ ফেব্রুয়ারি  ১৮২৮ মৃত্যু- ২৪মার্চ , ১৯০৫ । একজন ফরাসি লেখক হিসেবে পরিচিত।  অসামান্য সব বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী রচনার জন্য বিখ্যাত।
কল্পনার পাখায় ভর দিয়ে ভেসে বেড়াতেন তিনি। তবে তিনি তার কল্পনাকে শুধু নিজের মধ্যেই নিজের জন্য  সীমাবদ্ধ রাখেননি, বিশ্বব্যাপী  ছড়িয়ে দিয়েছেন কল্পবিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে । অপ্রতিদ্বন্দ্বী কল্পবিজ্ঞান এর এই  লেখক কে অনেকেই কল্পবিজ্ঞানের জনক ও বলে । তার বর্নিত ১০৮ টি যন্ত্রের ৬৪ টি বাস্তবে রুপ পেয়েছে ।  
শৈশব কালঃ
 ফ্রান্সের পশ্চিমে বিস্কে উপসাগরের তীরের নঁত নামের এক বন্দর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জুল ভার্নের পিতা পিয়েরে ভার্ন ও মা সোফি এলো দে লা ফুয়ে। পিতা ছিলেন সেখানকার নামকরা আইনজীবী। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হবার কারণে আইনজীবী পিতার ইচ্ছাপূরণের ভার বর্তায় জুল ভার্নের ওপরেই । তাই সে ও যায় আইন বিষয়ে পড়াশুনা করতে  প্যারিসে।  প্যারিসে গিয়ে জুল ভার্নের সাহিত্যপ্রেমে দোলা লাগে ।  আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে বেশ প্রসারও লাভ করেন। কিন্তু খুব দ্রুত এ পেশার প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েন এবং ১৮৬৭ সালে  পাড়ি জমান আমেরিকায় আইন ব্যবসা ছেড়ে।
 জুল ভার্নের লেখার প্রতি অনুপ্রেরণাঃ
১৮৩৪ সালে, নঁতে শহরের বোর্ডিং স্কুলে দেখা পান স্কুলের শিক্ষিকা ম্যাডাম স্যাম্বিনের। তার স্বামী, নৌবাহিনীর এক অধিনায়ক ছিলেন যিনি  প্রায় ৩০ বছর আগে হারিয়ে গেছেন। ম্যাডাম স্যাম্বিন তাঁর ছাত্রদের প্রায়ই বলতেন,  জাহাজডুবির ফলে হারিয়ে গেছে তাঁর স্বামী। তাঁর দৃঢ় এমন বিশ্বাস ছিল যে, কিংবদন্তি চরিত্র ‘রবিনসন ক্রুসো’র মতই ‘নিরাশার দ্বীপ’ (ওংষধহফ ড়ভ উবংঢ়ধরৎ) থেকে তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামী হঠাৎ  একদিন ফিরে আসবেই তাঁর কাছে। শিক্ষিকার এমন আশাবাঞ্জক কথাগুলি জুল ভার্নের মনের গভীরে ছাপ ফেলে। এই ছাপ এতটাই গভীর ছিল যে তার লেখা ঞযব গুংঃবৎরড়ঁং ওংষধহফ, ঝবপড়হফ ঋধঃযবৎষধহফ, ঞযব ঝপযড়ড়ষ ভড়ৎ জড়নরহংড়হং সহ, তাঁর লেখা বহু উপন্যাসে সেই সাহিত্যধারাকে আমরা বার বার ফিরে আসতে দেখেছি।
১৮৩৬ সালে জুল ভার্নের পিতা পিয়ের ভার্ন অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে লোয়ার নদীর তীরবর্তী সঁৎনে গ্রামে একটি বাড়ি কিনেছিলেন। নদীর প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ। তাকে এই নদীর বুকে ভেসে যাওয়া পাল তোলা জাহাজগুলি তাঁর ফেরারি মনকে রাঙ্গিয়ে দিতো এক অলীক কল্পনার মায়াবী জগতে। এছাড়া ছেলেবেলায় তিনি বহুবার তিনি গেছেন পাশের শহরে মামার বাড়ী।  মামা প্রুইদঁ অ্যালোট ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জাহাজের নাবিক। তার কাছে  সারা বিশ্ব ভ্রমণ কাহিনী শুনে কেটেছে কত দুপুর, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। তাঁর  বহু কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসে  মামার কাছ থেকে  শোনা ভ্রমণকাহিনিগুলি অমরত্ব লাভ করেছে বলে অনেকে ধারনা করেন।
১৮৩৯ সালে ১১ বছর বয়সে গোপনে ইন্ডিজ পালিয়ে যেতে চেয়েছিল ‘ঈড়ৎধষরব’ নামে এক জাহাজের কেবিন-বয়ের চাকরি নিয়ে ।  উদ্দেশ্য ছিল ২টি  বিদেশ ভ্রমণ,  বোন ক্যারোলিনকে প্রবালের কন্ঠহার উপহার দেবে। কিন্তু  ধরা পড়ে যান পিতার কাছে। স্বভাবতই দুঃখে ক্ষোভে প্রতিজ্ঞা করেছিল, এবার ভ্রমণ করবেন ‘শুধু কল্পনার রাজ্যে’ তাও কেবল কাগজে-কলমে। তাই বোর্ডিং স্কুলে থাকাকালেই জুল ভার্ন শুরু করেন ছোট গল্প ও কবিতা লেখা। আর এভাবেই শুরু হয় কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথে তাঁর যাত্রা।
সাহিত্যে জুলভার্নঃ
মঞ্চনাটক  এর রচয়িতা হিসেবে সাহিত্যাঙ্গনে জুল ভার্নের প্রবেশ ঘটে, তার প্রথম নাটকটি ছিল একটি একাঙ্কিকা- ‘ব্রোকেন স্ট্রোস’। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি আইনের পেশাও চালিয়ে যান জুল ভার্ন।  কিন্তু পারেনি জুল ভার্ন নিজের সাথে মিথ্যাচার করতে । ১৮৫২ সালে আইন ব্যবসা  বাদ দিয়ে জুল ভার্ন ‘থিয়েটার লিরিক’ এ সেক্রেটারি  নিযুক্ত হন। এখানে  থাকাকালীন তিনি রচনা করেন ‘ব্লাইন্ড ম্যান’স ব্লাফ’ ও ‘দ্য কম্প্যানিয়নস অফ দ্য মার্জোলাইন’ এর মত বিশ্রুত  নাটক।
১৮৫৬ সালে জুল ভার্ন অনরাইন দি ভিয়েনার  নামক এক  বিধবার সাথে  হৃদয়ের বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন।  তার দু’টি মেয়েও ছিল। তবু  ১৮৫৭ সালে তারা বিয়ে করেন এবং দুই মেয়ের যাবতীয় দায়িত্ব নেন জুল ভার্ন। বাড়তি পরিবারের জন্য প্রয়োজন পড়ে বাড়তি রোজগারেরও, স্টোকব্রোকার হিসেবে নুতুন কাজ শুরু করলেও কখনোই তিনি তার সাহিত্যচর্চা ছাড়েননি  ।  
তার লেখনীতে ব্যাপক উৎসাহ তৈরী হয় যখন ১৮৫৯ সালে তিনি অনরাইন ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশ্যে  জাহাজযাত্রায় যোগ দেন।  ১৮৬১ সালে তাদের একমাত্র পুত্রসন্তান মাইকেল ভার্নের জন্ম হয়।
প্রথম বই প্রকাশের গল্পঃ
রাগে-দুঃখে ক্ষোভে হতাশায় পুড়ছে তার মন। সামনে সর্বগ্রাসী আগুনের কুন্ডলী। পুড়িয়ে ফেলবেন তার এই পান্ডুলিপি । প্রথম উপন্যাস লেখার পর ঘুরেছেন প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ।  কিন্তু এমন উদ্ভট কল্প কাহিনি  কেউ ছাপতে রাজি নয়। ভেঙ্গে পড়েছে তার স্বপ্ন। একটু দীর্ঘশ্বাস তারপর সামান্য দ্বিধা নিয়ে শেষ পর্যন্ত  আগুনেই ছুড়লেন পাণ্ডুলিপিটি। এখন  অপেক্ষা শুধু  কিছু সময়ের। দাউ দাউ আগুনে  পুড়ে ছাই হচ্ছে সাধের প্রথম উপন্যাসটি। সেই সাথে মৃত্যু ঘটছে এক লেখক সত্ত্বারও ।  করুণ চোখে সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য দেখছেন জুল ভার্ন নিজেই । মনে এক নিদারুন আবেগ আর কোনো দিন লিখবেন না তিনি।
কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা সব সময়ই  ভিন্ন ।  ঘটনা বুঝতে পেরে ঝড়ের বেগে কোথা থেকে  ছুটে এল এক নারী।  লেলিহান শিখা থেকে পাণ্ডুলিপিটি তুলে নিলেন।  ঝটপট আগুন নিভিয়ে দিলেন । সেদিন অল্পের  জন্য রক্ষা পেল বিখ্যাত একটি লেখা।  সেই নারী আর কেউ নন তারই  স্ত্রী ।
এরপরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। লেখকের স্ত্রী নিজেই এক প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছাপার ব্যবস্থা করলেন পাণ্ডুলিপিটি।  ১৮৬৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে  ফারসি ভাষায়  প্রকাশিত হলো  ‘কিংক সিমেইনস এন বেলুন’ নামে বইটি। পরে ইংরেজিতে অনুবাদ হয় ‘ফাইভ উইকস ইন এ বেলুন’  (বাংলায় বেলুনে পাঁচ সপ্তাহ) শিরোনামে ।  দুঃসাহসী অভিযানের সেই উপন্যাস টির মাধ্যমেই লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেলো। কারন সেই সময় তিনি পৃথিবীর এমন কিছু বিবরন দেন যা সেই সময়ের পরিবেশে কারো পক্ষেই জানা সম্ভব ছিলো না।   এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি তাকে ।   জেনে রাখা ভালো যে, এই বইয়েরই সিক্যুয়েল হিসেবে আমরা পেয়েছি আরেক জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড’। এই বই এই দেখা পাই আমরা ক্যাপ্টেন নিমো আর হার্ডিংয়ের, দেখা পাই কাল্পনিক ডুবোজাহাজ নটিলাসের।
কিছু যাদুকরি বইঃ
১৮৬২ সালে প্রকাশক হ্যাটজেলের সাথে পরিচয়  ছিল জুল ভার্নের জীবনের একটি অন্যরকম মোড়। হ্যাটজেল জুল ভার্নের লেখার সব রকম পৃষ্ঠপোষকতা করেন ও তাকে আরো লিখতে উৎসাহ  দেন এই প্রকাশক ।  
১৮৬৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘ঋরাব ডববশং রহ ধ ইধষষড়ড়হ’ উপন্যাসটি প্রকাশ  এর পর
প্রকাশক পিয়ের-জুল হ্যাটজেলের সহযোগিতায় লিখেন নিখুঁত গবেষণালব্ধ কল্পবিজ্ঞাননির্ভর অভিযান  এর নামকরণ করা হয় ‘ঠড়ুধমবং বীঃৎধড়ৎফরহধরৎবং’ (অসাধারণ ভ্রমণ)।  তাঁর আশ্চর্য কলমের জাদুকরী ছোঁয়ায় যে সাহিত্যের জন্ম হয়েছিল তা কল্পবিজ্ঞানের জগতে ইতিহাসই সৃষ্টি করেনি জুল ভার্ন কেও করেছে অমর ।  ১৮৬৩ সাল থেকে ১৯০৫  সাল এই ৪২ বছরে  ‘ঠড়ুধমবং বীঃৎধড়ৎফরহধরৎবং’ মূল শিরোনামের অধীনে তিনি ধারাবাহিকভাবে চুয়ান্নটি অসাধারণ কল্পবিজ্ঞাননির্ভর অভিযান কাহিনি লিখেছিলেন। তিনি ফরাসি ভাষায় লিখলেও বেশিরভাগ বই ইংরেজিতে অনুদিত হয়েছে। ইংরেজিতে অনুদিত উল্লেখযোগ্য বই হলো- ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ (১৮৬০), ‘আ জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ’ (১৮৬৪), ‘ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন’ (১৮৬৫), ‘টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ (১৮৬৯), ‘দ্য মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড’ (১৮৭৫), ‘মাইকেল স্ট্রগফ’ (১৮৭৫), ‘দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি’ (১৮৭৭) এবং ‘দ্য পারসেজ অব দ্য নর্থ পোল’ (১৮৮৮)। দি অ্যাডভেঞ্চার অফ ক্যাপ্টেন হ্যাটেরাস, অ্যারাউন্ড দা মুন,  দা ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ, ইন টু দ্য নাইজার ব্যান্ড , এন এন্টার্টিক মিস্ট্রি , সিটি ইন দ্য সাহারা , টাইগার্স এন্ড ট্রেইটর্স  প্রভৃতি। বাংলাদেশের সেবা প্রকাশনি থেকে তার অনেক গুলো বই এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যে কেউ কালেকশন করে পড়তে পারেন এই অমর বই গুলো।
জুল ভার্ন এর  লেখায় কল্পনার পাশাপাশি সমসাময়িক ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে ।  ফরাসি ভাষায়  লিখিত বইগুলি  অধিকাংশ  অনুদিত হয়েছে  ইংরেজী ভাষায়। আগাথা ক্রিস্টির পর পৃথিবীতে যাঁদের বই সবচেয়ে বেশি অনুদিত হয়েছে তাদের মধ্যে  প্রথম  জুল ভার্ন ।  
দ্বিতীয় পর্বে পড়ুন  অপ্রকাশিত বিস্ময়কর  বই  ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ও দুনিয়া কাপানো বিস্ময়ের  জুলভার্ন সম্পর্কে ।
দুনিয়া কাঁপানো বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ দ্রষ্টাঃ যার কল্পনা-আজ বাস্তব
অথচ ৪০ বছর ছিলেন চিলে কোঠার বন্দী (দ্বিতীয় পার্ট)
প্রথম পার্ট এ আমরা জুল ভার্নের জীবনের বিভিন্ন দিক জেনেছি । দ্বিতীয় পার্ট এ আমরা বাকি অংশ জানবো।
অপ্রকাশিত বিস্ময়কর  বই  ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরিঃ
তালাবন্ধ ব্রোঞ্জের বাক্স  । হাতে ঘুরছে পারিবারিক সূত্রে। কিন্তু কি আছে কেউ খোলেনি সেই বাক্স। চেষ্টাও  করেনি খোলার । গুপ্তধনের প্রত্যাশায় খুলে বাক্সটিতে  পাওয়া গেল কিছু কাগজপত্র আর একটি পান্ডুলিপি। মৃত্যুর ৯০ বছর পর উদ্ধার হওয়া আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে,  ১৮৬৩ সালে লিখিত ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ পরিবারকে হয়তো গুপ্তধন পাইয়ে দেইনি কিন্তু বিশ্বকে হতবিহবল করে দিয়েছিল।
এখন হয়তো আমাদের আগ্রহ কম । কারন আমরা প্রযুক্তিগতভাবে বর্তমানে  মেট্রোরেল, হাই-স্পিড ট্রেন,  শপিং মল, ক্যাব, ইলেকট্রিক চেয়ার, ইলেকট্রিক লাইট,  রিমোট কন্ট্রোল উপভোগ করছি। অথচ ১৮৬৩ সালে লিখিত বইটিতে একটি ছেলের ১৯৬০ সালে এই রকম পরিবেশে বেঁচে থাকার গল্প। ১৯৬০ সাল এখনও ৪০  বছর ।  আজকের চারপাশের পরিবেশ এর সাথে সেই ছেলেটির জীবন-যাপনের কি অদ্ভুদ মিল। আজকের এই আধুনিক সভ্যতায় দাপটের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে ১৮৬০ সালের একটি গল্পের নায়ক।  ঘুরছে হাইস্পিড ট্রেন এ, ব্যবহার করছে রিমোট, ইচ্ছেমত ব্যবহার করছে ইলেকট্রিক লাইট, ইলেকট্রিচ চেয়ার   আরও কত কিছু । ভাবুন তো কেমন লাগে!!!
যাইহোক জিন জুল ভার্নের ৪র্থ প্রজন্ম বইটি খুজে পাই এবং বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। আর তাতেই ঝড় উঠে  যায় চারিদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে। অবশেষে মাত্র ২বছর এর মধ্যেই ১৯৯৬ সালে বইটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হয় ।
দুনিয়া কাপানো বিস্ময়ের  জুলভার্নঃ
আলোচিত ও সাড়া জাগানো ভবিষৎবাণী
 বিখ্যাত ভবিষৎবক্তা ঘড়ংঃৎধফধসঁং এর পরে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন  তুলে  জুল ভার্ন।  তার বেশিরভাগ ভবিষৎবাণী প্রযুক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞানকে ঘিরে । তার ভবিষ্যতবানী গুলো পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিন এ আলড়িত করে ফেলেছিল। তার যুদ্ধ ও বিশ্ব মানচিত্র নিয়ে  করা অনেক কথাই সত্য হয়েছে ।
তবে জুল ভার্ন এর সবথেকে বড়ো আলোচিত ও সারা ফেলে দেয়া ভবিষৎবাণী ছিলো ভারত ও পাকিস্তান এর সাথে হওয়া প্রথম যুদ্ধ নিয়ে। জুল ভার্ন ভবিষৎবাণী করেছিলেন পাকিস্তান টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এবং বিশ্ব দরবারে ভারতের মান সম্মান বৃদ্ধি পাবে।
উনবিংশ শতাব্দীতে প্রকাশিত বই গুলো বিংশ শতাব্দীতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়। কারন এই শতাব্দীর  আবিষ্কৃত ও বহুল ব্যবহৃত টিভি, থ্রিডি মুভি, মোবাইল , রোবট এমন আধুনিক প্রযুক্তির কথাই শুধু বলেন নি তার ব্যবহার ও দেখিয়েছেন জুল ভার্ন । তাই অনেক গবেষক এখন  নিরন্তর গবেষণা করে চলছে তার অনাবিষ্কৃত ভবিষৎতের প্রযুক্তি  নিয়ে।
বিশ্ব  কল্প বিজ্ঞান সাহিত্যে জুল ভার্ন একটি কিংবদন্তি । ‘ফাদার অফ সায়েন্স ফিকশন’-এর কাছ থেকে বহু স্মরণীয় উপন্যাস পেয়েছে সাহিত্যজগত।  যেখান থেকে  অনেক বিখ্যাত সিনেমা, নাটকও মঞ্চস্থ হয়েছে।
তার লেখা বইতে  এমন বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বা আবিষ্কারের কথা বলা হয়েছে তা আজ আর কল্পনায় নেই হয়ে গেছে  বাস্তব। জুল ভার্ন বিজ্ঞানী ছিলেন না, ছিলেন না কোনো  জীববিজ্ঞানী, পদার্থ বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ,  জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূতত্ত্ববিদ,  জীবাষ্মবিজ্ঞানী,  সমুদ্রবিজ্ঞানী আবার ভুগোলবিদও নয়।  তবু  তার লেখনীতে সবকিছুরই খুটিনাটি উঠে এসেছে। ধারনা করা হয় তার লেখনীতে ইন্ধন জুগিয়েছে তার বিজ্ঞান ও ভূগোল সম্পর্কে  অদম্য কৌতূহল আর তাতে রং ঢেলেছে  ব্যতিক্রমী কল্পনাশক্তি।
‘টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড লীগস আন্ডার দ্য সী’তে নটিলাস নামক যে ডুবোজাহাজের  আমরা দেখি তা আজ বাস্তব সাবমেরিন।
উড়োজাহাজ এর কল্পনাও ছিল যখন কল্পনাতীত, তখন ‘ইন টু দ্য নাইজার ব্যান্ড’ বইয়ে দেখি ‘হেলিপ্ল্যান(হেলিকপ্টার+এরোপ্ল্যান)’ যন্ত্রকে উড়িয়েছেন।
মরুভূমি যখন মানুষের অভিশাপ।  পানির দেখা পাওয়া যেখন নিছক আকাশকুসুম ভাবনা, তখন ‘সিটি ইন দ্য সাহারা’তে জুল ভার্ন  সমস্ত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে রীতিমতো আধুনিক শহর গড়ে তোলেন বিজ্ঞান সম্মতভাবে !
১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই  নীল আর্মস্ট্রং  যখন চাঁদে পা রাখেন, তার প্রায় ১০০ বছর এর অ বেশী  আগে জুল ভার্ন কল্পনায় পউছে গেছেন চাঁদে ‘জার্নি টু দ্য মুন’ বইয়ে ।
বাঙ্গালী বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু যখন বেতারের ধারণাও দেন নি, ‘কার্পেথিয়ান ক্যাসল’ বইয়ে জুল ভার্ন বেতারের সুস্পষ্ট  আভাস দেন । জুল ভার্নের কল্পনাপ্রবণ চিন্তার প্রবলতা  আজ বাস্তব তাই বুঝতে অক্ষম আমরা। সেই ময়ের পাঠক হলেই বুঝতাম কত অগ্রগামী ছিল তার মস্তিষ্ক!
তার ‘টাইগার্স এন্ড ট্রেইটর্স’ উপন্যাসটি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ আশ্রিত একটি উপন্যাস, এতে ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বর্ণনা রয়েছে এতে তিনি উল্লেখ করেছেন পাকিস্থান ভেঙ্গে খান খান হবে।
জুলভর্নের  কাল্পনিক প্রয়োগ  বর্তমানে কমবেশি বৈজ্ঞানিক সত্যে পরিণত হয়েছে।  যা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে সফলভাবে বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে এমন কিছু বিস্ময় নিম্নে তুলে ধরা হলো।
বৈদ্যুতিক সাবমেরিন
ষোড়শ শতক থেকেই ডুবোজাহাজ বানানোর ছেস্টা করলেও  ‘ঞবিহঃু ঞযড়ঁংধহফ খবধমঁবং টহফবৎ ঃযব ঝবধ’ নামক  তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাসটির গল্পের নায়ক ক্যাপ্টেন নিমো সর্বপ্রথম সাগরতলে ঘুরে বেড়িয়েছেন একটি ডুবোজাহাজে চেপে  ।  সেই  ডুবোজাহাজটির নাম ছিল নটিলাস। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, সেই ডুবোজাহাজটি চলত বিদ্যুতের সাহায্যে! ১৮৭০ সালে লেখা এই উপন্যাসটি প্রকাশের সময়কালে  সাবমেরিন  কেন , বিদ্যুতের সাহায্যে যে কোনও যানবাহন চালানো যেতে পারে এটাও  কার ভাবনেতেই ছিল না। উল্লেখ্য প্রথম ডুবোজাহাজ চালানর ছেস্টা করে ফ্রান্স ১৮৮৮ সালে।
হেলিকপ্টার
মানুষের উড়বার ইচ্ছে সেই আদিম কাল থেকেই।  নীল আকাশে পাখিদের উড়তে দেখে  দীর্ঘ মানব ইতিহাসজুড়ে জেনেছি কৃত্রিমভাবে আকাশে উড়বার  তীব্র প্রচেষ্টা। ১৫০২ সালে  একটি হাতে লেখা পুঁথি ‘ঈড়ফবী ড়হ ঃযব ঋষরমযঃ ড়ভ ইরৎফং’ এ  লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি উড়োজাহাজের নকশা করেছিলেন ।  পরব্ররতীতে ১৯০৯ সালে  উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট ২ভাই প্রথম সফলভাবে যান্ত্রিকশক্তি সম্পন্ন বিমান উদ্ভাবন করেন। তার অনেক পরে, ১৯৩৬ সালে, ঋড়পশব-ডঁষভ ঋি ৬১ নির্মিত হয়, যা ছিল পৃথিবীর প্রথম সফলভাবে কার্যকরী হেলিকপ্টার।  কিন্তু তার বহু আগেই জুল ভার্ন এক ভবিষৎ স্বপ্নের উড়ানের কথা কল্পনা করেছিলেন। ১৮৮৬ সালে, ‘জড়নঁৎ ঃযব ঈড়হয়ঁবৎড়ৎ’ উপন্যাসে জুল ভার্ন যখন বাতাসের তুলনায় ভারী একটি মোটরচালিত উড়োজাহাজের কথা লিখেছিলেন তখন যান্ত্রিকশক্তি সম্পন্ন উড়োজাহাজের কথা কেউ ভাবতেও পারত না। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রোবার দ্বারা উদ্ভাবিত উড়োজাহাজ ‘আলবাট্রস’ আসলে একটি বিশাল ভাসমান প্ল্যাটফর্ম, যাকে মাটির সাথে সমান্তরাল ও সারিবদ্ধভাবে সাজানো চালকপাখা বা প্রপেলর দ্বারা মাটি থেকে শূন্যে উত্তোলিত করা হয়। আলবাট্রসকে তাই আধুনিক হেলিকপ্টারের পূর্বপুরুষ বলা হয়ে থাকে।
লুনার মডিউলস
১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে অ্যাপোলো ১১ মিশনের সাফল্যের মধ্য দিয়ে প্রথম দুটি মানুষ নীল এল্ডেন আর্মস্ট্রং এবং এডউইন ইউজিন অলড্রিন ‘ঈগল’ নামে লুনার মডিউলে চেপে চাঁদে অবতরণ করেছিলেন। মানুষ চাঁদে যাওয়ার অনেক আগে, ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত ‘ঋৎড়স ঃযব ঊধৎঃয ঃড় ঃযব গড়ড়হ’ উপন্যাসে জুল ভার্ন চাঁদে যাওয়ার জন্য একটি বিশেষ যন্ত্রের কথা বর্ণনা করেছিলেন। শঙ্কু-আকৃতির সেই যন্ত্রটি এখনকার রকেটগুলোর মাথায় বাসানো স্পেস ক্যাপস্যুল বা লুনার মডিউলের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। জুল ভার্ন যন্ত্রটির নাম রাখেন ‘প্রোজেক্টাইল’, যা পৃথিবী থেকে চাঁদে তিনজন যাত্রী বহনে সক্ষম। এই যন্ত্র চালানোর জন্য জুল ভার্ন পাহাড় চূড়ায় বসানো একটি ৯০০ ফুট লম্বা কামানের কথা কল্পনা করেন, যা এই প্রজেক্টাইলকে অভিকর্ষের বাধা পেরিয়ে মহাকাশে নিক্ষেপ করবে।
সৌরপাল
সৌরপাল একটি যন্ত্র, যার বড়ো বড়ো আয়নায় সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়ে উৎপন্ন বিকিরণ চাপ কাজে লাগিয়ে সৌরশক্তি উৎপাদিত হয়। সেই সৌরশক্তি দ্বারা মহাকাশযান চালানো হয়। ২০১০ সালের ২১ মে ঔধঢ়ধহ অবৎড়ংঢ়ধপব ঊীঢ়ষড়ৎধঃরড়হ অমবহপু (ঔঅঢঅ) প্রথম আন্তগ্রহ সৌর পাল মহাকাশযান ‘ওকঅজঙঝ’ (ওহঃবৎঢ়ষধহবঃধৎু করঃব-পৎধভঃ অপপবষবৎধঃবফ নু জধফরধঃরড়হ ঙভ ঃযব ঝঁহ) শুক্রগ্রহের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে। এটিই সম্পূর্ণরূপে সূর্যালোকে চালিত প্রথম সফল সৌরপাল মহাকাশযান। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত ‘ঋৎড়স ঃযব ঊধৎঃয ঃড় ঃযব গড়ড়হ’ উপন্যাসে জুল ভার্ন সৌরশক্তি চালিত এমনই একটি কাল্পনিক মহাকাশযানের কথা লিখেছিলেন।
সরাসরি সংবাদ সম্প্রচার
‘ওহ ঃযব ণবধৎ ২৮৮৯’ ছোটোগল্পটিতে জুল ভার্ন সংবাদপত্রের একটি বিকল্প বর্ণনা করেছিলেন। কাগজে দৈনিক খবর না ছাপিয়ে, প্রতিদিন সকালে ঊধৎঃয ঈযৎড়হরপষব থেকে একজন প্রতিনিধি খবর পাঠ করবেন এবং বিশ্বের যে কোনও মানুষ চাইলেই সেদিনের খবর শুনতে এবং দেখতে পারবেন। এর প্রায়  ৩০ বছর পর প্রথম টেলিভিশন উদ্ভাবিত হলে ১৯৩৯ সালে মার্কিন সংবাদ পাঠক লোয়েল থমাস প্রথম টেলিভিশনে সংবাদ উপস্থাপন করেন।
আকাশলিখন
১৮৮৯ সালে প্রকাশিত ‘ওহ ঃযব ণবধৎ ২৮৮৯’ নামক ছোটোগল্পে ধঃসড়ংঢ়যবৎরপ ধফাবৎঃরংবসবহঃ নামে এক বিশেষ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার পদ্ধতির কথা বলেন জুল ভার্ন। আকাশে মেঘের মতো ভেসে বেড়ানো বিজ্ঞাপনের সেই অতিকায় অক্ষরগুলো সবাই মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবে। জুল ভার্নের কল্পনার সেই আকাশলিখন আজ বাস্তব। এখন অতি সহজেই ছোটো বিমান থেকে নির্গত ধোঁয়ার সাহায্যে আকাশে লিখে ফেলা যায়। ছোটোগল্পটি প্রকাশিত হবার প্রায় ২৬ বছর পর ১৯১৫ সালে আমেরিকায় প্রথম আকাশে লেখার খবর পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আকাশ লিখন শুরু হয় ১৯৩২ সাল থেকে।
ভিডিও কনফারেন্স
 জুল ভার্ন  তার ‘ওহ ঃযব ণবধৎ ২৮৮৯’ নামক  ছোটোগল্পে  ‘ঢ়যড়হড়ঃবষবঢ়যড়ঃব’  নামক  একটি ভোতিক  প্রযুক্তির  কথা জানান , যেখানে এক বা একাধিক মানুষ পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে বসে অন্য এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে ‘রিয়েল টাইম’ বা একই সময়ে এ  কথা  বলতে  পারবেন  এবং  তারা পরস্পরকে তারযুক্ত একটি সুগ্রাহী আয়নায় দেখতে পারবেন।   ইন্টারনেটের  এই যুগে এই প্রযুক্তিটি  ‘ভিডিও কনফারেন্স’ নামে সবার কাছেই পরিচিত। অবাক করা বিষয় মাত্র  ১০০ বছর পরেই , অর্থাৎ ১৯৯০ এর দশক থেকে  আমরা   ইয়াহু,  মেসেঞ্জার,  স্কাইপির  মাধ্যমে হরহামেশাই ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলে থাকি।  নিঃসন্দেহে বলা যায় আজকের ভিডিও কনফারেন্সিং প্রযুক্তির অগ্রদূত   ঢ়যড়হড়ঃবষবঢ়যড়ঃব  ।
বৈদ্যুতিক শক অস্ত্র
১৮৭০ সালে প্রকাশিত ‘ঞবিহঃু ঞযড়ঁংধহফ খবধমঁবং টহফবৎ ঃযব ঝবধ’ উপন্যাসে জুল ভার্ন এক আশ্চর্য  অস্ত্রের কথা লিখেছিলেন, ঞযব খবুফবহ ইধষষ এঁহ। সেই অস্ত্রে ব্যবহৃত হয় অদ্ভূত প্রকৃতির বুলেট, খবুফবহ ইধষষ। সেই বুলেটগুলি আসলে বৈদ্যুতিক শক্তি সঞ্চারিত ক্ষুদ্র ধাতব গোলক যা অনায়াসে শত্রুকে ঘায়েল করতে পারে। জুল ভার্ন প্রদত্ত এই ধারণাটির একটি বৈকল্পিক রূপ আধুনিক খধংবৎ এঁহ। ২০০৫ সালে ট.ঝ. উবঢ়ধৎঃসবহঃ ড়ভ ঐড়সবষধহফ ঝবপঁৎরঃু ভার্নের ধারণার আরও কাছাকাছি একটি বৈদ্যুতিক অস্ত্র চরবুবৎ মঁহ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের ২৭ জুলাই ঢ৩ নামে একটি নতুন ধরনের খধংবৎ এঁহ বাজারে মুক্তি পেয়েছে।
জুল ভার্নের লেখায় যেমন আছে  কল্পবিজ্ঞান তেমন আছে  টানটান উত্তেজনাময় অ্যাডভেঞ্চার আর রহস্যের  চমকপ্রদ মিশেল। কাহিনির পাত্র–পাত্রীরা বিস্ময়কর ভাবে দুর্গম গিরি,দূরদূরান্তের কান্তার মরু মাড়িয়ে  ছুটে চলে  দেশ হতে দেশান্তরে, আবার  কখনো  ছুটছে  সাগরতলে, সাগরের বুকের  নির্জন দ্বীপে, শুভ্র ধবল তুষারে ঢাকা বসবাস অযোগ্য দুর্গম মেরুতে, কেউ আবার  ছোটে চলছে অ্যাডভেঞ্চার এর নেশায় পৃথিবী ফেলে চাঁদের পানে। কখনো তার নায়করা চড়ছে পাতাল রেল, কথা বলছে ভিডিও কনফারেন্স এ, মোবাইলে। তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় বড়ই আত্মবিশ্বাস এর সাথে লেখা এসব কাহিনী। ভার্ন এমন সব অঞ্চলের এত বিশদ  বিবরণ দিয়েছেন  যেন সব তার  নিজের চোখে দেখা  এবং তা লেখা। অথচ বেশ মজার ব্যাপার  এই যে অধিকাংশ জায়গাই  তিনি জীবনে কখনো পা ফেলেন নি। আগেই বলা হয়েছে  আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন চিলেকোঠার সেপাই।  তবে ধারনা করা হয় তাঁর সেই চিলেকোঠায় থরে থরে  অজস্র  দেশ-বিদেশের মানচিত্র আর পত্রপত্রিকা সাজানো থাকত । সেগুলো  ঘেঁটে , কল্পনার পাখা মেলাতেন এবং  লিখতেন বিস্ময় মেশানো যাদুকরি  উপন্যাস। তাই হয়তো  জায়গার নাম  এবং বিবরণে ভুল হতো না।
মৃত্যুঃ ৭৭ বছর বয়সে ১৯০৫ সালের ২৪শে মার্চ ফ্রান্সের আমিয়েন্সে ডায়াবেটিসের কারণে জুল ভার্ন মৃত্যুবরণ করেন।  আমিয়েন্সে জুল ভার্নের একটি স্মারকসৌধও আছে।
পরিশেষে বলি উভচর মানুষ (অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান)–খ্যাত রুশ লেখক অ্যালেকজান্ডার বেলায়েভও জুল ভার্নের কাহিনি পড়েই বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লিখতে শুরু করেছিলেন। শুধু তা–ই নয়, বেলায়েভ রাশিয়ার জুল ভার্ন নামে পরিচিত । নামকরা বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লেখক ‘রে ব্র্যাডবেরি একবার বলেছিলেন, “আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে জুল ভার্নের সন্তান।“  এভাবেই লাখো পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করার পাশাপাশি আরও অনেক লেখকের অনুপ্রেরণার উৎস তিনি। কাজেই জুল ভার্নকে যে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির অন্যতম জনক বলা হবে, তাতে আর বেশি কী!

* জালাল উদ্দীন বাবু: প্রভাষক ও লেখক।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top