logo
news image

১৪৮তম দেশ আফ্রিকার নামিবিয়ায় নাজমুন

নাজমুন নাহার।।
বিশ্বভ্রমণে আমার অভিযাত্রা চলছে এখন ১৪৮তম দেশ দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার ‘নামিবিয়া’। ১৪৭তম দেশ দক্ষিণ সুদান সফর শেষে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা হাতে আমি পৌঁছেছি বিশ্বের অন্যতম অপূর্ব সেই দেশে যেখানে সমুদ্র মিশেছে মরুভূমির সাথে। যেখানে ৫৫ মিলিয়ন বছর বয়সী ‘নামিব’ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন মরুভূমি রয়েছে। যেখানে রয়েছে বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণীর বাসস্থান। নামিবিয়ার ছোট ছোট পাহাড়ের ভ্যালি আর অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপ, উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোন ভূস্বর্গের প্রতিচ্ছবি বহন করছে।
কিন্তু আমি ভুলতে পারছি না আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি সফরের কথা যেটি হয়েছিলো দক্ষিণ সুদানে। দক্ষিণ সুদানে যাওয়ার আগে আমার মন দুরু দুরু কাঁপছিল, তার অবসান হলো যখন সেখানে আমার অনেক ভালো ঘটনাগুলো ঘটেছে।
যেখানে আকাশ মিশেছে গভীর সবুজের সমারোহে, তার-ই মাঝে বয়ে গেছে ছোট্ট সুতোর মতো নীলনদ-দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবার আকাশ থেকে যখন  আমি দেখছিলাম সেই অপূর্ব দৃশ্য আমার ভেতরের ভয় খানি যেন উড়িয়ে নিয়ে গেছে কেউ। এয়ারপোর্টে নামার সাথে সাথে আমার সুযোগ হলো ভিআইপি গেইট দিয়ে বের হওয়ার।
১৭ আগস্ট ২০২১ লাল সবুজের পতাকা হাতে যখন আমি পৌঁছেছি পূর্ব-মধ্য আফ্রিকার রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবাতে, দক্ষিণ সুদানে আমার জন্য এত চমক অপেক্ষা করবে আমি ভাবিনি। দেশটির রাজধানী জুবা শহরে পৌঁছানোর পর ১৯ আগস্ট দক্ষিণ সুদানের ‘পিস মিনিস্টার স্টিফেন পার কোল’-এর আমন্ত্রণে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয় আমার মিনিস্ট্রি অব পিস বিল্ডিং-এর কার্যালয়ে। সেখানে পিস মিনিস্টার স্টিফেন পার কোল আমার বিশ্বভ্রমণের ১৪৭তম দেশ ভ্রমণে বাংলাদেশের পতাকা বহন ও বিশ্ব শান্তির বার্তা পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাকে অভিনন্দন জানান।
২০ আগস্ট আমার ১৪৭তম দেশ ভ্রমণের স্টোরি দক্ষিণ সুদানের শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকা ‘জুবা মনিটর’-এর প্রথম পাতায় শিরোনাম হয়। একই দিনে ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় জুবাতে হোটেল পিরামিডের গ্যালারি হলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল কালাম মোমেনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশী কমিউনিটি আয়োজিত এক নৈশভোজে আমার বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্যে আমন্ত্রিত হই।
২১ আগস্ট জাতিসংঘের বাংলাদেশী পিস কিপার আর্মি ও নেভিদের আমন্ত্রণে আমাকে জুবা ইউএন মিস টম্পিং এরিয়াতে জাতিসংঘের স্পেশাল গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর এক সৌজন্য মূলক সাক্ষাৎ হয় সবার সাথে। ওখানকার ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার মেজর জেনারেল ও বিগ্রেডিয়ার জেনারেলসহ কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ক্যাপ্টেন কর্নেল সবাই আমাকে দেশের পতাকা বহনের জন্য বিশেষ অভিনন্দন
 জানান।  
২৩ আগস্ট সাউথ সুদান উইমেন এম্পাওয়ার্মেন্ট নেটওয়ার্ক ও ফাস্ট নেটওয়ার্কের আয়োজনে জুবা ইউনিভার্সিটির গ্রীন রোকন হলে আমাকে সংবর্ধনা জানান পিস মিনিস্টার স্টিফেন, নারী বুদ্ধিজীবীরা, আর্টিস্ট, সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ দক্ষিণ সুদানের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তাদের ভালবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে দারুণভাবে।
এই কনফারেন্সে আমি তরুণদের উদ্দেশ্যে বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি এবং তাদেরকে উৎসাহিত করি নিজ দেশের শান্তি ও বিশ্ব শান্তি বজায় রাখার জন্য। এই প্রোগ্রামটি সাউথ সুদানের জাতীয় টেলিভিশন এসএসবিসি’তে সম্প্রচার হয়। এছাড়া জুবা রেডিও ‘আই’ আমাকে নিয়ে টপ স্টোরি করে। জাতিসংঘের রেডিও মিরাইয়া বিশেষ প্রতিবেদন করে ২৩ আগস্ট আমার বিশ্বভ্রমণের ১৪৭তম দেশ ভ্রমণের অভিযাত্রা নিয়ে। এরই মধ্যে আমি দক্ষিণ সুদানের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করি। বাঙালি কমিউনিটির সাজ্জাদ ভাই এবং শাহিন ভাই আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছিলেন, এছাড়া অন্যান্য সবার আন্তরিকতা ছিলো অনেক। দক্ষিণ সুদানের বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক মিস্টার কং আমার অভিযাত্রাকে দক্ষিণ সুদানের তরুণ সমাজের কাছে তুলে ধরেছিলেন অসাধারণভাবে। এই মানুষগুলো আমার অভিযাত্রার এঞ্জেলরুপী মানুষ হিসেবে স্মৃতিতে রয়ে যাবে।
২৪ আগস্ট নিচের সবুজ বনভূমি আর নীলনদ পার হয়ে যখন ১৪৮তম দেশ নামিবিয়ার উদ্দেশ্যে বিমানটি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানসবার্গের দিকে উড়ছিল। তখন আমি আকাশের তুলো মেঘের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম আমার কষ্ট মাখা পথের দিকে। সকল কষ্টের মাঝে যেন প্রাপ্তির আনন্দগুলো আমাকে নীল-সাদা মেঘের ভেতর আন্দোলিত করছিলো। স্বপ্নে বিভোর আগামী দেশগুলিতে অভিযাত্রা করার জন্য।
এরই মাঝে বিমানের একজন কেবিন ক্রু এসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, তুমি কেমন আছো, তোমাকে গতকাল আমাদের জাতীয় টেলিভিশনে দেখেছি-কোন অসুবিধা হলে কিংবা কোন কিছু লাগলে আমাকে বলবে। আকাশপথেও আমার অভিযাত্রা যেন চমক বয়ে এনেছিলো পৃথিবীর এই প্রকৃতি আর মানুষের ভালোবাসার মাঝে। পৃথিবী অপূর্ব, করোনাকালীন ভ্রমণ অনেক কষ্টের এবং ব্যয়বহুল, তবুও আমি অভিযাত্রা করছি তার রূপ দেখার জন্য সকল কষ্ট, ধুলোমাখা পথ, আর অবিচলিত মুহুর্তকে উপেক্ষা করে-লাল সবুজের পতাকা হাতে। পৃথিবীর পথে পথে আমার এই অভিযাত্রার সঙ্গী যেন ১৭ কোটি মানুষের ভালবাসা। পৃথিবীর পথে পথে আমার প্রতিটি অর্জনে একটি সোনার বাংলাদেশ যেন মিশে থাকে। নামিবিয়া হতে আমার অভিযাত্রা চলতে থাকবে অ্যাঙ্গোলা ও তারপর ১৫০ দেশ ভ্রমণের মাইলফলক পর্যন্ত।
আমার এবারের অভিযাত্রায় যারা আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং বাংলাদেশ প্যারাগনের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা। নামিবিয়া, ২ সেপ্টেম্বর ২০২১।

* নাজমুন নাহার: বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী, ১৪৮তম দেশ ভ্রমণকারী।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top