logo
news image

স্বপ্ন ছোঁয়ার সিঁড়ি

ড. লিপন মুস্তাফিজ:
আমার স্কুলে পড়ুয়া ছেলেকে পড়াতে বাসায় আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। তার বাবা কী করেন জানতে চাইলে উত্তরে সে বলল কৃষক। কদিন আগে এক সহকারী জজের সঙ্গে পরিচয়ের এক পর্যায়ে তিনিও খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই জানালেন তার বাবা কৃষিকাজ করেন। আমি নিজে দীর্ঘ দশ বছর প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেছি। শিক্ষকতাকালে আমার এক ছাত্র আমাকে বলেছিল, তার বাবা নাপিতের দোকানের কর্মচারী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এরকম অনেকগুলো ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। নিজের শৈশব-কৈশোরের সঙ্গে তুলনা করলে বুঝতে পারি সমাজে এক্ষেত্রে একটা দারুণ অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের সময়ে পিতৃ/মাতৃপরিচয় বা পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যতটা সংকুচিত হয়ে থাকতাম এখন হয়তো সেটা দূর হয়েছে। এমনটাই তো প্রত্যাশিত।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজনকে চিনি যে কিনা চট্টগ্রামে একটি গরুর খামার দিয়েছে। মীরেরসরাইয়ে নিজেই পেঁপের চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে আরও এক মাস্টার্স পাস করা যুবক। শুনেছি সে নাকি সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলেছিল। যে সনদ তাকে চাকরি দিতে পারেনি সেটা রেখেই বা কী লাভএই ভেবে। যেমনটা শুনেছি প্রয়াত চিত্রপরিচালক আলমগীর কবিরের বিষয়েও। লন্ডনের টেমস নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তিনি নাকি তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সনদ ছুড়ে ফেলেছিলেন। মিরপুরের মাটিকাটায় একটা গাড়ির ওয়ার্কশপ দিয়েছেন একজন, তিনিও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার। সমাজের এই বদল অবশ্যই খুবই ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু কয়েক বছর আগেও দেখা যেত বিশ্ববিদ্যলয় থেকে বেরিয়েই সবাই নিজেকে চাকরির জন্য প্রস্তুত করত। সরকারি বা বেসরকারি চাকরি না পেলে অনেকেই বিদেশে চলে যেত। সেই সময় নতুন করে ব্যাবসা শুরু করার হার অনেক কম ছিল। এই ব্যবসা শুরু করাকে আমরা উদ্যোক্তা বলছি। যদিও কিছু কিছু যুবক পাস করে নিজেদের পারিবারিক ব্যবসায় বসার সুযোগ পেত।
এমন দিনবদলের দিনে আমাদের দেশে এখন অনেক নতুন নতুন উদ্যোক্তার সৃষ্টি হয়েছে। হাঁস-মুরগি, পশুপালনে জোয়ার এসেছে। মাছ চাষে ঘটে গেছে নীরব বিপ্লব। আমরা দেশীয় ও দেশে উৎপাদিত হাইব্রিড খাবারে নিজেদের অভ্যস্ত করেছি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও ছোট ছোট ব্যবসার পসার ঘটেছে। মসলা জাতীয় পণ্যের ভেতরেও বিভিন্ন দেশের প্রজাতি পাওয়া যাচ্ছে এখন বাংলাদেশে, পাশাপাশি দেশেও উৎপাদিত হচ্ছে আগে অপ্রচলিত অনেক মসলা। একইভাবে দেশি মুরগির পাশাপাশি আমরা অন্য নানাজাতের মুরগি খেতে শুরু করেছি এবং তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ব্রয়লার মুরগি এখন অনেকের প্রিয় খাবার বিশেষ করে ফাস্ট ফুডের দোকানে এর  অনেক চাহিদা। দেশি মুরগির লালন পালন কমে যাওয়ার ফলে অথবা বাণিজ্যিকভাবে এই মুরগির পসার তেমন না হওয়ায় এক জাতের ‘পাকিস্তানি মুরগি’ এখন ভোক্তার সেই চাহিদা পূরণ করছে। এই মুরগির দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কারণেও এর চাহিদা আকাশচুম্বী। বাজারে এটা ‘পাকিস্তানি কক’ বা ‘সোনালি মুরগি’ নামেও পরিচিত। একটা সময় সবজির ক্ষেত্রে হাইব্রিডের বাজার ভালো ছিল। এখন আমাদের ভোক্তারা অনেক সচেতন বিধায় হাইব্রিড সবজির চাহিদা কমে গেছে অনেকগুণ। জন্মগতভাবেই বাঙালির বিদেশপ্রীতি সুবিদিত হলেও আশার কথা হলো খাবার-দাবারের বেলায় এখনো দেশীয় খাবারের বিষয়ে একটা হাহাকার দেখা যায়। দেশি মুরগি খাওয়ার জন্য মনের মধ্যে কেমন কেমন করা শহুরে মানুষের সংখ্যা বেশি বৈ কম হবে না!
ভোলার মনপুরা থেকে একজন ভেটেরিনারি সার্জন বগুড়ায় বদলি হয়ে এসে দেশি মুরগির খামার দেখে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্থানীয় অনেকের সঙ্গে আলাপ করে এরপর তিনি একে একে অনেকগুলো দেশি মুরগির খামার গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। ২০১৫ সালে তিনি দেখতে পান সনাতন পদ্ধতিতে মাত্র ৫০/৬০টি মুরগি নিয়ে স্থানীয়রা দেশি মুরগির খামার করছেন। ডা. মো. রায়হান নামের সেই ভেটেরিনারি সার্জন মাত্র পনেরো জনকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খামার গড়ে তোলার একটা উদ্যোগ নেন। সবার আগে এই পনেরো জনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। পাইলট প্রকল্পটির নাম দেন ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সিঁড়ি’। এরপর ‘উদ্যোক্তা পাঠশালা’ নামে একটা পাঠশালাও গড়ে তোলেন তিনি। ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সিঁড়ি’ প্রকল্পটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। সপ্তাহে দুদিন, শুক্র ও শনিবার সারা দেশ থেকে আসা ৩০ জন উদ্যোক্তাকে দেশি মুরগির বাণিজ্যিক খামারে মুরগি লালন-পালন, অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড ব্যবহার না করেই দ্রুত সময়ে অধিক মাংস ও ডিম উৎপাদন, বাজারজাতকরণের নানা কৌশল শেখানো হয় এই পাঠশালায়। স্বপ্ন ছোঁয়া সিঁড়ির উদ্যোক্তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও লেনদেন জোরদার করে দেশব্যাপী একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজেও উৎসাহ দেন তিনি। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সহজ হয়ে উঠতে থাকে।
সাধারণ খামারিরা হ্যাচারি মালিকদের কাছে মুরগির ডিম সরবরাহ করেন। আর নতুন নতুন উদ্যোক্তারা হ্যাচারি থেকেই মুরগির বাচ্চা কিনে নেন। অন্যদিকে, ‘উদ্যোক্তা পাঠশালায়’ প্রশিক্ষণ শেষে সারা দেশ থেকে আসা উদ্যোক্তারা এখন ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সিঁড়ি’ থেকেই মুরগির বাচ্চা কিনেন। একটি বাচ্চার দাম নেওয়া হয় বিশ টাকা। তবে ডিমের দাম ওঠানামা করলে বাচ্চার দামও কমবেশি হয়। এছাড়াও খামারিদের ডাক পেলেই ছুটে যান গবাদিপশু চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত বারো জন ‘স্বপ্ন বন্ধু’। এইভাবে ধীরে ধীরে শুধু বগুড়াতেই এখন দুই শ’র বেশি খামার গড়ে উঠেছে যা কিনা চোখে পড়ার মতো। গর্ব করার মতো। বগুড়া জেলার শেরপুরেই প্রায় হাজারের মতো তরুণ-তরুণী ঐ কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে নিজেদের জীবিকার পথ বের করেছেন আর বাঙালির খাবারের টেবিলে দেশি মুরগি পৌঁছে দিচ্ছেন। এরা  ফিরিয়ে দিয়েছেন মুরগির মাংসের আগের সেই প্রিয় দেশি স্বাদ। স্বপ্ন ছোঁয়া এসব উদ্যোক্তার খামারে এখন কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দশ হাজার মানুষের। এসব খামারে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড (হরমোন) ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয় না। এখন অর্গানিক পদ্ধতিতে এসব খামারে প্রতি মাসে উৎপাদন হচ্ছে চার হাজার কেজি দেশি মুরগির মাংস ও এক লাখ ত্রিশ হাজার ডিম। দেশি মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের জন্য শেরপুর উপজেলায় এখন নয়টি হ্যাচারি হয়েছে। এসব হ্যাচারিতে মাসে গড়ে প্রায় পঁচাশি হাজারের বেশি দেশি মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে।
দেশি মুরগির জাত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ এবং স্বল্প বিনিয়োগে উদ্যোক্তা তৈরিতে অবদান ও জনসেবায় অনবদ্য ভূমিকা রাখায় ডা. মো. রায়হান ইতিমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রশাসন পদক পেয়েছেন। জেলা ও রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবায় শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবনী কর্মকর্তার স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সিঁড়ি’ নামের উদ্যোগটি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে বিশটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে ইতিমধ্যে চিঠি দিয়েছে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। যা বাস্তবায়িত হলে অন্যরাও এমন খামার গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।
আমাদের দেশের তরুণ সমাজকে একটু গাইড করলেই বদলে যেতে পারে আমাদের অর্থনীতির চাকা। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে আর দালালের পাল্লায় পড়ে যারা নৌকা চড়ে বিদেশ যেতে চায় তারা এদেশে কোনো আশার আলো দেখে না বলেই ঝুঁকির এই পথে পা বাড়াতে দ্বিধা করে না। শুধু একটু ভালো থাকার আশায় আমাদের দেশের স্বল্প শিক্ষিত মেয়েরাও বিদেশ পাড়ি দেয়। অনেক টাকা খরচ করে শুধু একটু ভালো থাকার আশায় বিদেশে গিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে। আর প্রতারিত হয়ে বিদেশে তাদের করুণ জীবন শুরু হয়। বিদেশ যেতে দালাল ধরা আর সব মিলিয়ে অনেক টাকাই খরচ হয়। আবার দেশে বসেই ওই পরিমাণ টাকা নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেও চাঁদাবাজির কারণেও অনেকে পথে বসেন। কিন্তু সহজ শর্তে সরকারি সহায়তা বা ব্যাংকের ঋণ পেলে দেশের উদ্যোক্তারা পথে বসতেন না, বিদেশেও পা বাড়াতে চাইতেন না।
দেশে এখন অনেক সুযোগ। এখন নতুন নতুন ধারণা নিয়ে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কাজ করে যাচ্ছে বিভিন্ন প্লাটফর্মে। নিত্যনতুন প্রযুক্তি আমাদের দেশে কৃষিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। ফলে কচুরিপানা থেকে মেয়েদের স্যানিট্যারি ন্যাপকিন বানানো যাচ্ছে। কলাগাছের বাকল থেকে তন্তু বানানো যাচ্ছে আর সেই তন্তু থেকেই তৈরি হচ্ছে সুতা। সুপারির ফেলে দেওয়া খোল থেকে হচ্ছে থালা, বাটি। বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তি ও শিক্ষা কাজে লাগিয়ে সামনে আরও কী কী করা যায় সে নিয়ে উদগ্রীব হয়ে আছে দেশের তরুণ সমাজের একাংশ। তাদের পথ দেখানো গেলে একদিন আমরা সবাই স্বপ্ন ছোঁয়া সিঁড়ি বেয়ে দেশ ও দশকে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারব।

* ড. লিপন মুস্তাফিজ: ব্যাংকার ও গবেষক, liplisa7@gmail.com

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top