logo
news image

সৎ করদাতা ও অসৎ করদাতা

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম :
নসর পেয়াদা গল্পে ভুলে মাছ রান্নার তেল কেনা হয়েছিল মদের বোতলে। সেজন্য সেই রান্না করা লোভনীয় মাছ কোন মুসলিম সে রাতে খাননি। স্কুলে পড়েছিলাম সেই গল্প। কারণ, সকল মাদকদ্রব্যসেবন করাই মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ বা হারাম। এ গল্পে ধর্মীয় নৈতিকতার একটা মহান শিক্ষা মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। তখনকার দিনে মানুষ এতটা ধর্মপরায়ণতার চিন্তা করতো না-কিন্তু, ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দের তফাৎ করাকে কায়মনোবাক্যে পালন করতো। যে যার ধর্মের বিধি-নিষেধগুলোকে শ্রদ্ধাভরে পালন করতো। এখন দিন পাল্টে গেছে। মানুষ দিন দিন বড্ড বেশী অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে।
আজকাল ব্যস্ত মানুষের সময় কেড়ে নিচ্ছে মুঠোফোন আর সংযুক্ত এন্তারজাল। যে মায়াজালে মানুষের চোখ-মন সব সময় আটকে থাকে। তাইতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, অভিভাবক বা কারো সংগে কোন কিছুর ভাল-মন্দ শেয়ার করার কোন সময় না পেয়ে ভুল করে বসে। এভাবে গায়ের চামড়ার রং আরো ফর্সা করার জন্য বিষাক্ত ক্রীমের ব্যবহার করতে গিয়ে দেহকে বিকৃত করেতে দ্বিধা করছে না!
বিদায়ী অর্থবছরে ১২ হাজার ব্যক্তি ২০ হাজার কোটি কালো টাকা সাদা করেছেন। তন্মধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকাই নগদ। এত পাপের টাকার জন্মদাতা কোন বাপেরা? সংবাদে জানা গেছে, “অন্তত: সাত হাজার কালো টাকার মালিক নগদ টাকা সাদা করেছেন .. এদের বেশীরভাগই চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারী কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী।”
এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সংবাদ নিয়ে একটি বিতর্কের কলামে চোখ আটকিয়ে গেল। মোটামুটি সব বক্তাই স্বীকার করেছেন, এটা অন্যায় এবং কালোবাজারী, মানিলন্ডারিং, মাদকব্যবসা সহ সর্বপ্রকার দুর্নীতিকে আরো উস্কে দিবে। দেশের করদাতাগণ সৎকরদাতা ও অসৎকরদাতা হিসেবে দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়বেন। তাঁদের কর সনদে এই দুই প্রশংসা উল্লেখ করা উচিত। টিআইবি গতবছরই মন্তব্য করেছিল- কালো টাকা সাদা করা অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক, দুর্নীতিবান্ধব এবং প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার পরিপন্থি।
দেশে একশ্রেণির মানুষ অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। এদের  প্ররোচণায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বরত নীতিবান মানুষগুলোর সৎ ও জনকল্যাণকর নীতিগুলো বার বার ভূলুন্ঠিত হয়ে পড়ে।  বাধাগ্রস্থ হয় সততা। জিইয়ে থাকে মাদক ব্যবসা, অনৈতিক লেন-দেনের সিস্টেমগুলো। রাষ্ট্রীয় সর্বচ্চো পর্যায় থেকে অন্যায়-অবিচার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত জিরো টলারেন্স বা সহ্যের শুন্য সীমা- তাহলে কি তারা ভাঁওতাবজিতে পরিণত করতে চায়?
কালো টাকার জন্ম অন্ধকারের ঘুপচি গলিতে। সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, মিথ্যা, প্রতারণা, কর ফাঁকি, চুরি-ডাকাতি, প্রতারণা, চোরাচালানি, অবৈধ মাদক ব্যবসা, ব্যাংক লুন্ঠন, মানি লন্ডারিং, জমি জবরদখল, নদীদখল, ভেজালদ্রব্য তৈরী ও বিক্রি সর্বপোরী ধর্মীয় প্রতারণা, মাজার ব্যবসা, যাকাত ফাঁকি-ইত্যাকার নানা বাজে পন্থা হলো কালো টাকার আঁতুড় ঘর। এসব কালো টাকার মালিকরা সমাজের হোমড়-চোমড়া। নৈতিকার বালাই নেই এদের কাজে কর্মে ও নীতিতে। দেশের কর প্রদান করতে গেলে ধরা পড়তে পারে তাই এরা একদিকে সঠিক পরিমান কর দেয়না অন্যদিকে ধর্মীয় ও নৈতিকতাবোধ না থাকায় যাকাত প্রদানেও বিরত থাকে। তাই এদের দ্বারা রাষ্ট্রের আর্থিক কোন মর্যাদা বাড়ে না, দরিদ্র মানুষের কল্যানও সাধিত হয় না।
রাসায়নিকভাবে কালো রংয়ের মধ্যে সাদা রং মেশালে তা সাদা থাকে না। ছাই বা এধরণের ভিন্ন রং ধারণ করে। যা অনেক সময় ছাই বা উৎকট পরিবেশ তৈরী করে বিশ্রি রুপ নেয়!  কালো টাকা সাদা করতে গিয়ে যদি সমাজে কিছু ছাই জন্মনেয় তাহলে মানুষের স্বাভাবিক মানসিক পরিস্থিতি খিঁচড়ে গিয়ে নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র। এদেশের কর্ণধারগণ মোটামুটি সবাই হজ্জ করে থকেন। কেউ কেউ কিছুদিন পর পর পবিত্র ওমরাহ পালন করতে মক্কা-মদীনায় গমণ করে থকেন। সেখানে গিয়ে তারা পবিত্র দেহ-মন নিয়ে ফিরে আসেন, দেশের সেবায় আত্ননিয়োগ করেন। তাঁরা নিশ্চই চাইবেন না- দেশে এখনও কালো টাকা থাকুক অথবা কালো টাকা জন্ম নিক। আমাদের ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশে সিংহভাগ মানুষই ন্যায়নীতির সাথে জীবন যাপন করতে ভালবাসে। তারা সেই পরিবেশ আরো ভালো হোক্ সেটাই কামনা করে। তবে কেন মাত্র ১০% কর দিয়ে মিথ্যার বেসাতী ? যারা কালো টাকা সাদা করার পক্ষে তাঁরা কি পর্যবেক্ষণ করেন না যে এর চেয়ে কত বেশী অর্থ প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে হারাতে হয়?
কালো টাকা সাদা করার সিদ্ধান্ত দুর্নীতিকে বহুগুনে উস্কে দিবে। জাতি আর জেনেশুনে পাপী হতে চায় না। আমাদের লক্ষ-কোটি টাকার বাজেটে কালো টাকা সাদা করার অবদান যতই থাকুক না কেন তা অবৈধ, নাপাক! একজন হাজী সৎ রাষ্ট্রনায়কের পক্ষে এই অবৈধ অর্থের পৃষ্ঠপোষকতা না করে বরং ঘৃণা প্রদর্শণ করা উচিত। তা না হলে আমাদের উন্নয়নের বরকত কেন উধাও হয়ে যায়? আমাদের সোনার দেশের সোনার ছেলেরা বর্তমানে গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ ছেড়ে কোন অশান্তিতে পিষ্ট হয়ে ভূ-মধ্যসাগরে রিফিউজি হয়ে বার বার সাগরডুবিতে মারা যায়?
সেজন্য লাগামহীন দুর্নীতি কমানোর জন্য জিরো টলারেন্স বা সহ্যের শুন্য সীমা নামক যে জোর প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে সেটাই থাক্ । প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন পিছু না আসে সেজন্য সবাই নিজ নিজ ধর্মমতে প্রার্থনা করুন। আশা করা যায়, কালো টাকা সাদা করার প্রচেষ্টা থেকে সরে এলে শান্তি আসতে পারে।  আমাদের হতাশা ও অস্থিরতা বেড়েছে, শান্তি কমে যাচ্ছে দিন দিন। এদিকে অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আই.ই.পি-র প্রতিবছরের মত এবারের রিপোর্টে প্রকাশ- ২০১৮ সালে বিশ^ শান্তি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯২ থাকলেও ২০১৯ সালের জুনে এসে তা  ৯ ধাপ পিছিয়ে ১০১তম হয়েছে। বিশ^ শান্তি সূচকে একবছরে নয়ধাপ অবনমন আমাদের দেশের জন্য ভয়ংকর অশনিসংকেত। পাপকাজকে উৎসাহিত করায় এত প্রচেষ্টার পরও ২০২০ সাল থেকে অতিমহামারীর কঠিন কামড় থেকে মানুষের মুক্তি মেলানোর শক্তি ও সাহস খুইয়ে ফেলেছে। ক্রমাগত রোগে, শোকে ভুগতে ভুগতে মানুষ হচ্ছে চরম হতাশ ও ঘোরপাপী। আর ২০২১ সালে এসে কোভিডের নিত্যনতুন ভেরিয়েন্টের আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়ে আপন ঘরের জেলখানায় হয়ে পড়ছে স্বেচ্ছাবন্দী। কোটি টাকাতেও মুক্তির ঘুঁটি মেলানো দায় হয়ে পড়েছে।
কালো টাকা মানুষ ও রাষ্ট্রের অশান্তির মূল কারণ-সেটা ঘরে হোক বা বাইরে হোক। অর্থনীতির ভাষায় যিনি যতই জোর গলায় কালো টাকা সাদা করার সাফাই গেয়ে যুক্তি দিন না কেন- গোয়ালা গাভীর দুধ দোহনের সময় এক বালতি দুধে এক ফোঁটা প্রস্রাব যদি অসাবধানতাবশত: ছিটকে পড়ে তাহলে একজন পবিত্র মানুষ কি জেনেশুনে সেটা পান করতে চাইবেন? তাই অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে দেশের সব মানুষের শান্তি ও কল্যাণের জন্য আত্মিক ও নৈতিকতা জোরদার করণ কর্মসূচি নিয়ে আজকেই ভাবনা শুরু করা দরকার। সভ্যতার ডিজিটাল ও গতিশীল জাগরণের যুগে মানুষ আর জেনেশুনে পাপী হতে চায় না।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top