logo
news image

তারকা ঝরে গেল

ফারাজী আহম্মদ রফিক বাবন:
নাটোর জেলার প্রবীণ সাংবাদিক, বাংলাদেশ বেতার-এর রাজশাহী কেন্দ্রের নাটোর প্রতিনিধি এবং নাটোরে দৈনিক যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার মাহফুজ আলম মুনী আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন)।
শুক্রবার (৪ জুন ২০২১) সকাল ৯ টায় নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
সাংবাদিক মাহফুজ আলম মুনী (৬৫) মৃত্যুকালে স্ত্রী ও একপুত্র রেখে গেছেন।
বাদ আসর নাটোর পৌরসভা জামে মসজিদে নামাজে জানাজার শেষে গাড়িখানা কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
সাংবাদিক মাহফুজ আলম মুনী দৈনিক যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে নাটোর প্রতিনিধি ও পরে স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে কর্মরত ছিলেন।একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ বেতারের রাজশাহী কেন্দ্রের নাটোর প্রতিনিধি হিসাবে কর্মরত ছিলেন।
এছাড়াও মাহফুজ আলম মুনী ইতিপূর্বে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নাটোর জেলা ইউনিটের ভাইস-চেয়ারম্যান এবং নাটোর ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর মৃত্যুতে নাটোরের সাংবাদিক, সুধী সমাজসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সাংবাদিক মাহফুজ আলম মুনী’র মৃত্যুতে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, স্থানীয় সংসদ ও জেলা আওয়ামীলীগ সাধারন সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল,জেলা প্রশাসক মোঃ শাহরিয়াজ, পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা,পৌর মেয়র উমা চৌধুরী জলি, সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান ও নাটোরের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সহ বিশিষ্টজনরা গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।
মুনী মামা দীর্ঘদিন কাজ করতেন দৈনিক বার্তায়। সর্বশেষ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দৈনিক যুগান্তরে জেলা প্রতিনিধি ও পরে ষ্টাফ রিপোর্টারের দায়িত্বে, পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারে। স্থানীয় দৈনিক জনদেশ প্রকাশনার সূচনাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মনেপড়ে, আশির দশকে জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত সংবাদ বুলেটিন ত্রৈমাসিক ‘পদক্ষেপ’ এর সম্পাদক ছিলেন তিনি। শুধু সাংবাদিকতায় অগ্রগামীই নয়, তিনি ছিলেন দক্ষ সংগঠক। বিভিন্ন সময়ে প্রেসক্লাবকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, নাটোর ইউনিটের ভাইস চেয়াম্যান এবং ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাঁদের হাট কলেজ শাখায় তিনি ছিলেন তারকা মন্ডলীর সদস্য। ঐসময় শুনেছিলাম, শিশু-কিশোর সংগঠন মুকুল ফৌজ করতে করতে বড় হয়েছেন। পরে যুগান্তরের পাঠক ফোরাম ‘স্বজন সমাবেশ’ তৈরী হলে, আমাকে নাটোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। প্রায় এক দশক ধরে স্বজন সমাবেশ ছিল নাটোরের শীর্ষ সংগঠন। ‘পাখি হত্যা রোধ করতেই হবে’, ‘পুষ্পিত নাটোর’, ‘প্রথম পুষ্প প্রদর্শনী’র প্রশংসার কথা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আমাদের অনুষ্ঠানে দেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনের পথিকৃৎ যুগান্তর সম্পাদক গোলঅম সারোয়ার দু’বার নাটোরে এসেছেন। এসে ঘোষণা দিয়েছেন, নাটোর স্বজন সমাবেশই দেশ সেরা। আর আমাদের নিত্য সহচর ছিলেন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতায় অগ্রণী হাসানুজ্জামান সাকী ভাই। আমরা নেতৃত্ব দিলেও এসবের নেপথ্যে ছিলেন মুনী মামা, স্বজন সমাবেশের প্রধান উপদেষ্টা।
রুদ্ধপ্রাণের এই ক্লান্তিকালে মুনী মামা ছিলেন সাহসিকতায় অনন্য। সবখানে প্রাণখুলে ন্যায্য কথা বলতেন। এটিই তাঁর অনন্য সৌন্দর্য। ২০০৭ সালে সকল প্রেসক্লাব একিভূত হয়ে ‘নাটোর প্রেসক্লাব’ গঠন করা হয়। মুনী মামা আমাদের সাথে আসলেন না। ঐ সময় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে অসংখ্য চেষ্টা করেও তাকে নাটোর প্রেসক্লাবে ফেরাতে পারিনি। সর্বশেষ গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ যুগান্তরের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি হয় নাটোর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে। সংসদ সদস্য শিমুল ভাই প্রধান অতিথি। ঐ অনুষ্ঠানে মুনী মামা ঘোষণা দেন, নাটোর প্রেসক্লাবে ফিরে আসবেন। আনন্দিত শিমুল ভাই ঘোষণা দেন, নাটোর প্রেসক্লাবে মুনী মামার সদস্য পদ প্রাপ্তির আনন্দ দিনে উপস্থিত থাকবেন। দুঃখের বিষয়, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠালগ্নে নাটোর প্রেসক্লাবের অন্যতম সংগঠক মুনী মামার পুরনো ঠিকানায় আর ফিরে আসা হলোনা। বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও প্রেসক্লাবের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘসূত্রিতার গ্যাড়াকলে একটা অপূর্ণতা নিয়েই বিদায় হলেন মুনী মামা। এজন্যে ক্ষমা করে দিয়েন আমাদের।
মুনী মামা ছিলেন নাটোরের সাংবাদিকতা অঙ্গনের উজ্জল তারকা। আমরা তাকে অনুসরণ করে পথ খুঁজে নিতাম। আজ এই তারকা ঝরে গেল।
শারিরিকভাবে কিডনীসহ অন্যান্য অসুস্থ্যতায় ভুগলেও মনোবলে তিনি ছিলেন অনন্য। কখনো থেমে থাকেননি। অসুস্থ্যতার মধ্যেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজির হতেন। আমার চেষ্টা থাকতো, অনুষ্ঠান শেষে তাকে বাইকে করে তাঁর বাড়ি ‘অবসর’ এ নিরাপদে পৌঁছে দেয়া। অনুষ্ঠান শেষে আমাকে আর ব্যস্ত হতে হবেনা। অবসরবিহীন জীবনে মামাও আজ পেলেন চির অবসর। মধু মঞ্জুরী লতার ফুলে শোভিত ‘অবসর’ এর আঙিনায় এখন তিনি শায়িত। অল্প সময় পরে রওনা হবেন মসজিদে জানাজার নামাজের উদ্দেশ্যে, এরপর গাড়িখানা কবরস্থানে চির নিদ্রা।
মহান আল্লাহ তাঁর সকল অজানা অপরাধ ক্ষমা করে দেন, জীবনের যে কোন ভালো কাজের বিনিময়ে তাঁর কবর হোক জান্নাতের সাথে সংযুক্ত।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top