logo
news image

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সুগার রিফাইনারি প্রকল্প বাতিলে সংকটে লালপুরের নর্থ বেঙ্গল চিনিকল

ইমাম হাসান মুক্তি, প্রতিনিধি, নাটোর (লালপুর)
নাটোরের লালপুরের ‘নর্থ বেঙ্গল চিনিকলে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সুগার রিফাইনারি স্থাপন’ শিরোনামে প্রকল্প সাত বছর আগে অনুমোদিত হলেও মাঝপথে এসে বাতিল করে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এতে লোকসানি প্রতিষ্ঠানটি আরো সংকটে পড়েছে।
বাংলাদেশের সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত ও উষ্ণতম স্থান নাটোরের লালপুর উপজেলা। পদ্মা নদীর করাল গ্রাসে পতিত এখানকার মানুষ জীবন যুদ্ধে সহিষ্ণু। জীবন-জীবিকার সংগ্রাম নিত্য দিনের সঙ্গি হয়ে আছে। আখ এ অঞ্চলের প্রধান কৃষি ও অর্থকরী ফসল।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা উল্লেখ করে এবং সারা বছর চিনি পরিশোধনের পরিকল্পনা তুলে ধরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেডের (নবেসুমি) নামে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) পাস হয়। প্রকল্পটি ৭৩ কোটি টাকা খরচে দুই বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্পটি অনুমোদনের পর ভারত ও চীন থেকে যন্ত্রপাতি আমদানির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়। ইউরোপ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানি করতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরপর তিনবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয়ের চেয়ে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারদের দেওয়া দর ছিল অনেক কম। যা ভারত ও চীন থেকে অনুমোদিত প্রকল্পে যন্ত্রপাতি আমদানির কথা ছিল। কারণ, ইউরোপ থেকে আমদানীকৃত যন্ত্রপাতির দাম অনেক বেশি।
এদিকে তিনবার দরপত্র আহ্বান করতে করতেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তখন ইউরোপ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানির কথা বলে প্রকল্পের ব্যয় ৭৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩২৪ কোটি টাকায় উন্নীত করে আবার একনেক সভায় অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয় ২০১৮ পর্যন্ত। কিন্তু দুবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিক করতে পারেনি বিএসএফআইসি। কারণ, প্রতিবারই যেসব আন্তর্জাতিক দরপত্র পাওয়া যায়, সবই ছিল এক হাজার কোটি টাকার ওপরে। যা ছিল মোট প্রকল্প ব্যয়ের তিন-চার গুণ বেশি।
পাঁচবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও যখন কোনো ঠিকাদার পাওয়া যায়নি, তখন বিএসএফআইসি তৃতীয় দফায় প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে ৩২৪ কোটি থেকে ৯২৭ কোটি টাকায় উন্নীত করে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। এই প্রস্তাবে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৩ কোটি টাকা অর্থাৎ ১৮৫ শতাংশ। অস্বাভাবিক ব্যয় দেখে প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রেখেই বাতিল করে দেয় পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে নতুনভাবে বিস্তারিত সমীক্ষার ভিত্তিতে পুনরায় প্রকল্পটি তৈরির পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের চিনি পরিশোধন প্রকল্পটি সাত বছর আগে নেওয়া হলেও এর অগ্রগতি সামান্য। অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগও (আইএমইডি) সর্বসম্মতক্রমে প্রকল্পটি বাতিল করে। এখন সমীক্ষা করে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করতে হবে।
চিনিকল সূত্রে জানা যায়, উনিশ শতকের প্রথমে নাটোরের লালপুর থানা সদর থেকে তথা পদ্মা নদীর প্রায় আট মাইল উত্তরে পলিমাটি বিধৌত জংগলাকীর্ণ পদ্মা অববাহিকা, ভৌগোলিক কারণে কৃষির অন্যতম অর্থকরী ফসল ইক্ষু চাষের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সুগার মিল প্রতিষ্ঠায় আকৃষ্ট হয়ে নকশা তৈরি শুরু হয়। গোপালপুর রেলস্টেশনের পার্শ্ববর্তী নারায়ণপুর মৌজায় চিনিকল স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী জমি ক্রয় শুরু হয়। ১৯২০ দশকের শেষ দিকে সুগার মিলের স্থাপনাকার্য শুরু হয়। জানা যায়, জমি রেজিস্ট্রিতে নাগরমল আগরওয়ালা ও সুরুজমল আগরওয়ালা এই দুই নামে মূল গ্রহীতার নাম উল্লেখ আছে। তাদের ঠিকানা ছিল ৬১নং হেরিশন রোড, কলিকাতা এবং দাতা ছিলেন শ্রী কালিপদ সিকদার দিগর। বায়নাকৃত দলিল ১৯৩৩ সনে রেজিস্ট্রি হয়।
১২ হাজার ২০ মেট্রিক টন মাড়াই ক্ষমতা সম্পন্ন পুরাতন মিল জাভা থেকে ক্রয় করে আনা হয়। সুগার মিলের একটি বড় অংশ জলো-জাহাজের অংশ। সুগার মিলের মোট জমি ৪ হাজার ৯৫৯.৬২৭৫ একর। মিলে চিনি ছাড়াও ঘানি মিল, রাইসমিল, কড়াই কারখানা, চকলেট, জেলী ও মিছরি ফ্যাক্টরী ছিল। তাছাড়া গোশালাও ছিল (গোবাথান ও মহিষ বাথান)।
১৯৩৩-১৯৩৪ আখ মাড়াই মৌসুমে ১২৬ কর্মদিবসে ৩৯ হাজার ১৭৯.০৫ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার ৪৭৫.৫৮ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করে। চিনি আহরণের হার ছিল ৮.৮৭ ভাগ। ১৯৭৮-১৯৯১ সাল পযন্ত সম্প্রসারিত আধুনিকায়নে বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন থেকে উন্নীত হয়ে ১৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন করা হয়।
নর্থ বেঙ্গল চিনিকল একটি লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দেয় ৯৫ কোটি টাকা। এই চিনিকলে কেজিপ্রতি চিনির গড় উৎপাদন খরচ সুদসহ দাঁড়ায় ১৩২ টাকা, আর সেই চিনি বিক্রি হয় ৫৬ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি চিনিতে ৭৬ টাকা লোকসান দিচ্ছে নর্থ বেঙ্গল চিনিকল। এমন বাস্তবতায় চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধন এবং অ্যালকোহল, বিদ্যুৎ, জৈব-গ্যাস ও জৈব কম্পোস্ট উৎপাদনের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের কথা বলে ২০১৪ সালে প্রকল্প হাতে নেয় বিএসএফআইসি। আখের ছোবরা ও কয়লা দিয়ে উৎপাদিত আট মেগাওয়াট বিদ্যুতের দুই মেগাওয়াট চিনিকলে ব্যবহার হবে বাকি ছয় মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে।
প্রকল্পের অন্য কোনো কাজ না হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১০ কোটি টাকা। এই অর্থ থেকে কেনা হয়েছে একটি জিপ, ৫টি ট্যাংকলরি এবং একটি ডাবল কেবিন পিকআপ। প্রকল্পের জন্য কেনা জিপটি এখন বিএসএফআইসির সদর দপ্তরে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর বাকি যানবাহনের মধ্যে ৩টি ট্যাংকলরি কেরু এন্ড কোম্পানী লিমিটেডের নিকট বিক্রি করা হয়েছে। দুইটি ট্যাংকলরি ও একটি ডাবল কেবিন পিকআপ নবেসুমি প্রকল্প এলাকায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
নবেসুমির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. গোলাম কাওছার ও সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, কৃষক, শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থে মিলটিকে অবশ্যই লাভজনক করতে হবে। এ জন্য গৃহীত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন জরুরি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কৃষিবিদ মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, নর্থ বেঙ্গল চিনিকলকে লাভজনক করতে ২০১৪ সালে প্রথম যখন প্রকল্পটি অনুমোদন হয়। তখন প্রকল্পের ব্যয় সঠিকভাবে ধরা হয়নি। ভারত ও চীনের বাজারের ওপর ভিত্তি করে যন্ত্রপাতির দাম ধরা হয়েছিল। কিন্তু দরপত্র আহ্বান করা হয় ইউরোপের বাজার বিবেচনায়। নতুনভাবে সমীক্ষা করে প্রকল্পটি প্রণয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
৫৮ নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদস সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, প্রকল্প ব্যয় বর্তমান বাজার দরের সাথে সামঞ্জস্য না হওয়ায় তা বাতিল হয়েছে। এই খাদ্য শিল্প বন্ধের ব্যাপারে তিনি দ্বিমত পোষন করে বলেন, এই মিলের অবকাঠামো ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে লোকসান কাটিয়ে লাভজনক করতে হবে। নতুন করে প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানান তিনি। এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেন সংসদ সদস্য। 

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top