logo
news image

লালপুরের তাঁতপল্লিতে নেই ঈদের আমেজ

লালপুরের তাঁতপল্লিতে নেই ঈদের আমেজ
ইমাম হাসান মুক্তি, প্রতিনিধি, নাটোর (লালপুর)
নাটোরের লালপুর উপজেলার একটি গ্রাম ওয়ালিয়া। ১৬’শ-১৭’শ খৃস্টাব্দের দিকে বড়াল নদীর তীরে জনশুন্য একটি জঙ্গল ছিল। শুধুমাত্র হিংস্র জীবজন্তুর বিচরণ ছিল। এমনি এক সময় ওয়ালি উল্লাহ খান নামে ফরাসী একজন বণিক ব্যবসার উদ্দেশ্যে লালপুর এলাকায় আগমন করেন। জানা যায়, পদ্মা নদীতে সঙ্গীসহ তাঁর বজরা আকস্মিক দুর্ঘটনা কবলিত হয়। এতে বজরাসহ সকলেই নিখোঁজ হন। এ সময় ওয়ালি উল্লাহ খান প্রাণে বেঁচে যান। তিনি এই এলাকায় বসবাস করতে থাকেন এবং জীবিকার সন্ধান করেন।
ওই সময় নাটোরের দিঘাপতি, জোয়ারী এবং পুঠিয়া জমিদারের মধ্যে জমিদারী বিষয়ে অশান্তি বিরাজ করছিল। ওয়ালি উল্লাহ খান তাঁর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, শিক্ষা ও বিচক্ষণতা দিয়ে জমিদারদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ মিমাংসা করে দেন।  এতে মুগ্ধ হয়ে নবার আলীবর্দি খান তাঁকে ‘আমিন’ উপাধি দেন। সেই সাথে ওয়ালিয়া এলাকার ছয়টি পরগণার মালিকানা তাঁকে দেন। ওয়ালি উল্লাহ খান জঙ্গল পরিস্কার করে এখানেই বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ওয়ালি উল্লাহ খান হয়ে ওঠেন ওয়ালি উল্লাহ আমিন। তাঁর নামেই পরবর্তীতে এই স্থানের নামকরণ হয় ‘ওয়ালিয়া’।
ইতিহাস সমৃদ্ধ এই ওয়ালিয়ায় তাঁতশিল্পীরা গড়ে তোলেন তাঁতপল্লি। তাঁত শিল্পের কারণে পূর্ব কারিগরপাড়া ও পশ্চিম কারিগরপাড়া নামে দুটি গ্রামের নামকরণ হয়। এক সময় এই অঞ্চলের মানুষের ঘুম ভাঙ্গত তাঁতের খটর-খটর শব্দে। সারাদিন বাহারী রঙ্গের গামছা, লুঙ্গী, শাড়ী তৈরীতে ব্যস্ত থাকতেন গ্রামের গৃহবধূরা। দিনের শেষে তাঁতের তৈরী গামছা, লুঙ্গি, শাড়ী বিক্রি করতে পশরা সাজিয়ে বিভিন্ন গ্রামের হাটে-হাটে যেতেন গ্রামের অধিকাংশ পুরুষেরা। এখানকার তৈরী কাপড় কিনতে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরাও আসতেন। এসব কথা এখন শুধু রূপকথার গল্প বা কেচ্ছা কাহিনীর মতো শুনায়।
জানা গেছে, উপজেলার ওয়ালিয়া কারিগরপাড়ার প্রতিটি বাড়িতেই ছিলো তাঁত বসানো। এই এলাকার প্রতিটি ঘরে ঘরে তাঁত থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১০/১২ টি পরিবারে তাঁত রয়েছে। এই সকল তাঁতে এখন শুধু মাত্র গামছা তৈরী হয়। এর সাথে জড়িত শিল্পীরাও এখন পুঁজির অভাবে খাবি খাচ্ছে। এদের অনেকেই মহাজনের ফাঁদে পা দিয়ে কোন রকমে দিনাতিপাত করছে। লাভের অধিকাংশই চলে যাচ্ছে মহাজনের পকেটে।
সরেজমিন বুধবার (১২ মে ২০২১) উপজেলার ওয়ালিয়া পূর্ব কারিগরপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, তাঁতপল্লিতে নেই ঈদের আমেজ। তাঁতের খটর-খটর শব্দ এখন আর শোনা যায় না। হঠাৎ এক বাড়িতে শোনা যাচ্ছে তাঁতের শব্দ। বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, একজন একজন নারী তাঁত যন্ত্রে গামছা তৈরী করছেন। তার নাম আনজুরা খাতুন। বয়স ৬৮ বছর। কয়েক বছর আগে স্বামী আব্দুল আজিজ মারা গেছেন। এই বয়সেও বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার কার্ড জোটেনি। চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে ধর্না দিয়ে লাভ হয়নি। পেটের দায়ে এই বয়সে তাঁতের কাজ করছেন।
তিনি জানান, এই পাড়ায় একমাত্র সচল তাঁত এটি। সারা বছর তাঁতে গামছা বুনানোর কাজ করেন। গামছা বুনানোর জন্য একটি তানায় ২০ মুড়া সুতা থাকে। তাতে ১৭২টি গামছা তৈরী করা যায়। যা মাহাজনদের নিকট থেকে ২৫’শ থেকে ২৭’শ টাকায় কিনতে হয়। এই ১৭২টি গামছা বুনানোর জন্য লাল, সবুজ, সাদা, কালো, সবুজ, গোলাপী রংয়ের মোট ৩৭টি মোড়া সুতা প্রয়োজন হয়। যার প্রতি মোড়া সবুজ সুতা ৮০ টাকা, লাল, হলুদ, সাদা, কালো রংয়ের সুতা ৭০টাকা। ১৭২টি গামছা বুনতে সময় লাগে ৩০-৪০দিন। তৈরী গামছা পাইকারী বিক্রয় হয় ৫০টাকা হারে। খুচরা বিক্রয় হয় ৬০-৬৫ টাকা। একটি তানায় ১৭২টি গামছা বিক্রি করে আয় হয় মাত্র এক হাজার থেকে ১২’শ টাকা।
পশ্চিম কারিগরপাড়ার আনোয়ারা খাতুন (৫৪), বুলু খাতুন (৪৫), পারুল খাতুন (৩৯) বলেন, গ্রামে তাঁতের সংখ্যা কমে গেছে। হাতে গোনা কিছু তাঁত সচল আছে। আরামবাড়িয়ার মহাজন অগ্রিম সুতা দিয়ে যায়। গামছা বুনিয়ে সে টাকা শোধ করা হয়। ২০০ টাকায় এক ছাও (চারটিতে এক ছাও) গামছা মহাজন কিনে নিয়ে যায়। যা বাজারে ৬০ টাকা করে বিক্রি হয়।
পূর্ব কারিগরপাড়ার হাজি মো. মসলেম উদ্দিন (৬৭) জানান, পূর্ব কারিগরপাড়ায় প্রায় দেড়’শ এবং পশ্চিক কারিগরপাড়ায় প্রায় পাঁচ’শ তাঁত বসানো ছিল। তার নিজের তাঁতগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ব্যবসায় পরিশ্রমের দাম ওঠেনা।
এই এলাকার একমাত্র মহাজন ঈশ্বরদীর আরামবাড়িয়ার মো. আব্দুল আজিজ (৮২) জানান, ৫০-৫৫ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসার সাথে জড়িত। আগে এখানে অনেক বড় তাঁতের বাজার ছিল। এখন পূর্বপাড়ায় একটি, পশ্চিমপাড়ায় ১৬টি এবং নান্দ গ্রামে দুইটি মোট ১৯টি তাঁত চালু আছে। ব্যবসার যা অবস্থা তাতে হয়তো আর টিকে থাকতে পরবো না। তিনি বলেন, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই এলাকায় তাঁত শিল্প তার ঐতিহ্য পূণরায় ফিরে পাবে।
ওয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিসুর রহমান জানান, ওয়ালিয়ার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করবেন।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top