logo
news image

ঈদে বাড়ি ফেরা

কামরুল হাসান।।
কেউ বাড়ি ফিরছে শুনলে আমার খুব আরাম লাগে। কেউ যখন বলে, কাল আমি বাড়ি যাব–খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর বা রাজশাহী। তখন মনে হয়, ওদের সঙ্গে আমিও বাড়ি যাচ্ছি। কে যেন বাড়ির সঙ্গে একটি রশি ফেলে দেয়। সেই রশি আমার কোমরে বাঁধা। বাড়ির কথা শুনলেই কোমরের রশিতে টান পড়ে।
এই যে এত মানুষ বাড়ি যাচ্ছে, লঞ্চে, নৌকায়, ফেরিতে গাদাগাদি করে। তাতে আমার ততটা খারাপ লাগছে না। কিন্তু খুব ভয় লাগছে। করোনা ছড়িয়ে পড়ার ভয়। ভারতে যে পরিস্থিতি হয়েছে, তেমন পরিস্থিতি যদি আমাদের হয়– কী হবে? ভাবলে গা শিউরে ওঠে।  
এত বছর রাজধানী শহরে আছি, কখনো ঢাকায় ঈদ করিনি। শুধু ব্যতিক্রম করে দিয়েছে করোনা। করোনার কারণে পরপর তিন ঈদ ঢাকাতেই করতে হয়েছে। এবারেও সেই দশা।
মা বেঁচে থাকতে সব সময় মায়ের সঙ্গে ঈদ করেছি গ্রামের বাড়িতে। এখন মা বেঁচে নেই। তবু ঈদে বাড়ি যাই। দীর্ঘ যানজট ঠেলে বাড়ির আঙিনায় নামলেই শরীর থেকে মুছে যায় ক্লান্তির ছাপ। তখন শৈশব এসে দাঁড়ায় চোখের সামনে। বাতাসে মায়ের গন্ধ ভেসে আসে। হয়তো সে কারণেই ফিরে ফিরে যাই।
আমরা যারা মফস্বল থেকে এসে ঢাকায় থিতু হয়েছি, তাঁদের কাছে আরিচা-নগরবাড়ী ঘাটের কষ্ট ভোলার নয়। যমুনা ব্রিজে উঠলেই আরিচাঘাটের দুর্দশার কথা মনে পড়ে । কত কষ্টই না করেছি। একবার সারা দিন সারা রাত রাস্তায় থেকে যখন বাড়ি ফিরলাম, তখন সকাল হয়ে গেছে। বাড়িতে ঢুকেই দেখি বাসি বাসন হাতে মা উঠানে দাঁড়িয়ে। মায়ের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সন্তানের ঘরে ফেরার অপেক্ষা তাঁকে ঘুমাতে দেয়নি। নির্ঘুম, ছলছল চোখে মা বললেন, তোর আব্বা সারা রাত বারান্দায় পায়চারি করেছে। তুই না এলে এ বাড়িটা খাঁখাঁ করে। আল মাহমুদের ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’র মতো আমি মায়ের আঁচলে মুখ ঘষে ঘষে ভুলে গেলাম পথের কষ্ট।
এখন আব্বা নেই, মা নেই। আমাদের পুরোনো সেই বাড়িটাও নেই। পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি হয়েছে। নোনা ধরা ঘরের মেঝে ও দেয়াল এখন ঝকমকে। যে ঘরে কখনো আলো যেতো না, সেখানে এখন রোদ–ছায়া খেলা করে। কিন্তু কেউ আর আমার অপেক্ষায় নির্ঘুম থাকে না। কারও চোখও ভিজে ওঠে না।
তবুও বড় বড় ছুটি এলেই কে যেন কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে, কাল বাড়ি যাচ্ছি রেৃ. যাবি? যেভাবে নদীর মাঝি শেষ খেয়ার আগে তীরের স্বজনকে ডেকে নেয়। যেভাবে সন্ধ্যায় আজানের পর হাঁস–মুরগি ঘরে তুলতে গিয়ে আদুরে গলায় মা ডাকতেন ৃ.আয় আয় আয়...। ঠিক সে রকম ভরসার ডাক।
বারবার মনে হয়, নিজের উঠানের মতো মায়াময় ভূখণ্ড বোধ হয় পৃথিবীর কোথাও নেই। সারাক্ষণ সে স্মৃতির খুঁট টেনে ধরে রাখে। ফিরে আসতে গেলেই বলে ওঠে, ‘আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবে? আমরা কী শুধুই তোমার গতজন্মে বন্ধু ছিলাম, এ জন্মের কেউ নই, স্বজন নই?’
মায়ের হাতে নিকানো উঠানের কোণে রাখা খড়ির চুলা থেকে উড়ে আসা ছাইয়ের গন্ধ এসে নাকে লাগে । একটা ঝড় সব এলোমেলো করে দেয় । পূর্ণেন্দু পত্রী কানের কাছে এসে বলেন, 'ঝড়ের কথায় রাগ হলো? / ঝড়ের প্রসঙ্গ তবে থাক/ জীবনের আলোচনা হোক।'
আমরা আসলে সবাই ফিরে যাই ঝড়ের কাছে, নিজের উঠানের কাছে, মায়ের কাছে।
হয়তো একদিন যে যাওয়া হবে কবি গুরুর ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের মতো করে।
“মা ডাকিলেন, ওরে ফটিক, বাপধন রে।
ফটিক আস্তে আস্তে পাশ ফিরিয়া কাহাকেও লক্ষ্য না করিয়া মৃদু স্বরে কহিল, মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি।”

* কামরুল হাসান: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আজকের পত্রিকা।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top