logo
news image

যারা পূর্বপুরুষের হাত ধরে থাকে

কামরুল হাসান।।
আরে তুই?
তুই কইত্তেনে?
কইত্তেনে মানে কোথা থেকে।
কোথা থেকে আবার? সেই যে পদ্মা নদীর ওপারের গ্রাম, যে গ্রামের পাশ দিয়ে ভেসে চলেছে পালতোলা ময়ূরপঙ্খি ডিঙি নৌকা। সেখান থেকে। ‘মাটি সেখানে মমতামাখানো, ধান সেখানে বৈকুন্ঠবিলাস।সোনার মত ধান আর রুপার মতো চাল। বাতাস সেখানে হিজলফুলের গন্ধভরা, বুনো বুনো আর মৃদু মৃদু।’ মানুষ যেখানে মানুষ পেলেই ভালোবাসে। সেই গ্রাম থেকে।
এরপর পর শুরু হলো মনে আছে পর্ব।
তোর মনে আছে?
কী মনে আছে।
মনে আছে? লেবুর ঝাড়, মাটিলেপা উঠান, হাফপ্যাডেল সাইকেল, তেল চপচপে মাথা। কচু পাতায় পানি খেলা, পেঁপের ডাল কেটে পাইপ বানানো। কচি আম পকেটে পুরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা, হিজলবনে ডাহুক ধরতে দুপুর পার করা। মনে আছে? ‘অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম, সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর পাঠশালা পলায়ন’। মনে আছে?
সবই মনে আছে। কোনো কিছুতেই এতটুকু বিস্মরণ নেই। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে যায়, শুধুই ধুলাবালির ইতিকথা। যেন সবার হাতে একটি করে সিন্দুক। ভেতরে কথার ঝাঁপি। ঝরে যাওয়া বকুল কুড়িয়ে এনে স্মৃতির মালা গাঁথছে।
ওরা সবাই লালপুরের আফছার আলী ও ছাদের আলীর বংশের সন্তান। পূর্বপুরুষের রক্ত ওদের শিরা উপশিরায়। ওরা কেউ একা কেউ নয়, পাঁচ পুরুষের পাঁচ প্রজন্ম। আজ সবাই একসঙ্গে হয়েছে পূর্বপুরুষের ভিটায়। দিনভর একসঙ্গে থাকবে, হৈ হুল্লোড় করবে, আনন্দে মেতে উঠবে। ওরা আসলে কোনো পরিবার নয়, ওরা শিকড়ের গন্ধমাদন। যে শিকড়ের মুলমন্ত্র হলো একসঙ্গে থাকা, জোটে থাকা। কেউ যাতে উপড়ে ফেলতে না পারে।
ওদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন আফছার আলী ও ছাদের আলী দফাদার। লালপুরের এই আদি পরিবারটি শত বছর ধরে পদ্মার জলহাওয়ায় বেড়ে উঠেছে। শুধু তারা একা নয়, তাঁদের পাঁচ প্রজন্মও টিকে আছে এই মাটিতে। ওরা সবাই যে নাটোর বা লালপুরে থাকেন তা নয়। আইরিন, মাজদার, বাবর ভাই থাকেন ঢাকায়, কুষ্টিয়ায় জিল্লু। সোহনা আলম ঝর্ণা থাকেন মালয়েশিয়া। বছরের একবার তাঁরা সবাই একসঙ্গে হন, একটা দিন পার করেন। আজ শুক্রবার (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১) সেই টানে জড়ো হয়েছেন লালপুরের পুরাতন বাজারের বাড়িতে। এই বাড়ির বড় ছেলে মুক্তার হোসেন ও তার স্ত্রী শিলা পুরো পরিবারটিকে আগলে রাখে ছাতার মতো করে। তারা নিজে ভিজে চুপসে যাবে, কিন্তু কাউকে ভিজতে দেবে না।  
ওরা আসলে পূর্ব পুরুষের শিকড়ের গন্ধ পায়। সেই গন্ধে এক হাঁড়িতে, এক চালের রান্না খায়। চালের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। সেই ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে থাকে মা-চাচি-দাদিদের স্নেহ-মায়া-মমতা মাখানো নির্মল হাসি। বকুলের ডালের মতো তা নুইয়ে পড়ে বাতাসে, তারপর মিলিয়ে যায় দিগন্তে।
ফি বছরে এই আয়োজন চলে দিনভর। সে আয়োজনে এবার একটি চাররঙা ম্যাগাজিনও যুক্ত হয়েছে । তাতে আছে সব পরিবারের ছবিসমেত পরিচিতি। এসব আনুষ্ঠানিকতায় শহুরে সাজসজ্জা হয়তো কিছুটা কম, কিন্তু আছে প্রাণের বিপুল আয়োজন। দিনভর চলেছে নানা রংয়ের পারিবারিক প্রতিযোগিতা আর মধুর স্মৃতিচারণ। একটি বক্তৃতা মঞ্চও ছিল। সেই মঞ্চে ওঠে কেউ আনন্দে ভেসেছে, কেউ চোখের জলে। ওদের আয়োজন মানেই চৌদ্দ পুরুষের ডাক- ও ভাই দুইটা ডাল ভাত না খাইয়া যাসনে...।
আমরা যারা শহরে থাকি, শহুরে হওয়ার মোহে বহু বিশুদ্ধ আনন্দকে আমরা জীবন থেকে ঝেড়ে ফেলেছি। হয়তো কালের নিয়মেও কিছু জিনিসকে বিদায় দিতে হয়েছে। তাই শিকড় থেকে সরে যাচ্ছি দূরে- বহুদূরে। যা করছি তাতে হয়তো একদিন একা একা নিভৃতে, নির্জনে চীর ঘুমে শুয়ে থাকব। কেউ জানবে না। কেউ না। হয়তো তিনদিন পর লোকে জানবে। সেদিন নববসন্তের দখিনা হাওয়ায় শুধু দুর্গন্ধ ভেসে আসবে। রবীন্দ্রনাথের সেই তোতাকাহিনীর মতো। ‘পাখিটি মরিল, কোনো কালে কেহ তাহা ঠাহর করিতে পারিল না ।’
লালপুর গ্রামের আফছার আলী ও ছাদের আলীর পরিবারের কাছে তোতাপাখির সেই গল্প কেবলই উপহাস। ওরা কেউ তোতাপাখির মতো এভাবে মরবে না। ওরা পূর্ব পুরুষের হাত ধরে থাকে। সেই হাত ধরে মালা গাঁথে, স্বপ্ন দেখে। যারা পূর্বপুরুষের হাত ধরে থাকে, তারা বারবার জন্মায়। আফছার আলী ও ছাদের আলীর পরিবারের সন্তানেরাও সেভাবে জন্মাবে– একবার দু’বার নয়, শতবার, হাজার বার, লাখো বার, কোটি কোটি বার।
আজকের আয়োজন সে কথায় বলে গেল।

* কামরুল হাসান: সাংবাদিক।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top