logo
news image

দ্রবময়ীর সংসার

কামরুল হাসান।।
রাজশাহীর কথার মধ্যে একটা অদ্ভুত সুর আছে । শুনতে ভারি মিষ্টি লাগে। সেটা লিখে বোঝানো বেশ কঠিন। হারমনিয়ামে যে সপ্তক আছে, তার উদারা, মুদারা আর তারা দিয়েও তাকে ধরা যায় না। তবে সেই সুরে একটা তিরতিরে মায়া আছে । কথা বললে মনে হয় কাছের কেউ। সাধে কী গুপী গাইন গেয়েছিলেন, এ যে সুরেরই ভাষা, ছন্দেরই ভাষা, তালেরই ভাষা, আনন্দেরই ভাষা...।
আমার শাশুড়ি রিজিয়া সরকার সেই সুরের আধার। তাঁর কথায় সুর থাকে, মায়া থাকে। রাজশাহীতেই থাকেন, মাঝে মধ্যে ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় আসেন। এবার এসেছেন ক’দিনের জন্য। ঢাকায় আসার আগে কর্নিয়ায় সমস্যা হচ্ছিল। রাজশাহীতে চোখের অপারেশন করিয়েছেন । এখন খুব ভালো দেখতে পাচ্ছেন। এতটাই যে ৭০-৭৫ বছর আগে পুকুর পাড়ের গাছের ডাসা ডুমুর যেন হাত বাড়ালেই ধরতে পারেন । আমাকে বললেন, অপারেশনের পর তাঁর শাশুড়ির পান ছেঁচার হামানদিস্তা চোখের সামনে নাচছে । আমি বললাম, যার দৃষ্টি এত দূর অব্দি, তাঁর চোখের আলো কমবে কী করে?
সময় পেলে আমি তাঁর সঙ্গে গল্প করি। বালিকাবেলার গল্প, তরুণীবেলার গল্প, কীভাবে বেড়ে ওঠলেন- সেই সব গল্প । আসলে গল্প নয়, আমি তাঁর মাটিতে কোপ দিই। ওমনি রোদ পেয়ে গা ঝাড়া দিয়ে বেরিয়ে আসে অচেনা সিন্দুকে রাখা স্মৃতির পুঁথি। তিনিও নেমে পড়েন ‘রোদেলা দুপুরে মধ্য পুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতারে’ । পুকুরের পানি তাঁর চোখ বেয়ে নামে। ৮২ বছরের বৃদ্ধা হয়ে যান ফ্রক পরা বালিকা।
 শাশুড়ির বাবা চয়ন উদ্দিন সরকারের পরিবার ছিল রাজশাহী ও কলকাতায়- দুভাগে। চয়ন উদ্দিনের সাত ছেলের পর একটি মাত্র কন্যা। আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের সাত ভাই চম্পা রূপকথার চম্পা। বছর দশেক আগে চয়ন উদ্দিনের একটি ডায়েরি খুঁজে পাওয়া যায়। তাতে জানা যায়, তাঁর কন্যার জন্ম ১৯৩৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর।
শাশুড়ি আমাকে বললেন, খুব ছোট বেলায় দাদিবিবি তাঁকে পড়াশোনার জন্য রাজশাহী থেকে কলকাতার রিপন স্ট্রিটের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু কলকাতায় তাঁর থানা গাড়া হয়নি। স্কুলে যাওয়ার কিছুদিন পর দাদিবিবি মারা যান। চাচাত বোন মোমেনা আর তিনি চলে আসেন রাজশাহীতে। ফিরে এসে প্রথমে জুবেলি স্কুলে পরে রাজশাহীর নামকরা পিএন গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে পরিবার তাঁকে পাত্রস্থ করেন। সংসারে এসে সারাক্ষণ তিনি চুপচাপই থাকতেন, শামসুর রাহমানের ভাষায় ‘যেন তিনি সব গান দুঃখ-জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে রেখেছেন বন্ধ করে আজীবন।’
কলকাতা থেকে আসার সময় অনেক কিছুর সঙ্গে তিনি একটা ঘড়িও এনেছিলেন। সীমান্তের কাঁটাতারে সেটা আধ ঘণ্টা পিছিয়ে গেল। কিন্তু তাঁকে আর পেছাতে হয়নি। দেখতে দেখতে স্বামী, ছয় মেয়ে আর পাঁচ ছেলের সংসারের কর্ত্রী হয়ে ওঠেন। আমাকে বললেন, খুব ছোট বেলায় আমরা কলকাতাকেই আমাদের দেশ বলতাম। জানতে চাইলাম দেশ মানে কী?  তিনি আমার দিকে তাকালেন। বললেন, দেশ মানে আসলে কাঁটাতার।
ছোট বেলা থেকে সিনেমার পোকা ছিলেন। ভর দুপুরে সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে চুপিচুপি সিনেমা দেখতে যেতেন ‘কল্পনা’ বা ‘বর্ণালী’তে। আমার কাছে সেই গল্প করতে করতে হেসে কুটিকুটি। তাঁর বাড়ির সামনেই পদ্মা নদী। বললেন, বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে নৌকার ছইয়ে বসে পদ্মায় ঢেউয়ের তালে দুলতেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই চোখ হয়ে যায় ভরা নদী- টলমল টলমল ।
তাঁকে নিয়ে অনেক মজার গল্পও আছে। একদিন ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন তিনি।আমি দৌড়ে এসে ধরে ফেলায় রক্ষা পান। এরপর নিজকে সামলে নিয়ে বলেন, এই বয়সেই চলাফেরা করতে পারছি না, বুড়ি হলে কী হবে? আমি কিছু না বলে হা করে থাকি।  
রাজশাহীতে তাঁর একটি দোতলা বাড়ি আছে, নাম ‘খয়রাতি বাড়ি’ । এ বাড়ির ভাড়ার টাকার সবটা তিনি দান করেন। ঢাকায় আসার সময় হলে কাকে কত করে দিতে হবে তা আগে ঠিক করেন, তারপর আসেন। তবে ঢাকায় কদিন থাকার পর তাঁর আর মন টেকে না। বাড়ির জন্য আইঢাই করেন। ঠিক যেন সেই গল্পটা। বিভূতিভূষণের গল্প - দ্রবময়ীর কাশিবাস । সে গল্পে ছিল, সংসার ছেড়ে দ্রবময়ী গেলেন কাশিতে। কিন্তু ধর্মকর্মে তাঁর মন টেকে না। মন পড়ে থাকে বাড়িতে। মুংলি নামে তার একটি গরু ছিল। শীতে গোয়ালে আগুন জ্বালাতেন, মুংলির যাতে কষ্ট না হয়। এখন অনেক শীত, কাশিতে বসে মুংলির জন্য বুকটা হাহাকার করে ওঠে। দ্রবময়ী আর থাকতে পারেন না। ফিরে আসেন বাড়িতে । দ্রবময়ীর ফিরে আসা দেখে ছলছল করে ওঠে মুংলির চোখ। দ্রবময়ীর মনটাও শান্তিতে ভরে যায়।
আমার শাশুড়ি রিজিয়া সরকার যেন বিভূতিভূষণের সেই গল্পের দ্রবময়ী। ঘরের জন্য, গাছের জন্য, ঘাসের জন্য, মাটির জন্য তাঁর মনে কাঁদে। ঢাকায় ইট পাথরের দালান তাঁকে ধরে রাখতে পারে না। তাঁর কাছে রাজধানীর জীবন মানে শিশুপাঠের কবিতা- “ইট পাথরের বাড়ি শুধু ইট পাথরের ঘর/ কেউ যায় না কারও বাড়ি সবাই যেন পর”।
(বি.দ্র: প্রথম আলোর নিউজ রুমে বসে শাশুড়ির গল্প করছিলাম সাবিহা-মানসুরার সঙ্গে। শুনে মানসুরা বললেন, তাঁকে নিয়ে তো ফেসবুকে লিখলেন না। বাসায় এসে সেটা বলে ধরা খেলাম। এটা সেই পর্ব)

* কামরুল হাসান: সাংবাদিক।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top