logo
news image

সেই মেয়েটি

ড.মির্জা গোলাপ সারোয়ার পিপিএম।।
সকাল থেকেই আকাশ পরিষ্কার এবং রৌদ্রকরোজ্জল। মাঝে মাঝে মৃদু বাতাস বইছে। অনেকদিন পর মমতাময়ী মায়ের সাথে দেখা হবে বলে আবির ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। ব্যস্ততার পরিধি কাটিয়ে সকালে সিল্কসিটি ট্রেনে ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার উদ্দেশ্যে কমলাপুর ষ্টেশনে গিয়ে বার্থে বসে ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষায় পত্রিকা পড়তে থাকে।
আবির বুয়েট থেকে কম্পিউটার সাইন্স-এ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সদ্য একটি বেসরকারি কোম্পানিতে মোটা বেতনে চাকরি পেয়েছে। মায়ের ইচ্ছা এবারই তার বিয়ে দেবেন। আবির মায়ের কথা কখনও অমান্য করেনি। কারন ছেলে বেলায় বাবা মারা যাবার পর মা-ই তাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। আবির বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। মা দুঃখ  পাবেন, এধরণের কোনো কাজই সে করেনা। মায়ের পছন্দ এবং ইচ্ছানুযায়ী একটি মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। এবার বাড়িতে গেলেই বিয়ে। মেয়েটি পেশায় ডাক্তার। দেখতে নাকি ভারী সুন্দর।
এক্সকিউজ মি, আমাকে একটু যেতে দেবেন? একজন মেয়ের মিষ্টি মধুর সুললিত কন্ঠ শুনে আবির পত্রিকার পাতা থেকে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে একটি সুন্দর মেয়ে মুখে সহজ সরল প্রানবন্ত হাসি নিয়ে অনেক আলো ছড়িয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জ্বি, প্লিজ বলে আবির সরে গিয়ে মেয়েটিকে বসতে দেয়। এর মধ্যে ট্রেন ছাড়ে। কামরায় তারা দু'জনাই। এটেনডেন্ট বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়। সেদিকে দু'জনে চোখ তুলে থাকায়।
মেয়েটি ভাবে, ছেলেটি দারুণ স্মার্ট এবং ভদ্র বলে মনে হয়। তাকে একা পেয়ে আগ বাড়িয়ে কথার ফুলঝুরি ফোটাবে না তো? কারন সুন্দরী মেয়ে দেখলে ছেলেরা তো পাশে ঘুরঘুর করতে থাকে। মনে মনে মেয়েটি শংকিত বোধ করে। কিন্তু না, ছেলেটি সেই যে পত্রিকার পাতায় মুখ গুঁজেছে, তাকে দেখা বা তার সাথে কথা বলার চেষ্টাই করছেনা। এদিকে আবিরও ভাবে, মেয়েটি খবই স্মার্ট এবং রূপসী। এভাবে একটি বন্ধ কামরায়  নিরিবিলি একজন সুন্দরী মেয়ের সাথে একত্রে দীর্ঘ যাত্রায় সে মনে মনে অস্বস্তি বোধ করে। কৌশল হিসেবে কোনো দিকে না তাকিয়ে একমনে পত্রিকা পড়তেই থাকে।
মেয়েটি চুপচাপ না থেকে আলাপের মাধ্যমে ছেলেটির সম্পর্কে জানতে চায়। ভাবে, চেহারা দেখে তো ভদ্র ঘরের সন্তান বলেই মনে হয়। তথাপি অনেক সময় মুখোশধারী ভদ্রলোকের কথাও শোনা যায়। তাছাড়া কথাবার্তায় পরিবেশ হালকা হয়ে অস্বস্তিভাবও কেটে যাবে। এদিকে আবিরও ভাবে , এভাবে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকাটাও এক ধরনের অভদ্রতা। বিশেষ করে মেয়েটি মুখোমুখি তার সামনের সিটেই বসা।
এক্সকিউজ মি, রাজশাহীতে যাবেন নিশ্চয়ই? মেয়েটির আচমকা প্রশ্নে আবির জানায়, জ্বি হ্যা। আপনি ? আমিও তাই। এরপর মেয়েটি কিছুক্ষন নীরব থাকে। ভাবে , কিভাবে ছেলেটির পরিচয় জানবে। এদিকে আবিরও ভাবে,  মেয়েটির পরিচয় জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না। এটা অভদ্রতার শামিল। যদিও,মেয়েটিকে দেখে সে ধরনের মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে স্নিগ্ধ সকালের সদ্য ফোটা তরতাজা ফুল। যা শুধু সুবাসই ছড়াচ্ছে। স্বল্প সময়ের পরিচয়ে তাকে ভীষন ভালো লাগে। বিশেষ করে মেয়েটির ভূবণ ভুলানো হাসি আবিরকে মুগ্ধ করে। হাসলে মনে হয় মুক্তো ঝরে।
এ সময় নিরবতা ভেঙে মেয়েটি সাবলীলভাবে জানায়, তার বাড়ি রাজশাহী। উত্তরে আবির বলে, সেও রাজশাহীর ছেলে। এরপর মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে কথা হয়। মেয়েটি ভাবে,  বেশি কথা বললে হয়তো ছেলেটি তার মোবাইল নম্বর চেয়ে বসবে। যদিও এখন অবধি সে ধরনের কোনো লক্ষন তার মাঝে দেখা যায়নি। এবং ছেলেটির আচরনও তার কাছে খুবই ভদ্রচিতো মনে হয়েছে।তবুও এতো স্বল্প পরিচয়ে একজনকে সঠিকভাবে চেনা এতো সহজ নয়। কার মনে কী আছে বলা মুশকিল।  ভালোভাবে পৌঁছাতে পারলেই বাঁচে।
দু'জনাই এয়ার হেড লাগিয়ে গান শুনে, কখনও বা ম্যাগাজিন পড়ে। কিংবা জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখে গ্রাম বাংলার ছবির মতো সাজানো সুন্দর গ্রাম, শস্য শ্যামল মাঠ। মাঝে মাঝে নদী একে বেঁকে মিশেছে দূর দূরান্তে। নদীর মাঝে কখনও বা পাল তোলা নৌকা তরতর করে এগিয়ে চলেছে। সবুজ গাছের সমারোহ নদীর দু'পাশে। এ সময় জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে  মেয়েটির মুখে পড়ে খুব সুন্দর লাগছিলো। ঠিক যেন নাটোরের বনলতা সেন। বিকেলে রাজশাহীতে পৌঁছে দু'জনাই একে অপরকে শুভকামনা জানিয়ে যার যার গন্তব্যে রওয়ানা হয়। পেছন থেকে মনে হয় শেষ বিকেলে ক্লান্ত পাখি নীড়ে ফিরে চলেছে।
দু'দিন পর শহরের এক ধনী ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ের সাথে বিয়ের সময় ঘোমটা সরে যেতেই কনেকে দেখে আবির চমকে ওঠে।  আরে এ তো ট্রেনের সেই মেয়েটি। আবির খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে। মেয়েটিও উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনায় আবেগাপ্লুত হয়ে যায়। অনেক তৃপ্তির আভা নিয়ে বিহবল চিত্তে দু'জনাই দু'জনের দিকে বিস্মিতভাবে অপরুপ মমতায় পুলকিত হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। বিস্ময়ের ঘোর কেটে কারো চোখের পাতা পড়েনা। দু'জনার চোখে আকাশ ছোঁয়ার অনেক রঙিন স্বপ্ন এবং চেহারায় উষ্ণতার ছাপ। স্বস্তির নিঃশ্বাস  ফেলে উভয়ের মন চায় আশার উথাল-পাথাল ঢেউয়ের
নীলিমায় হারিয়ে যেতে।
চারিদিকে ভেসে আসে বিয়েবাড়ির হই হুল্লোড় আর আনন্দ। স্বপ্নীলমোহে আচ্ছন্ন হয়ে সৌভাগ্যের দুয়ারে দাঁড়িয়ে দু'জনার হৃদয়ে বইতে থাকে একরাশ আনন্দের সুবাতাস। খুশির বাঁধ ভেঙে মেয়েটির মুখে এক টুকরো মায়াবী হাসি। দু-চোখে স্বপ্নের ঝিকিমিকি আলো এবং হৃদয় জুড়ে শুধু দিগন্ত ছোঁয়া নীল আকাশ। আবিরের মনেও নতুন এক প্রানের স্পন্দন, চোখে একরাশ রঙিন স্বপ্ন। তার সাদা মনের আঙিনা জুড়ে এখন শুধু কনে হিসেবে সামনে থাকা স্বপ্ন সারথী সেই মেয়েটি।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top