logo
news image

বন্যাডুবি ও কান্নাভেজা কোরবানি

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
শ্রাবণের সতের তারিখে হতে যাচ্ছে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত পবিত্র কোরবানির ঈদ। দেশের ২৫টি জেলায় বন্যার পানি ঢুকেছে। গোটা দেশের ৪০ ভাগ ভূমি বন্যার থৈ থৈ পানির নিচে ডুবে আছে। প্রথম ও দ্বিতীয় দফা বন্যায় আক্রান্ত হবার পর ঈদের সময় কোন কোন এলাকায় তৃতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনার ভয়াল সংক্রমণের মাঝে ভিন্ন রকম এক সময়ে বন্যায় ছিন্নভিন্ন দুস্থ: মানুষ অন্যরকম এক ঈদের মুখোমুখি।
করোনাভয়ে ঘরে বসে কাটাবে নাকি ঈদ যাত্রায় শামিল হবে তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের ঘোর না কাটতেই ইতোমধ্যে রাস্তায় বের হতে হয়েছে তাদেরকে। দু’দিন ধরে রাজধানীসহ নানা জায়গায় ঈদের কেনাকাটাও শুরু করে দিয়েছেন অনেকে।
করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারীভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে ঈদের সময় পারতপক্ষে নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করতে। এছাড়া চারদিকে বন্যা তবুও শহরের কর্মস্থল ছেড়ে গ্রামের ঠিকানায় যেতে মরিয়া ঘরমুখী মানুষের ঈদযাত্রা থেমে নেই। বাস, ট্রেন, লঞ্চ সব যানবাহনে উপচে পরা ভীড়। সেগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতায়ত করা দুষ্কর। যাত্রাকালীণ অসহ দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে পথে চলাচল করতে নেমেছে মানুষ। গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ অভিমত দিয়েছেন গাদাগাদি করে গণপরিবহনে ভ্রমণ ও গিজগিজ করে কোরবানির পশুর হাটে কেনাবেচায় শরিক হওয়া উভয়ই ‘পাবলিক প্লেস’ এবং এই ধরনের জনসমাগম করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর ১০০% উপযুক্ত জায়গা। তাই আসন্ন ঈদে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বেশী উদাসীনতা আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউকে আরো বেসামাল করে তুলতে পারে। বন্যা পরবর্তী সময়ে যে ঢেউয়ের চাপ মোকাবেলা করার প্রস্তুতি ও সামর্থ্য আমাদের নেই।
বন্যার পাশাপাশি চলছে অবিরাম বৃষ্টি ও ভয়ংকর নদীভাঙ্গন। রাস্তা ডুবেছে, ভেঙ্গে গেছে ব্রীজ, কালভার্ট। একসংগে দেশের ৩১টি জেলা পানিতে তলিয়ে গেছে। বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় বাঁধের পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঠাঁই নিয়েছে দুস্থ মানুয়। কিন্তু সেগুলোতে গবাদি পশু রাখার মত জায়গা নেই। মুরগী গাছের মধ্যে এবং ছাগল-ভেড়া টিনের চালে আশ্রয় নিলেও গরু-মহিষ পানিতে অবস্থান করছে। অনেকের রান্না-খাওয়া বন্ধ। কেউ মৃত্যুবরণ করলে গোরস্থান তলিয়ে যাওয়ায় দাফন নিয়ে বিপাকে পড়েছে বন্যার্ত এলাকার মানুষ। রাজশাহীর বাগমারার বড় বিহানালী ইউনিয়নের বাগান্না গ্রামের গোরস্থানে বুকসমান পানি হওয়ায় সেখানে এজন বয়স্ক ব্যক্তির লাশ বৈঠকখানায় দাফন করা হয়েছে।
কোন কোন এলাকায় পশুর হাট বসানোর মত পর্যাপ্ত ডাঙ্গা জায়গা নেই। সামান্য উঁচু জায়গায় গাদাগাদি করে বসেছে কোরবানির পশুর হাট। সিরাজগঞ্জের একচাষী বলেছেন, তার এলাকায় শুধু পানি আর পানি। ঘরবাড়ি ডুবে আছে, কোরবানির হাটে বিক্রির উদ্দেশ্য পাালিত আদরের পোষা গরুগুলো তিনদিন ধরে পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শীর্ণকায় হয়ে যাওয়া গরুগুলো হাটে তুললে ক্রেতারা দাম জিজ্ঞাসাও করেনি। হাটে ঢাকা-চট্টগ্রামের পাইকার নেই, ব্যাপারীও নেই, তাদের এজেন্টও আসেনি। শুধু বিক্রেতা আছে ক্রেতা নেই। কিছু কৌতুহলী মানুষ বেচাকেনা দেখতে এসেছে। এবারের ঈদে তাকে লোকসান গুনতে হবে।
এদিকে হাটে সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা থাকলেও কোন ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। মানুষ ও পশুতে দৈহিক দূরত্ব রাখার বিষয়টি মোটেই মানা হচ্ছে না। হাত ধোয়ার জন্য পানি, সাবান, লিকুইড, ব্লিচিং ইত্যাদির কথা টিভিতে শুনলেও গ্রামে-গঞ্জের পশুর হাটে এর ব্যবস্থা করা হয়নি। ঢাকার পাশে রূপগঞ্জের গোলাকান্দিরহাটে ৯৮ ভাগ মানুষের মুখে মাস্ক নেই। গিজ্ গিজ্ করা মানুষ ঠেলাঠেলি করে কোরবানির পশুর সাথে হাটে অবস্থান করছে। অল্প জায়গায় এত মানুষ ও এত পশু তাই সবাই এখানে অসামাজিক দূরত্বভাবে বিচরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে ক্রেতা নয় কিন্তু দেখতে আসার আড়ালে চাঁদাবাজি, জালনোট, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টির মত অপরাধমূলক কাজ করার জন্য হাটগুলোতে অযথা ভিড় করছে। তাই সেখানে জালনোট যাচাই করার মেশিন বসানো এবং পুলিশি প্রহরা বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। ঢাকার হাটগুলো ছাড়া গ্রামে-গঞ্জের পশুর হাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তেমন চোখে পড়ছে না।
অনলাইন হাটের কথা টিভিতে বলাবলি করা হলেও সেটা শুধু বড় বড় শহরকেন্দ্রিক এবং অপর্যাপ্ত তথ্যনির্ভর। গ্রামে-গঞ্জের অশিক্ষিত কৃষক, প্রান্তিক চাষী, ফড়িয়ারা এ বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না। কেউ কেউ অনলাইন হাটের কথা শুনেছেন কিন্তু সেটাতে কিভাবে গরু-ছাগল বিক্রি করা হয় তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। গ্রামের কিছু শিক্ষিত যুবক অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করলেও ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য ও ধীরগতির কাছে তারা হার মেনে অনলাইন পশু ব্যবসা করার চিন্তা বাদ দিয়েছে।
এতকিছুর পরও যারা কোরবানি দেবেন তাদেরকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। যারা কোরবানির পশু জবাই, মাংস কাটাকাটি, বন্টন, রান্না ও সংরক্ষেণের কাজগুলো করবেন তাদের ব্যক্তিগত সুস্থতার বিষয়টি নিয়ে অনেকে শঙ্কিত। তাদের করোনা উপসর্গের সন্দেহ থাকলে এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। যে কোন উপায়ে অসুস্থ মানুষকে পশু ও মাংসের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে।
যারা মাংস কাটাকাটির কাজ করবেন তাদেরকে মাস্ক, হাতমোজা ও রাবারের জুতো পরে নিতে হবে। মাংস রাখার পাত্রগুলো সাবান দিয়ে ভালভাবে পরিস্কার করে নিতে হবে। গায়ের পোষাক পরিবর্তন করে নিতে হবে।
কাঁচা মাংস বাড়ি বাড়ি বন্টন ও ভিড়বাট্টা পরিহার করা উচিত। দৈহিক দূরত্ব বজায় রেখে মাংসবন্টনের বিষয়টি সতর্কতার সাথে পালন করা উচিত। কোরবানি শেষে বর্জ্য যেমন, চামড়া, রক্ত, হাড়, শিং ইত্যাদি দ্রুত অপসারণ, বিক্রি অথবা পুঁতে ফেলতে হবে। স্যাভলন বা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে কোরবানির জায়গা ধুয়ে পরিস্কার করে ফেরতে হবে।
প্রতিবছর কোরবানি ঈদের আগে যে ধরনের সরগরম অবস্থা দেখা যায় এবারের ঈদে তেমন কিছু নেই। কেউ মাইকে বিশাল গরু-মহিষের হাট নিয়ে প্রচার করছে না, কেউ লিল্লাহ বোডিং-এ চামড়া প্রপ্তির জন্য লিফলেট দিচ্ছে না, কোন আমেজ নেই। ভয়ে ভয়ে কোরবানির কথা উচ্চারণ করছেন সবাই।
এবার পশু পরিবহনের জন্য প্রথমবারের মত “ক্যাটল স্পেশাল ট্রেনের” ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশটি করে বগির প্রতিটিতে বিশটি করে গরু পরিবহন করার কথা বলা হচ্ছে। রাজশাহী, কুষ্টিয়া থেকে গরু নিয়ে এই স্পেশাল ট্রেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম যাচ্ছে। এই ট্রেনে পশু পরিবহন খুব সস্তা হবে বলে জানানো হয়েছে। কারণ, পথে চাঁদাবাজি হবার শঙ্কা নেই।
করোনা সংক্রমণ শুরু হবার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই এতো কিছু ঘটে গেছে এবং যাচ্ছে এই সুন্দর পৃথিবীটাতে। বাংলাদেশে এর প্রভাবটা আরো বেশী ভয়ংকর হবে, এমন আশঙ্কা করার কারণ রয়েছে। আমাদের দেশের মানুষের অসম আয়-ব্যয়, সামাজিক বিভাজন ও মানুষের চরম অসতর্কতা দ্রুত সামাজিক বিশৃংখলা ও ভাঙ্গন সৃষ্টি করার অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করে। ফলে দ্রুত সামাজিক নিয়ন্ত্রণহীনতা তৈরী হয়ে যায় এবং শাসককে সিদ্ধান্ত গ্রহণে হিমশিম খেতে হয়। করোনার সময়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণহীনতা ও বিশৃংখলা এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বন্যার করাল গ্রাস। বন্যা ও নদীভাঙ্গন আমাদের নতুন সমস্যা না হলেও এবারে করোনার মধ্যে বন্যা এসে সার্বিক পরিস্থিতি অতি বেশী নাজুক করে দিয়েছে। করোনার এই কদর্য ও অনাকাঙ্খিত সময়টা অনেক দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে বহু বিজ্ঞজন ইতোমধ্যে আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন। অনাগত সেই দিনগুলো হয়তো আরো ভিন্নরকম হতে পারে।
একটা ভয়ংকর অন্যরকম সময়ে ভিন্নরকম চ্যালেঞ্জ মানুষের জন্য প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে এবং হবে। এবারে করোনার মধ্যে প্রলয়ংকারী বন্যায় দেশের ৩০-৪০ ভাগ এলাকা পানির নিচে ডুবে গেছে। এই বন্যাডুবির মধ্যেই ত্যাগ বা অশ্রুভেজা কোরবানির ঈদ সমাগত। এ ঈদে আনন্দ নেই, হ্যান্ডশেক নেই, মোলাকাত বা কোলাকুলি করার উপায় নেই- এমনকি রঙীন মাস্ক দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখার কারণে পরস্পরকে মুখ দেখানোর উপায় নেই। কারো হাসিমুখ কেউ দেখতে পাচ্ছেন না। কারো কষ্ট ও কান্নার অভিব্যক্তিতে কেউ কাউকে বুকে জড়িয়ে সান্তনা দিতে পারছেন না। সংক্রমণের ভয়ে ফকির মিসকিনকে খাবার না দিয়ে দূর থেকে দানের পয়সা নিক্ষেপ করাটা যেন মানবতা ও দান-খয়রাতকে উপহাস করে চলেছে। করোনার কঠিন আগ্রাসন সারা বিশে^ মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ ও নির্মমতার বেড়াজাল সৃষ্টি করে ফেলেছে। ত্যাগ ও কষ্টের এ কঠিন পরীক্ষার মধ্যে মানুষকে এবার কোরবানির ঈদের দিনটি ভালভাবে উদ্যাপন করার চেষ্টা করতে হবে।
মনের চাপা কষ্টের মধ্যে এভাবেই হয়তো আরো বহুদিন ভবিষ্যতের ঘরকন্না চলবে। কতদিন সেটা চালাতে হবে এখনও কেউ বলতে পারছেন না। ইনশাল্লাহ্ সেই অনাগত দিনগুলো অনেক ভাল হবে।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top