logo
news image

কাবাঘর স্পর্শ ছাড়াই প্রতীকী হজ

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
প্রতিবছর সারা বিশ্বের পঁচিশ লক্ষ হাজী পবিত্র হজে অংশগ্রহণ করে থাকেন। এবার ১৬০টি দেশের দশ হাজার হাজী নিয়ে পবিত্র হজব্রত পালনের পরিকল্পনা নেয়া হলেও এই সংখ্যা হ্রাস করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মাত্র এক হাজার হাজীকে নিয়ে শুরু হয়েছে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা। সৌদি নাগরিক এবং সৌদি আরবে অবস্থানরত কিছু বিদেশীদেরকে নিয়ে মক্কা ও মিনায় পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। সৌদিতে বর্তমানে অবস্থানরতরাই ্এই সুযোগ পেয়েছেন। বাইরের দেশ থেকে কাউকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। অবৈধভাবে সৌদিতে হজের জন্য প্রবেশ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে ২৪৪ জন বিদেশী গ্রেফতার হয়েছেন (আরব নিউজ ২৮.৭.২০২০)।
এবারের হজে খুতবা দিবেন ৮৯ বছর বয়স্ক বিজ্ঞ শায়খ ড. আব্দুল্লাহ্ বিন সুলাইমান। তিনি একজন আইন বিশারদ। শায়খ সুলাইমান মক্কা আল-মুকাররমা কোর্টের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এক সরকারী ফরমানে তাঁকে এ বছরের হজে খুতবা দেয়ার জন্য মনোনীত করেছেন।
করোনা সংক্রমণ এড়াতে এবারের হজে কিছু সতর্কতামূলক বিধিনিষেধ জারী করা হয়েছে। পবিত্র হজ উপলক্ষ্যে মক্কার কা’বা এবং মিনা, আরাফাহ, মুযদালিফা সহ সকল স্থানে প্রার্থনা ও থাকার জায়গা স্যানিটাইজ করা হয়েছে। দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখার সুবিধার্থে সব জায়গায় পৃথক পৃথক লেন ও বিশেষ চিহ্ন দেয়া হয়েছে। হাজীগণের শরীরের তাপমাত্রা নিরুপণ ও শরীরকে স্যানিটাইজ করার জন্য স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ভিতর দিয়ে গমনাগমণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবার হাজীগণ ১ মিটার দৈহিক দূরত্ব বজায় রেখে পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করবেন। সাফা-মারওয়ায় দৌড়ানোর সময়, প্রার্থনার সময় দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
এছাড়া পবিত্র কা’বাঘরের একেবারে নিকটে যাতে কেউ যেতে না পারেন সেজন্য আগে থেকেই কিছুটা সংস্কার করে বেষ্টনী দেয়া হয়েছে। তাই এখন পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করার সময় বেষ্টনীর বাইরে থেকে করতে হয়। এছাড়া করোনার এই সংকটময় সময় হজরে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুমু খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। জমজম কূপের কাছ যেতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। হাজীগণের নিকট পবিত্র জমজমের পানি সরবরাহের জন্য বিশেষ প্যাকেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পবিত্র কাবাঘরে প্রবেশের জন্য এবং বহির্গমণের হবার জন্য পৃথক গেট ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পবিত্র হজব্রত পালনের ৯০ বছরের ইতিহাসে এবার প্রথম বাইরের দেশ থেকে হাজীদের অংগ্রহণের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিশ্বের অনেক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এবারে হজ করতে না পারায় মনক্ষুন্ন হয়েছেন।
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন যেভাবে চান সেভাবেই পৃথিবীর সবকিছু আবর্তিত হতে থাকবে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ মানুষকে দিব্য জ্ঞান দান করেন। এই জ্ঞানই মানুষকে অন্যান্য প্রাণি থেকে পৃথক করেছে, আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা নামের খেতাব পেয়েছে মানুষ। আবার নিজ কর্মফলের কারণে দুর্ণামের ভাগী হচ্ছে এই সেরা জীবরা। মন্দ মানুষের সাথে জ্ঞানী ও চালাক মানুষগুলোও এই মুহূর্তে পৃথিবীর চারদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, জলাবদ্ধতা, পঙ্গপাল, দাবানল, বজ্রপাত, ইত্যাদির মুখোমুখি হচ্ছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট অপরাধ, সহিংসতা, জালিয়াতি, প্রতারণা ইত্যাদি। মানবতা যেন ধূলোয় মিশে তলানিতে হারিয়ে গেছে।
কিছু মানুষ নৈতিকতা বিবর্জিত আচরণ শুরু করে দুর্নীতিকে শিল্পে পরিণত করে ফেলেছে। পাপ কাজকে ঘৃণা না করে বরং সাধারণ বিনোদন মনে করছে। তাই এদেরকে প্রাকৃতিকভাবে পাকড়াও করার সময় ও চাপ এসে গেছে। এভাবে মানুষের অবহেলা, অসতর্কতা, লোভ-লালসার কারণে অনৈতিক কর্মকান্ড নিত্যনতুন স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলে মানব সভ্যতাকে যুগে যুগে বিপদে ফেলেছে। সবকিছুকে ছাড়িয়ে মৃত্যুভয় যেন সবকাজের মধ্যে বাগ্ড়া দিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। প্রতিটি প্রাণিকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। সব মানুষ সেটা জানে। তথাপি মৃত্যুর জন্য সময় থাকতে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে অবহেলা করে। কোভিড-১৯ এর মাধ্যমে মানুষকে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের আদেশ ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) নির্দেশনা অনুধাবন করার সময় এসেছে।
মৃত্যুর পূর্বে পাপ মোচনের জন্য অনেক মানুষ পবিত্র হজের মাধ্যমে তাওবা করে অনুতপ্ত হন। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এবারের প্রতীকী হজেও যেন আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সবার তাওবা কবুল করেন, কোরবানি ও যাবতীয় ইবাদত কবুল করে বিশ্ববাসীকে যাবতীয় আসমানী ও জমিনী বালা-মুসিবত, অতি-মহামারী, সকল দু:খ-কষ্ট থেকে মুক্তি দান করে পরম শান্তিময় পরিবেশ দান করেন, পবিত্র হজের প্রাক্কালে কায়মনোবাক্যে এই কামনা করছি।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top