logo
news image

তিস্তায় তোড়ে ঘন বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষ

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
সর্বকালের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে তিস্তা নদী পানিপ্রবাহ এবার বিপসীমার ৫৫ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল ১২ জুন রোববার রাত ১২ টায়। ডালিয়া ব্যারাজের পানি ধারণ ক্ষমতা চার লাখ কিউসেক। সতর্কতা স্কেলে এর বেশী পানি প্রবাহ চিহ্নিত হলে ব্যারেজ রক্ষার্থে ফ্লাড বাইপাস খুলে দেয়ার নিয়ম। এবার সেটা খুলে দেয়া হয়েছে।
করোনার যন্ত্রণার মধ্যে ঘরের ভিতর বন্যার পানি। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা ধরলার বানের পানি নিচের দিকে টানছে খুব ধীর গতিতে। যার ফলে দেশের ২৪টি জেলায় একসংগে বন্যা দেখা দিয়েছে।
তিস্তা নদীতে বান ডাকার ঘটনা নতুন নয়। শুধু প্রাকৃতিক কারণে এই নদীতে বন্যা সৃষ্টি হয় না। উজানে বরফগলা পানি ও অতিবৃষ্টি ছাড়াও মানবসৃষ্ট কারণে তিস্তায় বন্যা হতে দেখা গেছে। প্রতি বছর বহুবার ব্যারেজ ও জান-মাল রক্ষার্থে ভারতীয় এলাকায় হঠাৎ ফ্লাড বাইপাস খুলে দেয়া হয় এবং এর ফলে বাংলাদেশ অংশে ঘন ঘন হঠাৎ বন্যা হয়। এর ফলে এবছর ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় দু’বার বানের পানি ঢুকে পড়েছে।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। পূর্ব হিমালয়ে ভারতের সিকিম রাজ্যের তিস্তা কংসী ও কংচুং এবং সোহামো লেকের নিকটবর্তী  পৌহুনরী গ্লেসিয়ার থেকে এর উৎপত্তি। বরফগলা ও বৃষ্টির পানি তিস্তা স্রোতস্বিনীর মূল উৎস। বাংলাদেশে তিস্তার ক্যাচমেন্ট এলাকা ৩১৫ কি:মি: যার সবটুকুই সমভূমি। সিকিম, দার্জিলিং ও পশিবচমবঙ্গেও জলপাইগুড়ি জেলা হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার উত্তর দিক দিয়ে প্রবেশ করে লালমনিরহাট জেলার দহগ্রাম, পাটগ্রাম, কালিগঞ্জ, হাতিবান্ধা, আদিতমারী, লালমনিরহাট সদর, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, কুড়িগ্রামের উলিপুর ও চিলমারী হয়ে চিলমারীর দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদীতে পতিত হয়েছে।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী হলেও এর একক নিয়ন্ত্রণ ভারতের হতে। একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে আমরা খরায় মরি পানি বিনে আর বন্যায় মরি পানির তোড়ে। অনেকগুলো গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায় (যেমন, হানিফ ১৯৭৮, ইসলাম ও হিগানো ২০০২) সিকিমের বিভিন্ন স্থানে এই নদীর খরস্রোতা অংশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ড্যাম তৈরী হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের ডালিয়া ব্যারেজ এলাকা থেকে মাত্র ৬০ কি.মি উজানে ভারতের গাজলডোবা নামক স্থানে আরেকটি তিস্তা ব্যারাজ নির্মিত হয়েছে। মূলত: এখান থেকে তিস্তা নদীর শুষ্ক মৌসুমের পানি কোলকাতার হুগলী নদীতে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু বর্ষার অতিরিক্ত পানি সামাল দিতে না পারলে সব গেট খুলে দিয়ে হঠাৎ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ বহুদিন ধরে শুষ্ক ও বর্ষা উভয় মৌসুমে প্রতিবেশী দেশের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের কারণে তিস্তা নদী সঞ্জাত নানা আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত যন্ত্রণা ভোগ করে।
কিছুদিন আগে গাজলডোবা ব্যারেজের সকল গেট খুলে দিয়ে সেখানে লাল পতাকা উড়ানো হয়েছে। উজানের পানি ও দেশের বৃষ্টি মিলে ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙ্গে লাল পতাকা উড়িয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে এবারের বন্যার যন্ত্রণাটা অতি ভয়ঙ্কর। কারণ করেনা যন্ত্রণায় নাকাল ঘরবন্দী মানুষ বিচলিত ও দিশেহারা হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তার উপর বাইপাস উপচে গিয়ে জনবসতিতে পানি ঢুকে পড়ায় ঘরবাড়ি পানির নিচে। মানুষের ঘুমানোর জায়গা নেই, খাদ্য নেই, ওষুধ নেই। গবাদিপশু রাখার জায়গা নেই। ত্রাণ জুটেছে যৎসামান্য।
সামনে কোরবানি ঈদ। অনেকে এই ঈদকে সামনে রেখে বিক্রির উদ্দেশ্যে কোরবানির গরু-খাসী মোটাতাজা করেছিলেন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে। হাট-বাজার ডুবে সবকিছু গেছে পানির মধ্যে। ভার্চুয়াল হাটের কথা কেউ কেউ শুনে থাকলেও সেটাতে কিভাবে গরু বিক্রি করা হয় তার নিয়ম-কানুন ওরা কেউ জানেন না, বুঝেন না। এ ব্যাপারে ওদের কাছে কেউ সহায়তা করতে আসেওনি। চরম উৎকন্ঠার মধ্যে ঐসকল অভাবী বর্গাচাষীদের দিন কাটছে। এছাড়া এই বিপদের মধ্যে অবস্থাসম্পন্ন কৃষকদের দিন কাটছে খুব হতাশায়। এই চরম নাজুক অবস্থায় বিপর্যস্ত মানুষ টিকে থাকতে পারবে তো?
মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে ঘনবৃষ্টি চলছে সারাদেশে। ফলে দেশের ২৪টি জেলার বন্যা আরো বিস্তৃত হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রতিবছর খরার সময় এলে বাংলাদেশে নদীর পানির ন্যায্য দাবী নিয়ে হৈচৈ শুরু করা হয়। কারণ সমস্যাটা শুষ্ক মৌসুমেই বেশী অনুভূত হয়। বিভিন্ন গবেষক, প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, রাজনীতিবিদগণ সেমিনার, ওয়ার্কশপ, মানববন্ধন, লং মাচর্, ইত্যাদি নিয়ে মেতে ওঠেন। দাবী তোলেন পানি চাই, ন্যায্য হিস্যা বা ভাগ চাই। তিস্তা যেহেতু একটি একটি আন্তর্জাতিক নদী তাই বাংলাদেশীদের এ নদীর পানির ভাগ চাওয়াটা আইনগতভাবে স্বীকৃত ও বৈধ দাবী।
বর্ষার সময় হঠাৎ বন্যার পানি কেন আসে সে ব্যাপারে কেউ কোন ব্যাখ্যা দেন না। আমরা উজানের দেশ ভারত থেকে সঠিক তিস্তার পানি প্রবাহের তথ্য পাই না । কখনও পেলেও তা সময়মত নয়, ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাবার পর পাই। আমাদের আমলারা ও রাজনৈতিক নেতারা এ বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক তথ্যবহুল রিপোর্টের তোয়াক্কা করেন না। আমাদের কর্তৃপক্ষের অনেক কর্তাব্যক্তিও বিষয়গুলো জানেন। আমাদের পলিসি-মেকারদের এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সময় কোথায়?
উজানের তথ্য পাবার অধিকার ভাটির দেশগুলোর রয়েছে। পৃথিবিীর দেশে দেশে আজ দ্বি-পাক্ষিক অথবা বহু-পাক্ষিক আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত (আসাপ) লাভ-লোকসানের কথা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে  হিসেব করে সমাধানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যেমন, আমেরিকা ও কানাডা কলাম্বিয়া নদীর স্যামন মাছ ও মিঠা পানি একটি কাম্য সমাধানের (অপটিমাম সল্যুশন)  মাধ্যমে ভাগাভাগি করছে। নদী গবেষকগণ সবাই হয়তো জানেন ট্রান্সবাউন্ডারী নদীর পানি ভাগ মূলত: একটি আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব নিরসনমূলক সমস্যাও বটে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, প্রতারণা প্রভৃতি জাতিেিত জাতিতে  (যেমন ইউফ্রেটিসের ভাগ নিয়ে সিরিয়া-তুরস্ক), (টোনেগাওয়া নদীর ভাগ নিয়ে জাপানের মধ্যেই ইবারাকি ও চিবা জেলা সরকারের মধ্যেও) দারুন সংকট একসময় সৃষ্টি হয়েছিল, দু’জেলার জনগণ পানির জন্য যুদ্ধও করেছিল। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কলাম্বিয়া ও টোনে নদীর সেই স্থানগুলো পরিদর্শনে যাবার। যাহোক, সহনশীল ও সহমর্মী জাতিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এধরনের সমস্যা সমাধানের অনেক ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে। তাঁরা দু’একটি আলোচনা সভা করে পারস্পরিক সহযোগিতার কথা মাথায় রেখে আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত লাভ-লোকসানের কথা মেনে নিয়ে সমাধানে উপনীত হয়েছে। করোনার কঠিন সময়ে খুব সম্প্রতি (রয়টার জুন ২৮,২০২০) নীল নদের পানি ভাগ নিয়েও আফ্রিকার তিন দেশ মিশর, সুদান ও ইথিওপিয়ার মধ্যে ফলপ্রসূ চুক্তি হয়েছে। মিশরের পানি সমস্যা সমধানের জন্য ইথিওপিয়া তাদের রিজার্ভাারের উচ্চতা বাড়ানোর জন্য তলদেশ ভরাট করতে রাজী হয়েছে। কত সুন্দর সৌহার্দ্যপূর্ন তাদের নিজ নিজ অবস্থান। অথচ, বিভিন্ন পর্যায়ে শতবারের অধিক মিটিং করেও একটি দেশের একগুঁয়েমি ও নানা অজানা কারণে আমরা তিস্তাচুক্তিকে আলোয় আনতে ব্যর্থ হয়েছি।
তাই তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, সুরমাসহ সব আন্তর্জাতিক নদীর উপর আমরা বন্যার আগাম তথ্য ও পূর্বাভাষ চাই। কিন্তুু আমাদের তিস্তার কথা যেন সেরকম নয়। খরার সময় এল আমরা শুধু চুক্তি চাই। বছরের অন্য সময় সব বেমালুম ভুলে যাই। শুধু চুক্তি সই করলেই কি আমাদের চাহিদা পূরণ হবে, সমস্যার সমাধান হবে? চুক্তির এজেন্ডা কি অদ্যাবধি বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পেরেছি? তাই তিস্তাকে নিয়ে খরা-বর্ষা উভয় মৌসুমের জন্য ভাবনা রেখে সামনের দিনে চুক্তি করতে অগ্রসর হতে হবে। ওয়েজ আর্নাররা বিদেশ থেকে যত টাকাই পাঠান না কেন অথবা গার্মেন্ট সেক্টরের যতই উন্নতি হোক না কেন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল মেরুদন্ড হল কৃষি। কৃষির উন্নয়নের উপর দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বর্ষায় বন্যা ও ‘ফ্লাশ-ফ্লাড’, খরায় প্রয়োজনীয় পানি না থাকা আমাদের কৃষি নির্ভর এ এলাকার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বন্যাকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ভাবলে চলবে না। এর সব কারণ খতিয়ে দেখে কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে তৎপর থাকতে হবে। করোনার আক্রমণে দিশেহারা মানুষ পুনরায় তাদের আদি পেশা কৃষিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে।
উত্তরের জনপদ যেহেতু অনেকটা নিরাপদ কৃষিভূমি দ্বারা আবৃত, এটাকে সযত্নে লালন করার জন্য তিস্তা-ধরলা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত এলাকার জন্য নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। করোনার সময় মানুষকে বাঁচাতে হবে এবং করোনাকাল বিদায় পরবর্তী দেশের আর্থ-সামাজিক নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে ডেল্টা পরিকল্পনায় তিস্তা-ধরলা-ব্রহ্মপুত্র বেসিনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সবকিছু মাথায় রেখে তিস্তাচুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করে ঘন ঘন বন্যার হাত থেকে বিপর্যস্ত মানুষকে রক্ষা করতে হবে এবং দেশের কৃষি-অর্থনীতির উন্নয়নে ডালিয়া ব্যারেজকে আশু কাজে লাগাতে হবে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top