logo
news image

অশান্ত পৃথিবী: ভীত-শ্রান্ত মানুষ

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
করোনা সংক্রমণকে ভয় পেয়ে মুখোশ পরে আছে পুরো পৃথিবীর মানুষ নামধারী সৃষ্টির সেরা সাহসী জীবগুলো। ভয় না পেতে বার বার টিভিতে, গণমাধ্যমে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। মনের সাহস বাড়ানোর জন্য নানা অনুষ্ঠান, উপদেশ যেন ভয়কে আরো বেশী স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানুষকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। কিন্তু এত ভয়ের কারণ হওয়া সত্ত্বেও কারো কারো করোনাকালে করণীয় বিষয়গুলো পালন করার ব্যাপারে আগ্রহ অথবা কোন কোন ক্ষেত্রে সমসুযোগ নেই। এই বিষয়টি সুযোগপ্রাপ্তদের জন্য আরও বড় ভয়ের কারণ।
বলা হয়ে থাকে- ভয় পেলে মরার আগেই মানুষ মরে যায়। বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের গতি প্রকৃতি দেখে মানুষ ভীত না হয়ে কী বা আর করবে? উন্নত দেশগুলো কিছুদিন আগে তাচ্ছিল্য করে করোনা সংক্রমণকে পাত্তা না দিয়ে মারণাস্ত্র ও কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি করে অবহেলায় সময় পার করে দিয়েছে। এখন তাদে সেই প্রস্তুতিহীনতার জন্য চরম খেসারত দিতে হচ্ছে। উন্নত দেশের পরিচয়ধারী মানুষেরাও আজ নিজেকে বাঁচার জন্য চিৎকার করছে।
এ পর্যন্ত অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে- যত শক্তিশালী দেশ, সেখানে করোনার মরণকামড় তত শক্ত হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।  মানুষের দম্ভ করার আর কীইবা বাকী আছে? মানুষ মরে যাচ্ছে, তবুও কারো কারো অহমিকা ও দাম্ভিকতা বন্ধ হচ্ছে না- এটা মানবতার জন্য বড় ভয়।
এখন কার্যত: দু’টো বিশ্বযুদ্ধ চলছে। একসাথে দু’টো বিশ্বযুদ্ধ অতি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। একটি যুদ্ধ প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষ শুরু করেছে, অন্যটি মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধে পক্ষ বিপক্ষকে আলাদা করে চেনা যায়। কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে চেনা যায় না, ধরা যায় না- ধরা সহজ কাজ নয়। কারণ, প্রৃকতি দ্রুত তার রং বদলায়। আর প্রকৃতি অতি সহজে মানুষকে ক্ষমা করে না। প্রকৃতির ক্ষমা প্রকৃতির আপন গতির মধ্যে হতে থাকে। তাতে মানুষ বেঁচে থাকুক আর নাই থাকুক প্রকৃতির কিছু যায় আসে না। সেটাই আসল ভয়।
প্রকৃতি তার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য চরমভাবে খেয়ালী আচরণ করে থাকে। মানুষ সেটা জানে। যুগে যুগে মানুষ প্রকৃতির কছে ঠেকে গিয়ে সেটা শিখে ভালভাবে রপ্ত করে বই-পুস্তকে লিখে রেখেছে। তবুও মানুষ বার বার ভুল করে। ভুলে যায় ও চরম খেসারত দিতে বাধ্য হয়। এটা হচ্ছে মানুষের জেনে শুনে প্রকৃতির সীমা লঙ্ঘন করা। মানুষ প্রকৃতির সীমা লঙ্ঘণ করার পাশাপাশি নিজেদের তৈরী আইন-কানুন, বিধি-ব্যবস্থা ইত্যাদিও লঙ্ঘণ করে মানুষের অধিকার ক্ষুন্ন করে। মানুষ মানুষকে গুম করে, হত্যা করে, সম্পদ হরণ করে, ইজ্জত লুন্ঠণ করে, তাড়িয়ে দেয়। নির্যাতিত, প্রতারিত, বঞ্চিত অসহায় মানুষ ভয় পেয়ে সবকিছুর আশা ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমায়। সেটাও বড় ভয়। এই ভয় এখন সারা পৃথিবীতে দুর্বলদের ওপর সবলদের চাপিয়ে দেয়া ভয়।
সভ্যতার ধ্বজাধারী এক শ্রেণির সবল মানুষ বিভিন্নভাবে দুর্বল, সহজ সরল মানুষের কন্ঠরোধ করে। তারা শুধু নিজেরাই বাঁচতে চায়। বিপদের সময় অসহায়, দুর্বল ও পীড়িতদের ক্ষুধার অন্নটুকুও কৌশলে চুরি করে অথবা লুন্ঠন করে নেয়। করোনা ক্রান্তিকালে দায়িত্ববান মানুষের মধ্যে ভূখা-নাঙ্গা মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী আত্মসাৎ করাা এই ধরনের অপতৎপরতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। তাহলে কি বিপর্যস্ত মানুষের বেঁচে থাকার উপায় নেই? এটাও এই মুহুর্তের বড় ভয়।
কিছু মানুষ অবিরত পাপ করে, আবার পূণ্য করার জন্য মনগড়া তত্ত্ব হাজির করে। পাপ ও পুণ্য একই সংগে চালিয়ে তারা প্লাস-মাইনাস তত্ত্ব দিয়ে নিজেদের মনকে প্রবোধ দেয়। এটা খুবই খারাপ। কেউ আবার ওজু করার সময় একহাতে ঘুষ নিয়ে ঐ হাতটা আবার ধৌত করে নেন এই ভেবে যে, তাতে তার নষ্ট ওজু আবার তাজা হয়ে যাবে। আমাদের সমাজে এই ধরনের মানসিকতা সম্পন্ন মানুষেরা বড় বেশী ভয়ংকর।
বর্তমান যুগে মানুষের মধ্যে প্রবণতা এমন হয়েছে- পাপ-পুণ্য, মন্দ-ভাল, সত্য-মিথ্যা একসংগে গুলিয়ে একাকার করে জীবন যাপন করতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। তাইতো আমাদের চারদিকে এত মসজিদ, এত মন্দির, এত গীর্জা কিন্তু মানুষের মধ্যে অন্যায় ও দুর্নীতি করার প্রবণতা বন্ধ হয় না। আমরা খারাপ কাজের বিরুদ্ধে কেন হেদায়েত প্রাপ্ত হচ্ছি না কেন? এই বিষয়টির উপলদ্ধি না হওয়াটাও বড় ভয়ের ব্যাপার।
মানুষের নৈতিক ও চারিত্রিক অধ:পতন এখন বড় ভয়। শিক্ষা-সংস্কৃতির মান ধ্বংস হয়ে গেছে। একদিকে ছ্রাত্রদের পরীক্ষায় নকল অন্যদিকে শিক্ষকদের পিএইচডি থিসিস নকল, তাই ডিগ্রীও ভূূয়া। মদ্যপান, জুয়া, ধর্ষণ, গুম, খুন নীলছবি, সমকাম, পশুমৈথুন, উলঙ্গ দেহে উল্কি এঁকে হাইড পার্কে ঘুড়ে বেড়ানো-ইত্যাদিকে পাপ মনে করে না বিত্তশালী মানুষ। পাপ কাজকে আধুনিকতা ভেবে সাধারণ বিনোদন মনে করে অনেকে। এভাবে তারা সীমালঙ্ঘন করে চলেছে প্রতিনিয়ত। আর ক্রমাগত সীমালঙ্ঘণকারীদের জন্য গজবের মৃত্যু অপেক্ষা করে-সেভাবে ভাবলেও বিবেকবান মানুষকে ‘বোকা, খ্যাত’ বলে গালি দেয় একশ্রেণির জ্ঞানপাপী। যেমন অবস্থা সূচিত হয়েছিল নবী হানযালার সময়। তাঁর সময় আরবের অবিশ্বাসী ও ব্যাভিচারী বাদশা তাইফুর ও তার বার শত রক্ষীর একসংগে  প্রাণ হরণ করেছিল মৃত্যুদূত। অথবা কারণটি ঘটেছিল পম্পেই শহর ধ্বংসের পিছনে। করোনার সর্বগ্রাসী আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় তেমনি কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে ঘটতে পারে- সেটাও একটা রড় ভয়।
সত্য তথ্যে সুরক্ষা আসে। মিথ্যে সবসময় রসাতলে নিয়ে যায়। একথা সর্বজন বিদিত। কিন্তু এত জেনেও চশমখোর কিছু মানুষ জ্ঞানপাপী হতে বেশী পছন্দ করে। পৃথিবীর বহু ধনী দেশে মিথ্যের কপটতা যেন কাটতেই চায় না। জেনেশুনে সত্য গোপন করা ও মিথ্যে দিয়ে সত্যকে আড়াল করার ফলে মানবতা চোখ বুঁজে মাটিতে মিশে যাচ্ছে অথবা ছাই হয়ে বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। তারপরও কারো কারো বোধদয় হয়না, বহু কুম্ভকর্ণের সুখনিদ্রা ভাঙ্গে না।
করোনা ভীতি মানুষের নিজেদের স্বরূপ উন্মোচন করে দিয়েছে। সহকর্মী বন্ধুরা জ্বরে আক্রান্ত মানুষকে ভয়ে রাতের বেলা ট্রাক থেকে রাস্তার পাশে নির্দয়ভাবে ফেলে রেখে গেছে। ছেলে তার মাকে, জামাই তার শাশুড়ীকে করোনা আক্রান্ত হয়েছে এই ভয়ে পাষাণের মত গাজীপুরের বনে ফেলে রেখে চলে এসেছে। এগুলো কীসের আলামত? মৃত্যুভয়ে মানুষের মনুষ্যত্ব কি তবে হারিয়ে গেল?
এর চেয়ে বড় খারাপ বিষয় হলো- ইতোপূর্বে কোন রোগে চিকিৎসকগণ রোগীর কাছে গেলে আক্রান্ত হবার ভয় খুব বেশী ছিল না। কিন্তু করোনা রোগীর সংস্পর্শে এসে চিকিৎসকগণও আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। কে করোনা আক্রান্ত আর কে আক্রান্ত নয- তা রোগীর লক্ষণ দেখে বুঝার উপায়ও এখন নেই! ডাক্তাররা আক্রান্ত হয়ে আইসোলেসনে গেলে অথবা মরে গেলে রোগীদেরকে কে চিকিৎসা দেবে? অর্থাৎ, দামী হাসপাতাল, নামকরা ডাক্তার, কারো কিছুই নেই করার। সবাই এপর্যায়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়- সেটাই আজকের আতঙ্ক, এই কঠিন বাস্তবতায় বড় ভয়।
আমাদের মাঝে ধেয়ে আসা অতিমহামারী করোনা, জেঁকে বসা অসুস্থতা, দু:খ-কষ্ট, ঘরে বন্দী থাকার যাতনা এসব কিছু আমাদের ভুল, অন্যায়, অবহেলা ও মন্দ কৃতকর্মের কারণে ভোগ করছি তা উপলব্ধিতে আনা জরুরী হয়ে পড়েছে। এখন সারা পৃথিবীর ন্যায় বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণের হার হু হু করে বেড়ে চলেছে। সাথে মৃত্যুহারও খুব বেশী ভাবিয়ে তুলেছে। আগামী মে মাসের মধ্যে আমাদের দেশে লক্ষাাধিক মানুষ সংক্রমিত হবে ও হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে বলে সরকারীভাবে আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে।
সংক্রমণ শেষ হয়ে গেলে আগামীর দুর্বল পৃথিবীটা কেমন হবে? কেমন হবে সেই মানুষগুলোর চরিত্র, চলাফেরা ও আচরণ? করোনায় বিশ^ায়নের ধারনা চুপসে গেছে, ব্যবসা নেই। ধরুন, সবার জমানো টাকা শেষ, হাত খালি। কেউ প্রয়োজনে ধার কর্জ দেবে তো?  অর্থনৈতিক মন্দা, অভাব, ক্ষুধা, গণদারিদ্র, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য তখন সন্দেহের দোলাচালে মানুষে মানুষে হিংসা, স্বার্থপরতা ইত্যাদিকে কতটুকু উস্কে দিয়ে মানবতাকে ভুলুন্ঠিত করবে তার অনাগত ভয় তো আছেই। তখন মানুষ মানুষের ভয়ে নির্ভয়ে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারবে তো? যেমন শুরু হয়ে গেছে এল সালভাদরে, সেখানে করোনা সংকটের মধ্যেই ৫৭ জন মানুষ খুন হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনিসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিপোলিশ শহরে পুলিশি নির্যাতনে জর্জ ফ্লয়েডের নির্মম মৃত্যুর পর জার্জিয়া সহ বিভিন্ন রাজ্যে কারফিউ জারী করা হয়েছে। এ নিয়ে পোটা মার্কিন মুল্লকে রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্যপ্ত হয়ে উঠেছে।
এই মুহুর্তে আমরা তাকিয়ে দেখছি- করোনার প্রতিষেধক তৈরী করে মৃত্যু ঠেকানো ও সুস্থ্য মানুষগুলোকে আক্রান্তের হাত থেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা দেশ দেশে। সাথে লক্ষ্য করছি, ইউরোপ-আমেরিকার ধনী দেশগুলোতে সম্পদের প্রাচুর্য্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ সেগুলো ভোগ করার সময় ও ফুরসৎ পাচ্ছে না। তার আগেই করোনার ভয়াল আক্রমণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। আরো বলা হচ্ছে, জুন মাসে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাকি প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার মানুষ করোনায় মারা যাবে। যারা মারা যাচ্ছেন তাদের নিজ নিজ ধর্মমতে সৎকারেও আপনজন বা উপযুক্ত কেউই হাজির হবার সুযোগ পাচ্ছে না। সেখানে মৃতদের জানাজা বা কবর দেবার কেউ নেই- এটা দুনিয়াতেই বড় মুছিবত, বড় ভয়।
ক’দিন ধরে আমাদের দেশে করোনার সমষ্টি সংক্রমণের উচ্চহার শুরু হয়েছে। সধারণ মানুষের মানুষের সাথে ডাক্তার, নার্স, নিরাপত্তাকর্মীরাও ব্যাপকহারে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁরা অনেক পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত ও কিছুটা ভীত বটে। সাধারণ জনগণকে নিরাপত্তা দেবার দায়িত্বে নিয়োজিতগণ নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সাধারণ কর্মজীবি মানুষের পকেট দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। হতাশা ও চরম বেকারত্বের হাতছানি শধু বাংলাদেশে নয়- সারা পৃথিবীকে দুর্বল ও পঙ্গু করতে যাচ্ছে। চতুর্মুখী ভয়ংকর দু:স্বপ্নে আড়ষ্ট বিশ্ববাসী আগামীর দুর্বল পৃথিবীটাকে কিভাবে আবার নতুন করে সাজাবেন-সেটাই ভাবনার বিষয়। এ মুহূর্তে করোনায় জর্জরিত অশান্ত বিশ্বকে দ্রুত সেরে ওঠার জন্য জীবানুবিজ্ঞানীদেরকে সার্বক্ষণিক তৎপর থাকাটা বেশী জরুরী।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top