logo
news image

দেশে পাটপণ্যের সুদিন ফেরাতে নানা রকমের উদ্যোগ

একসময় দেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় সোনালি আঁশ পাটের স্থান সবার শীর্ষে ছিল। পরবর্তী সময় বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে পাট রপ্তানির পরিমাণ কমে যায়; কিন্তু সম্প্রতি পাটপণ্যের সুদিন ফেরাতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা আরো বাড়ানো দরকার বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দরকার বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সুবিধা।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বিগত দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই সারা বিশ্বে তিন গুণ বেড়েছে। এর তুলনায় পাটজাত পণ্য উত্পাদন খুবই কম। তবুও এই পণ্যগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখছে। দুনিয়াব্যাপী পাটের ব্যাগের চাহিদা বৃদ্ধি ও আমাদের দেশের উন্নতমানের পাট এ দুই হাতিয়ার কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশেরও সফলতা আসতে পারে। পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এর আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই,বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম কালের কণ্ঠকে জানান, বঙ্গবন্ধু এ দেশের পাটকে সরকারিভাবে বিশ্ববাজারে পরিচিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর হাত ধরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পাট সেক্টরকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। পাট থেকে তৈরি পণ্য এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়, বাস্তব। এখন দেশে তৈরি পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। আশা করি এই তত্পরতা আগামী দিনে আরো বেড়েই যাবে।

প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা তৈরি : ২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সরকার পাট ও পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এ জন্য পাটের বহুমুখীকরণে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৬৩৬ জন উদ্যোক্তা তৈরি করেছে।

পাটপণ্য : জেডিপিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্যোক্তারা ২৩২ ধরনের পাটজাত পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করছে। যার মধ্যে রয়েছে ঢাকাই মসলিন, শাড়ি ও কাপড়, জুতা, স্যান্ডেল ইত্যাদি।সুলভ মূল্যে কাঁচামাল : পাটপণ্যের ব্যবহার ও এর বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের মাঝে সুলভ মূল্যে কাঁচামাল সরবরাহ করতে বর্তমান সরকার ঢাকা ও রংপুরে দুটি কাঁচামাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ছাড়া পাটপণ্যের সহজপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে জেডিপিসিতে প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম চলছে।সফলতা : জেডিপিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যারা সফল হয়েছে তাদের সংখ্যা ৬৩৬ জনের মতো। তাদেরই একজন নারী উদ্যোক্তা শামীম আরা দীপা। হাতের কাজের শৈল্পিক দক্ষতা আর মাত্র ১৫ হাজার টাকার মূলধন নিয়েই তাঁর স্বপ্নযাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। রাত-দিন খেটে তিনি গড়ে তুলেছেন তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘রাহেলা জুট ক্রাফট’।

তিনি পাটের ফ্যাব্রিকস ব্যবহার করে তৈরি করেন মেয়েদের ফ্যাশনেবল ব্যাগ, টিস্যু বক্স কভার, কুশন কভার, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, চটি স্যান্ডেলসহ নানা অত্যাধুনিক পণ্য। সঙ্গে বাড়তি সৌন্দর্য আনতে ব্যবহার করেন কটন, জরি, জামদানি, ব্লক, বাটিক এমনকি করেন হ্যান্ডপ্রিন্টও। পাটের ফ্যাব্রিকস দিয়ে যে তাক লাগানো সব পণ্য তৈরি করা যায়, সেটাই করে দেখিয়েছেন দীপা।

২০০৯ সালে ছোট পরিসরে তাঁর ব্যবসা শুরু হলেও ক্রমেই বাড়ছে দীপার কাজের পরিধি ও আয়। প্রাথমিক অবস্থায় একজন থাকলেও এখন হয়েছে শতাধিক বেতনভুক্ত কর্মী। এ ছাড়া প্রডাকশনে হাতের কাজ করে ৫০ জন। নিজ জেলা ঝিনাইদহে গড়েছেন কারখানা। দীপার কারখানায় কাজের জন্য আনা হয় এলাকার অসহায় দুস্থ নারীদের। এরপর দেওয়া হয় কাজের বিষয়ে প্রশিক্ষণ। যাতে তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে আমি চাই সমাজের অসহায় মেয়েদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে। তারা যেন সমাজে অবহেলার পাত্র হয়ে না থাকে। আমার দায়িত্ববোধ থেকেই এটা করি।’ কঠোর পরিশ্রম, মেধা আর একাগ্রতার মধ্য দিয়ে নিজের ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দীপা। তাই তো মাত্র ১৫ হাজার টাকার মূলধন বেড়ে আজ প্রায় অর্ধ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।পাট রপ্তানিকারকদের সংগঠন জুট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৫টি দেশের বাইরেও কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, সুদান, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় ১২০টি দেশে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। তাই পাটজাত শপিং ব্যাগ রপ্তানির ক্ষেত্রে এ দেশের ভালো সুযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলে ৭০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান পাটজাত পণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।দরকার সহজ শর্তে ঋণ : পাট ও পাটজাত পণ্য উত্পাদন করে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭৩.১০ কোটি ডলার আয় করে। এতে প্রবৃদ্ধির হার ১৩.৯৪%। প্রবৃদ্ধি প্রতিবছরই বাড়ছে। এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে সরকারকে আরো বেশি সচেতন হওয়া জরুরি। সরকার সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা প্রদান ও বাজারজাতকরণে নির্দিষ্ট একটি বাজার তৈরি করে এই শিল্পের প্রসার আরো বেশি ত্বরান্বিত করতে পারে। এতে পণ্যটি সারা বিশ্বেই বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top