logo
news image

ফসল কাটতে জমি সেনার আকাল

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
করোনার করাল গ্রাসে পৃথিবীর কলকারখানায় উৎপাদন ব্যবস্থা থমকে গেছে। কিন্তু প্রাকৃতিক সবকিছু বরাবরের মত সচল রয়েছে। প্রাণিরা নতুন প্রাণের জন্মদান করছে, মাটিতে গাছপালা বেড়ে উঠছে, পুকুর-নদী সমুদ্রে মাছ বেড়ে উঠছে, কৃষি জমিতে ফসল উৎপন্ন হয়ে পেকে যাচ্ছে। পৃথিবীতে মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে খাদ্যের জন্য কৃষিজাত দ্রব্যের উপর নির্ভর করতে হয়। কৃষির প্রধান উৎস মাটি বা আবাদী জমি।
এই কৃষি জমির উৎস বলতে বুঝায় সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি তথা গ্রাম। যেখানে দিগন্ত বিস্তৃত ফাঁকা মাঠ, আলো-বাতাস খেলা করে, পাহাড়, নদীর আঁকাবাঁকা কোলে সহজ-সরল কৃষকগণ সবুজের সমারোহ সৃষ্টি করে। সবুজ মাঠগুলো কিছুদিন পর সোনালী শস্যদানা উপহার দেয়। কৃষকের কন্ঠে আনন্দে গান ভেসে উঠে। কৃষাণীরা কুলায় শস্যদানা ভরে বাতাসে উড়িয়ে পরিস্কার করে গোলা ভরিয়ে তোলে। কৃষাণ-কিষাণীরা হলো জমি সেনা।
করোনা ভাইরাসের আক্রমণের ভয়ে সারা দুনিয়ার কৃষাণ-কিষাণীরাও গৃহবন্দী জীবন-যাপনে চলে যাওয়ায কৃষিকাজে চরম সংকট শরু হয়েছে। বাংলাদেশে কৃষিশ্রমিকরা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কাজ করতে যান। মাস দু’য়েক পূর্বে তারা যেসব জেলায় গিয়ে ফসল চ্ষাবাদ শুরু করেছিল সেখানে করোনা প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় প্রাণের ভয়ে নিজ জেলায় ফিরে গেছে। এদিকে ঐসব এলাকায় ফসল পেকে গেলে উঠতি ফসল কেটে ঘরে তোলার অভাবে চরম দুরাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে হাওড়াঞ্চলে বৃষ্টি হলেই মাঠের পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাবার সমুহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এছাড়া সীমান্তের ওপারের পাহাড়ি ঢলে হাওড়ের ধান নষ্ট হয়ে গেলে দেশে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়- বর্তমানে পৃথিবীর দেশে দেশে কৃষি শ্রমিকদের আকাল শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ জীবনের ভয়ে গৃহবন্দী থাকায় বেশী টাকা দিয়েও কৃষিশ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
করোনাক্রান্তি কালে যুক্তরাজ্যে ঘরবন্দী মানুষ ফসল কাটার জন্য মাঠে যাচ্ছেন না। এখনও সারা দেশে লকডাউন চলছে। হঠাৎ সেখানে ফসল কাটার লোকের ব্যাপক ঘাটতি শুরু হয়েছে। এ্যাংলিয়ারে ৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল কাটার উপযুক্ত হয়েছে। এজন্য জরুরী কৃষি মজুর দরকার। তাই বৃটিশ সরকার ফসল কাটার জন্য রোমানিয়া থেকে বিমানে করে কৃষক আমদানী করার ঘোষণা দিয়েছে। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে। তাই যুক্তরাজ্য কৃষকদের উপাধি দিয়েছে জমি সেনা হিসেবে।
এদিকে জার্মানী ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বর্ডার খুলে দিয়েছে যাতে কৃষি শ্রমিকগণ সহজে তাদের দেশে আসতে পারে। করোনা মন্দা শুরু হয়ে গেলে আবাদী ফসল নষ্ট করা যাবে না।  এদের চল্লিশ হাজার কৃষক প্রয়োজন বলে সংবাদে এসেছে।
করোনা মন্দায় কৃষির ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ বিলিয়ন ডলার নগদ সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে। এ দিয়ে গম, দুধ ও মাংস উৎপাদকগণকে ভর্তুকি দেয়া হবে। ভারতে কৃষকদেরকে বছরে ৬ হাজার টাকা প্রণোদনা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে বোরো ধান ঘরে তোলার জন্য কালবৈশাখী ঝড়-বৃষ্টি শুরু হবার আগে সতর্কতা অবলম্বন করে হাওড় ও বিল অঞ্চলের ধান, গম, আল ইত্যাদি দ্রুত তুলে সংরক্ষণ করার জন্য জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। প্রতিবছর আমাদের দেশের এক জেলার শ্রমিকগণ বেশী মজুরী পাবার আশায় অন্য ঝেলায় কৃশিকাজ করতে যায়। এবার তা হবে না। শ্রমিকদের কেউ অন্য জেলায় কাজ করতে গেলেও করোনা সংকটে প্রাণভয়ে নিজ নিজ এলাকায় চলে গেছেন। সেজন্য এবার কৃষিশ্রমিক সংকটে অনেক এলাকার উঠতি ফসল ঘরে তোলা সম্ভব নাও হতে পারে।
খরিফ ফসল ঠিকমত ঘরে তুলতে না পারলে খাদ্যসংকট দেখা দেবে। এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে খাদ্যদ্রব্যের সংকট ও উচ্চমূল্যের ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে বলে বিভিন্ন মহল থেকে আভাস দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে কৃষিতে ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়ার কথা ঘোষিত হয়েছে। এছাড়া লকডাউন এড়িয়ে কৃষিকাজের জন্য কৃষকদেরকে জমিতে যাবার পাশ দেয়া হচ্ছে। এজন্য শধু জমিতে যাবার পাশ নয় বরং কৃষি সেনাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সতর্কতার সাথে আমলে নিতে হবে। ভিন জেলার কৃষি শ্রমিকদেরকে ফিরিয়ে এনে কৃষি জমির আশেপাশের খোলা জায়গায় স্বাস্থ্যসম্মত আলাদা ছোট ছোট তাঁবু টাঙিয়ে সেখানে টয়লেট, সাবান, ওষুধ ও ভিটামিন সি যুক্ত খাবার সরবরাহ করতে হবে। ওদের স্বাস্থ্যবীমা না হোক আপাতত: বিশেষ স্বাস্থ্যভাতার ব্যবস্থা করা উচিত। তা না হলে ওরা খুব সহজেই আক্রান্ত হতে পারে। যেটা সবার জন্য বিপজ্জনক এবং তা দেশের খাদ্য সংকট সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশে আমরা তো আর বৃটেন-জার্মাানীর মত বিদেশ থেকে কৃষি শ্রমিক আমদানী করতে পারবো না। আমাদের নিজেদেরকেই এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। ছুটিতে থাকা কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা অনেকে এ্ই সময়ে গ্রামে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে। তারা যথোপযুক্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরিধান করে নিজের ও প্রতিবেশীদের জমিতে কৃষিকাজে সহায়তা করতে এগিয়ে আসতে পারে। এত একদিকে তাদের সময় কাটবে অন্যদিকে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য অটুট থাকবে।
করোনার ভয়াল থাবায় নগর সভ্যতার বৃহৎ শহরগুলো আজ ভুতুড়ে রূপ ধারণ করেছে। নিউইয়র্ক, লন্ডন, মাদ্রিদ, রোম, প্যারিস আজ বিপর্যস্ত হয়ে ফাঁকা। মানবশূণ্য রাস্ত্ঘাট, কল-কারখানা ওদের কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় সব শহরের রাস্তা-ঘাট, অফিস, কারখানাও ফাঁকা, শুনশান নীরব। মানুষ বাইরে বেরুতে না পারলেও দু’বেলা খাবারের আয়োজন তো করতেই হবে। এই খাবারের আঞ্জাম দিতে পারে জমি। আর জমি চাষাবাদের জন্য কৃষক বা জমি সেনানীদেরকে মাঠে নামতেই হবে। যে কোন মূল্যে জমি সেনাদেরকে মাঠে নামার জন্য যথোপযুক্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম দিতে হবে। মানুষকে এই অতিমহামারীর করাল গ্রাসের ফলে সৃষ্ট আশু অর্থনৈতিক মন্দা ও কালো দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার হাত থেকে রেহাই পেতে হলে জমি সেনাকে অনাহারী রাখা চলবে না ও মাটি সোনাকে মোটেও অনাবাদী রাখা চলবে না।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top