logo
news image

ওপারে ভালো থাকবেন ডাক্তার মঈন উদ্দিন

জিয়াউল ইসলাম।।
আজকের ভোর অন্য আট-দশটা ভোরের মতোই রৌদ্রজ্জ্বল ছিল। আকাশে মেঘের আভা ছিল না। ছিল না ঝড়, ঝাপসা, তুফান, ঘূর্নিঝড় বা কাল বৈশাখী। এমন সুন্দর একটা ভোরে এত অপ্রিয় হৃদয়বিদারক একটা খবর শুনতে হবে ভাবতে পারিনি। করোনায় আক্রান্ত সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন ইন্তেকাল করেছেন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
সিলেটের খ্যাতনামা এই চিকিৎসকের মৃত্যুতে প্রকৃতিও বোধ হয় অভিমান করেছে। না হয় রৌদ্রজ্জ্বল সকাল দুপুরে প্রবেশ করে এমন অন্ধকার ঝড়ে রুপ নিবে কেন? আকাশের বা প্রকৃতির অবস্থা যাই হোক, সিলেটের মানুষের মন আজ ভালো নেই। মানব দরদী, পরোপকারী এই চিকিৎসকের প্রয়ানে শোকের মাতম বইছে সিলেটসহ তার জন্মস্থান সুনামগঞ্জের ছাতকে। বিলাপ করছেন হাজার হাজার হত দরিদ্র মানুষ। তার শান্তির জন্য মাগফিরাত কামনা করছেন।
ডা. মঈন উদ্দিনকে ঘিরে ব্যক্তিগতভাবে আমারও কিছু স্মৃতি রয়েছে, যা স্মরণ করে বারবার তীব্র মনো যন্ত্রণা অনুভব করছি।
তখন ২০১০ সাল। আমি উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। রাত ১টার দিকে বাবার বুকে প্রচল্ড ব্যথা অনুভূত হয়। গভীর রাতে কোনো রকমে বাবাকে নিয়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ভোরে খবর পেয়ে আমি হাসপাতালে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি, আব্বু কার্ডিওলজি ওয়ার্ডের ফ্লোরে শুয়ে আছেন। গভীর রাতে আসার পর ইমার্জেন্সিতে কয়েকটি বড়ি খাইয়ে ঘুমিয়ে রাখা হয়েছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছেন। আমি ছোট মানুষ, তার ওপর সরকারি  হাসপাতাল।  কথা বললে কেউ পাত্তা দেয় না। ‘মৃতপ্রায়' বাবাকে দেখে নিজেকে এত অসহায় আর কখনো লাগেনি। আব্বুর শারীরিক অবস্থা এমন যে, বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের চিন্তা করাটাও কঠিন। দুপুর আনুমানিক ১২টার পর বাবার নাম ধরে ডাক পড়ল ওয়ার্ডে। কয়েকজন ডাক্তার এসে দেখে গেলেন। বললেন, ‘রোগির অবস্থা ভালো। মঈন স্যারকে বলবেন, আমরা এসেছিলাম।’
আমি ধরে নিলাম, মঈন স্যার বলতে আমাদের এলাকার ডা. মঈন উদ্দিন-ই হবেন। চিন্তায়ও পড়লাম যে, আব্বুর অসুস্থতার খবর উনি পেলেন কী করে? খবর পেলেও উনিই বা কেন লোক পাঠাবেন আব্বুকে দেখার জন্য! কিচ্ছুক্ষণের মধ্যে তিনি আসলেন। ফাইল দেখলেন, খবর নিলেন। বললেন, ‘চেরাগ আলী (ওসমানী মেডিকেলের অ্যাম্বুল্যান্স চালক, আমাদের এলাকার) গুরুতর অসুস্থ। হাতে কিছু কাজ থাকায় আগে আসতে পারিনি। চিন্তার কিছু নেই, দ্রুত ভালো হয়ে যাবেন।'’
আমাকে উনার ফোন নম্বর দিয়ে বললেন, কোনো সমস্যা হলে ফোন দিতে। আমার নম্বরও উনি  ফোনে সেভ করলেন। এরপর রোজ আসতেন খোঁজ নিতেন। স্বাভাবিকভাবেই কার্ডিওলজি ওয়ার্ডে আমার বাবার গুরুত্ব বেড়ে গেল। সুস্থ হলেন দ্রুত। সেদিন থেকেই মনের গহীনে গভীর শ্রদ্ধাবোধ জমা হয়েছিল লোকটার জন্য।
এরপরে ব্যক্তিগত চেম্বারে যতবার গেছি, কখনো ফি নেননি। সবসময় বলতেন, ‘পরে দিয়েন, দেওয়ার তো সময় আছে।'’ ফি দেওয়ার সময় তিনি আর দিলেন না। অথচ আমার পরিবারের পক্ষে অন্তত এই ফি দেওয়ার সামর্থ্য আছে, তা তিনি ভালো করেই জানতেন।
এ গল্পটি আমার নিজের। উনাকে ঘিরে এমন হাজারো গল্প ছড়িয়ে আছে শত-সহস্র মানুষের মনে।
গত ৫ এপ্রিল করোনা শনাক্তের পর এলাকার লোকজনের আর্তনাদ দেখে কে? সবার মনে পাহাড়সম কৃতজ্ঞতাবোধ আর অস্থিরতা। কবে সুস্থ হবেন মঈন উদ্দিন। কোথায় আছেন, কেমন আছেন, স্ত্রী সন্তানের অবস্থা কী? এসব নিয়ে নানা কৌতূহল লোকজনের মধ্যে। সবার শেষ কথা একটি-ই, ‘আল্লাহ আমরার মঈন উদ্দিনরে ভালাভাবে আমরার মাঝে ফিরাইয়া দেও।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বলে মানুষের ধারণা আমার কাছে উনার খোঁজ-খবর পাওয়া যাবে। তাই প্রতিদিনই কিছু মানুষকে উনার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানাতে হয়েছে।
কয়েকদিন আগে এক বৃদ্ধা এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমরার মঈন উদ্দিনের বুলে ওউ (করোনা) রোগ অইগিছে?' আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘ভিজিট না দিয়া কতবার দেখাইছি হিসাব নাই। টেকা (টাকা) না নিয়াও আধা ঘণ্টা ধরি রোগী দেখত। ভালা করি চেক করত। আমি রোজা রাখছি, আল্লাহয় মাফ করউক্কা।’'
এমন অসংখ্য বৃদ্ধা আর্তনাদ করেছেন তার সুস্থতার জন্য। কিন্তু তিনি এসব মানুষের আর্তনাদে সাড়া দেননি, সাড়া দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার ডাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই চিকিৎসকদের নানা কার্যকলাপের জন্য সমালোচনা করেন। মাঝেমধ্যে কিছু যৌক্তিক ইস্যুতে আমারও ইচ্ছে হয়েছিল দুই-এক কলম লিখি। কিন্তু পারিনি। কেন জানেন? শুধু একজন ডা. মঈন উদ্দিনকে চিনি বলে। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তাই তার ব্যাপারে বলতেও আমার দ্বিধা নেই।  
তিনি রোজ মেডিকেল ও ব্যক্তিগত চেম্বারে ব্যস্ত সময় পার করতেন। অন্য চিকিৎসকরা ছুটির দিনে পরিবারের সাথে সময় কাটান। কিন্তু তিনি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। প্রতি শুক্রবার সস্ত্রীক নিজ জন্মস্থান ছাতকের নাদামপুর গ্রামে আসতেন অসহায়, দরিদ্র মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য। গ্রামের বাড়ীতে নিজের ঘরেই তিনি ও তাঁর স্ত্রী মানুষকে এ সেবা দিয়ে গেছেন বছরের পর বছর। শুধুই কি বিনামূল্যে রোগী দেখা? রোগ অনুযায়ী সবাইকে ফ্রি ওষুধ দিতেন। নিজের সংগ্রহে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকলে নগদ টাকা দিতেন ওষুধ কেনার জন্য। এমনকি যেসব রোগীর ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার প্রয়োজন হতো তাদের সিলেট শহরে যাতায়াতের ভাড়াসহ যাবতীয় খরচ দিয়ে দিতেন। তার উদ্দেশ্য ছিল এলাকার একটি লোকও যাতে চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়। কত মানুষের অস্ত্রোপচারের খরচ তিনি বহন করেছেন, তার কোনো হিসেব নেই। গরিব মানুষের পাশে তিনি আজীবন দাঁড়িয়েছেন।
ধর্ম, বর্ণ বা রাজনীতি যত বিভেদই বলেন তিনি সবাইকে নিয়ে এক কাতারে এসে দাঁড়াতেন। তিনি এসবের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে একজন মানবতাবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তাই তো তার মৃত্যুতে আওয়ামিলীগ-বিএনপি, ডান-বাম বলে কোনো বিভেদ নেই। কারণ সবাই মানুষ মঈন উদ্দিনে আকৃষ্ট। তিনি আগে একজন মানুষ হয়েছেন, তারপরে ডাক্তার হয়েছেন।
তিনি চলে গেছেন ঠিক, চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের অপরাধী বানিয়ে চলে গেলেন।
এফসিপিএস, এমডি ডিগ্রিধারী একজন মেধাবী ডাক্তার নিজ কর্মস্থলে আইসিইউ পেলেন না, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পেলেন না। এমনকি এই রাষ্ট্র তাকে একটা আইসিইউ অ্যাম্বুল্যান্স যোগাড় করে দেয়নি। রাষ্ট্র তার শেষ ইচ্ছাটার প্রতি ন্যূনতম গুরুত্ব পর্যন্ত দেয়নি। রাষ্ট্রের এমন আচরণে আমরা শঙ্কিত এই ভেবে যে, ভবিষ্যতে এই দেশে মঈন উদ্দিনরা আর জন্মাবে না। যে দেশে মঈন উদ্দিনদের ন্যূনতম  মূল্যায়ন করা হয় না, সেই দেশে মেধাবীরা চিকিৎসক হতে যাবে কেন? যে পেশায় গেলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়, মঈন উদ্দিনরা চাইলে কি সেই পেশায় যেতে পারতেন না? প্রশ্ন রইল জাতির কাছে।
করোনার এই সংকটকালীন সময়ে দেশবাসী ডা. মঈন উদ্দিনের অভাব অনুভব করবে। দেশের আপামর চিকিৎসকদের জন্য তিনি রোল মডেল হয়ে থাকবেন। ডা. মঈন উদ্দিন হবেন এক আদর্শ ও অনুপ্রেরণার নাম। ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় ডাক্তার মঈন উদ্দিন।
* জিয়াউল ইসলাম : সাবেক সভাপতি, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব, সিলেট।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top