logo
news image

লালপুরের ময়না প্রতিরোধযুদ্ধ

হাফিজ আহমেদ।।
[সংক্ষিপ্তসার:১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা এবং সামরিক শাসক জনগণের নির্বাচিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর অস্বীকার করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য পাকিস্তানি শাসক কর্তৃপক্ষের উপর চাপ অব্যাহত রাখেন। ফলস্বরূপ, পূর্ব পাকিস্তানি জনগণের দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীকে সে বিষয়টি বলেছিলেন। ইতোমধ্যে শেখ মুজিব ও রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এই অশান্ত পরিস্থিতি সমাধানে একটি সংলাপ শুরু করেছিলেন। তবে পাকিস্তানী শাসক শ্রেণীর উদ্দেশ্য অসুস্থ ছিল, একদিকে তারা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল, অন্যদিকে তারা গোপনে সামরিক বাহিনীর সংখ্যা বাড়িয়েছিল। এটি প্রমাণিত হয়েছিল যে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া খান কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়াই ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাঙালিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল এবং ছাত্র, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মী এবং দেশের জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল দেশজুড়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। এক্ষেত্রে নাটোর জেলার লালপুর থানার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। একই সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচুর প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৩০ শে মার্চ ময়না প্রতিরোধ ঘটনা ঘটেছিল ঝড় তাই এই নিবন্ধে আমি নাটোর জেলার লালপুর থানায় প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাস অনুসন্ধান করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি; স্পষ্টতই পাল্টা আক্রমণ যে ময়না গ্রামে সংঘটিত হয়েছিল যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত হবে।]
ভূমিকা: ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি যথাসময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা টালবাহনা শুরু করে। তারা গোপনে যুদ্ধ প্রস্তুতি ও গণহত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করে। এর পদক্ষেপ হিসেবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বাঙালি সেনাদেরকে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু ৭ মার্চের (১৯৭১ সাল) বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি গণমানুষের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে এবং হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের দিক-নির্দেশনা দেয়। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে (গাজিপুর) দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদেরকে নিরস্ত্র করার হীন ষড়যন্ত্রের খবর প্রকাশ পেলে বীর বাঙালি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ আন্দোলন (১) গড়ে তোলে। ২৫ মার্চ ১৯৭১ সাল কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর সৈন্যরা নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে আক্রমণ করার ফলে অখণ্ড পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। ইতিহাসে নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি দুর্জয় আক্রোশে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এক্ষেত্রে নাটোর মহকুমার লালপুর থানার অধিবাসিদেরও গৌরবজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত অসংখ্য প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্যে লালপুর থানার অন্তর্গত ময়না প্রতিরোধযুদ্ধ অন্যতম। এ প্রতিরোধযুদ্ধে বীর বাঙালি শুধুমাত্র দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার এবং অদম্য মনোবলের মাধ্যমে সুসংগঠিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি ইউনিটকে পরাজিত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। আলোচ্য প্রবন্ধে প্রতিরোধযুদ্ধটির গতি-প্রকৃতি ও ফলাফল তুলে ধরার প্রচেষ্টা রয়েছে।
স্থান পরিচিতি: আয়তনের দিক থেকে নাটোর জেলার তৃতীয় বৃহত্তম উপজেলা হলো লালপুর। ১৮৬৯ সালে লালপুরে থানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে বিলমাড়ীয়া থানাটি বিলুপ্ত হয়। (২) প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণের মাধ্যমে ১৯৮৩ সালে লালপুর থানা উপজেলায় উন্নীত হয়। এ উপজেলার আয়তন ৩২৭.৯২ বর্গ কিলো মিটার। উত্তরে বাগাতিপাড়া ও বড়াইগ্রাম উপজেলা। দক্ষিণে ঈশ্বরদী (পাবনা), ভেড়ামারা ও দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) উপজেলা। পূর্বে ঈশ্বরদী ও বড়াইগ্রাম (নাটোর) উপজেলা এবং পশ্চিমে বাঘা (রাজশাহী) উপজেলা। (৩) ১৯৬১ সালের আদমশুমারি অনুসারে লালপুরের জনসংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার ৩৮৩ জন৪ বর্তমানে লালপুরের জনসংখ্যা ২ লাখ ৪২ হাজার ৬৪৫ জন। লালপুর নামকরণ সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক দলিল না পাওয়া গেলেও জনশ্রুতি আছে যে, বহুদিন পূর্বে লালপুরে বাস করত লালশাহ বুখারী নামে এক পীর সাহেব। এই লালশাহ বুখারীর দ্বারা উপকৃত হয়নি এমন লোক লালপুরে নেই। যেহেতু এই অঞ্চলের ধনী-গরীব, হিন্দু-মুসলমান সকলেই বিপদে-আপদে পীর সাহেবের নিকট আসতেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতেন, তাই পীরের প্রতি তাদের ভক্তি-শ্রদ্ধার কমতি ছিল না। পীর সাহেবের পানিপড়া খেয়ে বহু মানুষ দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পাশাপাশি অনেক বন্ধ্যা মহিলারাও সন্তান সম্ভাবা হওয়ার কথা জনশ্রুতি পাওয়া যায়। সকলের শ্রদ্ধার পাত্র এই লালশাহ বুখারীর নামকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য এই এলাকার নাম দেওয়া হয়েছে লালপুর। (৫) বুধপাড়ার কাঁসা শিল্প ও কালী মন্দির (দেশের বৃহত্তম ৩৩ ফুট উচ্চতার শ্যাম্যা পূজার স্থান) এবং উষ্ণতম স্থানের জন্য লালপুর উপজেলা বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। (৬)
পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে লালপুর: ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন কালাকানুনের বিরুদ্ধে ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লালপুরের মানুষ সোচ্চার ছিল। পাকিস্তানি স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন জিল্লুর রহমান, (৭) ফজলুর রহমান (পটল), (৮) মমতাজ উদ্দিন, (৯) ড. শামসুদ্দিন মিয়া (ভূতপূর্ব চেয়ারম্যানÑমাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড রাজশাহী ও ঢাকা), আনছার উদ্দিন, মাহবুবুর রহমান সেন্টু (গোপালপুর), হামিদুল হক (পোড়াবাবু), স্বর্গীয় সুশীল কুমার পাল (সাধারণ সম্পাদকÑবাংলাদেশ সুগার মিলস শ্রমিক ফেডারেশন), (১০) হাজের উদ্দিন সরকার (সাবেক চেয়ারম্যানÑদুড়দুড়িয়া ইউনিয়ন), অ্যাডভোকেট বীরেন সরকার, ওমর ফারুক সরকার, ডা. খলিলুর রহমান, ডা. আবুল কাশেম, বাবু বলাইচন্দ্র সাহা, ফজলুর রহমান (প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান- লালপুর উপজেলা), আকিয়াব হোসেন, হুমায়ুন কবীর পান্না (সাবেক চেয়ারম্যান, লালপুর ইউনিয়ন), এবং আরও অনেক সচেতন ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তির পাশাপাশি কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও শোষণ বিরোধী জনমত গঠন ও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে লালপুরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমন্বয়কারী জনাব আকিয়াব হোসেন বলেন, লালপুর নাটোর মহকুমার রাজনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিলো। একারণে ১৯৬৫ সালে শহিদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামানের হাতে লালপুর মুক্তি সংঘ নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠত হয় এবং ক্লাবটি মুক্তিযুদ্ধকালীন অন্যতম সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে। (১১) অনিবার্য কারণেই স্বাধিকার আন্দোলনের সক্রিয় অনুভূতি লালপুরের গণমানুষের হৃদয়কেও গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাই তারা সহজেই মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে সংঘবদ্ধ হতে সক্ষম হয়।
মুক্তিযুদ্ধকালীন লালপুরের অবস্থা: ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় নাটোর ছিলো রাজশাহী জেলার একটি মহকুমা। বৃহত্তর রাজশাহী জেলার (নাটোর, নওগাঁ, নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী সদর মহকুমা নিয়ে রাজশাহী জেলা) জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে মোট আসন সংখ্যা ছিলো যথাক্রমে নয় ও ষোলো টি। (১২) নাটোরের ভাগে জাতীয় পরিষদের দুটি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদে চারটি আসন বরাদ্দ ছিলো। (১৩) সত্তরের নির্বাচনে এই ছয়টি আসনেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীগণ বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। জাতীয় পরিষদে নাটোর মহকুমা থেকে নির্বাচিত হন মোঃ নাজমুল হক সরকার (চারঘাট-লালপুর-বাগাতিপাড়া-বড়াইগ্রাম) ও ডা. শেখ মোবারক হোসেন (নাটোর-সিংড়া-গুরুদাসপুর থানা)। প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হন শঙ্করগোবিন্দ চৌধুরী (নাটোর সদর থানার অংশ ও বাগাতিপাড়া), আশরাফুল ইসলাম মিয়া (সিংড়া ও নাটোর সদর থানার অংশ) আব্দুস সালাম (বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর থানা) এবং মোঃ জুল্লুর রহমান (লালপুর ও চারঘাট থানার অংশ)। (১৪) জুল্লুর রহমান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কারণে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক কর্মসূচি অনেকটা তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হতো। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর পদবী ছিল শিবির প্রধান (১৫) এবং দায়িত্বস্থল ছিল শেখপাড়া,পশ্চিম দিনাজপুর। (১৬) ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ সরাসরি বেতার থেকে প্রচার করতে করতে হঠাৎ বন্ধ করে দিলে ক্ষোভে নাটোরবাসী তাৎক্ষণিকভাবে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করে। মিছিলে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। কারণ সেদিন বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণ (৭ মার্চ, ১৯৭১) ছিলো জাতির দিক নির্দেশনার আহবান, আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন এবং বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে সশস্ত্রযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হলে দেশবাসীর মনে শঙ্কা বেড়ে যায়। এই সংকটের মুহূর্তে ২৮ মার্চ লালপুর, বিলমাড়ীয়া, গোপালপুরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ (যেমন: জনাব জিল্লুর রহমান, ওমর ফারুক সরকার, ডা. খলিলুর রহমান, চেয়ারম্যান হাজির উদ্দিন সরকার, ডা. আবুল কাশেম, বাবু বলাইচন্দ্র সাহা, চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, আকিয়াব হোসেন, হুমায়ুন কবীর পান্না প্রমুখ) একত্রিত হয়ে জরুরী বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে প্রাক্তন সৈনিক ও আনসারদের সমন্বয়ে একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মসলেম দফাদার, হামিদুল হক (পোড়াবাবু), ওয়াহেদ, অজিত, রামচন্দ্র, আব্দুস সাত্তার লেড়ু, আদম আলী মালিথা, আকিয়াব হোসেন, ইছার উদ্দিন, আব্দুল বারী, দেলবার হোসেন, মাহবুবুর রহমান সেন্টু, হুমায়ুন কবীর পানা, ওমর ফারুক সরকার, হাজির উদ্দিন সরকার, এবং মমতাজ উদ্দীন (সাবেক এম.পি) ১৬ জনের এই বাহিনী কিছু দিনের মধ্যেই ৩০ জনে উনড়বীত হয়। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল ও সরদহ পিটিসি থেকে প্রাপ্ত কয়েকটি (থ্রি নট থ্রি) রাইফেল এবং কয়েকটা দেশি বন্দুক দিয়ে সজ্জিত করা হয় এই বাহিনীকে। (১৭) এসময় ড. হুরজুত আলী (অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) ইংল্যান্ড থেকে টাকা-পয়সা ও পরামর্শ দিয়ে এই প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সহায়তা প্রদান করেন। (১৮) প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠনের প্রথম দিনেই (২৮ মার্চ) নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের শ্রমিক নেতা স্বর্গীয় সুশীল কুমার পাল বুলডোজার চালক এ.কে.এম. শামসুদ্দিনকে সাথে নিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে ঈশ্বরদী এয়ারপোর্টের রানওয়ে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং রানওয়েটি নষ্ট করে বুলডোজারটি রানওয়ের উপর রেখে আসেন। এতে এয়ারপোর্টটি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগি হয়ে পড়ে। (১৯) এভাবেই লারপুরবাসী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায় ।
প্রতিরোধ যুদ্ধ: ২৫ মার্চ ১৯৭১ কালরাতে দেশব্যাপি গণহত্যার নীলনকশার অংশ হিসেবে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট রাজশাহী শহরে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। রাজশাহীতে অবস্থানরত লালপুরের আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট বীরেন সরকার, শিল্প ব্যাংকের ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান এবং জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত সদস্য মোঃ নাজমুল হক সরকারসহ (চারঘাট-লালপুর-বাগাতিপাড়া-বড়াইগ্রাম) অনেকে শহীদ হন এই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। (২০) একই সময়ে নাটোরের পার্শ্ববর্তী জেলা পাবনায়ও খানসেনারা গণহত্যা শুরু করে। তাদের এই হত্যাযজ্ঞ মুক্তিকামী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। ২৭ মার্চ পাবনায় মুক্তিবাহিনী ও জনতার প্রতিরোধে ৮০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ১৮ জন আহত হয়। (২১) পাবনার সশস্ত্র গণবিদ্রোহ এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চরম দুরাবস্থার খবর ওয়ারলেসে পৌছে যায় রাজশাহীতে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফকাত এবং ডেপুটি কমান্ডিং অফিসার মেজর রাজা আসলামের কাছে। ২৮ মার্চ সকালে মেজর রাজা আসলামকে দায়িত্ব দিয়ে পাবনায় পাঠানো হয়। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পাবনায় আক্রান্ত অবশিষ্ট সৈন্যদের উদ্ধার করে রাজশাহীতে নিয়ে আসার জন্য। এরপর অবস্থা বেগতিক দেখে মেজর রাজা আসলাম ২৯ মার্চ ৩০-৪০ জন সেনা নিয়ে রাজশাহীর দিকে রওনা দেন। (২২) কিন্তু নাটোরে ছাত্র-জনতার রাস্তা প্রতিরোধের সংবাদ পেয়ে তারা ঈশ্বরদী অভিমুখে যাত্রা করেন এবং দাশুরিয়াতে এলে জনতার চরম বাধার সম্মুখীন হয়ে তারা উত্তর দিকে গ্রামের রাস্তায় প্রবেশ করে এবং গোয়াল বাথান হয়ে মুলাডুলি গোডাউনের পূর্ব পার্শ্ব দিয়ে পুনরায় রাজশাহী মহসড়কে ওঠে। তাদের আগমনের বার্তা পেয়ে আগেই বীর বাঙালি অসংখ্য গাছ কেটে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। নিরুপায় হয়ে খানসেনারা পাকা সড়কের পশ্চিমে পুনরায় কাঁচা রাস্তায় প্রবেশ করে এবং লালপুরের মাঝগ্রাম রেলগেট (ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ) পার হয়ে টিটিয়া, সুন্দরবাড়ীয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে চাঁদপুর (কদমছিলান ইউনিয়ন) পৌঁছায়। সেখান থেকে আনুমানিক ভোর ৫ টা ৩০ মিনিটের সময় লালপুরগামী মনির উদ্দিন আকন্দ রোড হয়ে গোপালপুরের দিকে রওনা করে। হানাদারদের গোপালপুর পৌছার পূর্বেই জনতা তাদের আগমনের বার্তা পেয়ে রেল লাইনে ওয়াগন দ্বারা ব্যারিকেড দেয়। বহু সংখ্যক লোকের সমাগম ঘটে গোপালপুর রেল গেটের সামনে। গড়ে উঠলো প্রতিরোধ বাহিনী। এই প্রতিরোধের মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন- অব্দুল গফ্ফার খান, আখতার মিয়া, আমজাদ হোসেন নান্নু, মসলেম উদ্দিন (আনসার কমাণ্ডার) প্রমুখ। সুগার মিলের ১৭ জন আনসার এই প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দেয়। হানাদারদের কনভয়ে ছিল দুটি পিকআপ, চারটি জিপ ও দুটি ট্রাক। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং পুনরায় আকন্দ সড়ক অনুসরন করে। এ সময় আকন্দ সড়কের দুই পার্শ্বে শত-শত বিক্ষুব্ধ জনতা জড়ো হয়। সেনারা এ দৃশ্য দেখে বিভ্রান্ত হয়ে উপায়ন্তর না পেয়ে বিক্ষিপ্তভাবে গুলি ছোড়ে এবং গুলির আঘাতে তৎক্ষণাৎ কয়েকজন শহিদ হন। সেই আঘাত নিয়ে এখনো জীবিত আছেন নান্দরায়পুর গ্রামের অনিল চন্দ্র সরকার, ওয়ালিয়া গ্রামের জবান আলী ও রুস্তম আলী। (২৩) তারপরও কনভয়টি সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা পথিমধ্যে বিজয়পুর ও বামনগ্রাম সীমান্তে অবস্থিত ইছামতি খালের উপর অবস্থিত ব্রিজের পশ্চিম পার্শ্বের রাস্তা আড়া-আড়ি ভাবে কেটে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এমতাবস্থায় সেনারা রাস্তায় খালকাটারত ৪/৫ ব্যক্তিকে হাতে-নাতে ধরে নিয়ে যায় শুকিয়ে যাওয়া খালিশাডাঙ্গা নদীর দিকে। কিন্তু নদীতে নামার পর আর কোন উপায় না পেয়ে নদীর উত্তর পাড়ে ময়না গ্রামে সৈয়দ আলী মোল্লা ও নওয়াব আলী মোল্লার বাগান ঘেরা বাড়ি দখল করে সকাল ১০ ঘটিকায়। এ সময় হানাদার বাহিনী বাড়ির চারকোণায় চারটি মেশিনগান স্থাপন করে আমগাছের নিচে গাড়ি পার্কিং করে। তাদের আগমনে অনেকে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মসলেম মোল্লার বাড়ির পেছনে আশ্রয় নেয়। আশ্রয়কৃতদের মধ্যে মসলেম মোল্লা, কাশেম, কেরামত ও ছাত্তারকে হানাদার সেনারা ধরে আনে ও আমগাছের সাথে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে এবং অনেককে আটকে রাখেন। (২৪) বীর বাঙালিও পিছু হটবার মানুষ নয়। তারাও ধৃত ব্যক্তিদেরকে উদ্ধারের জন্য গ্রামের চর্তুদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে। এদিকে গোপালপুর সুগার মিলের কর্মকর্তা লে. আনোয়ারুল আজিম (২৫) এবং স্বর্গীয় সুশীল কুমার (পাল বাবু) টেলিফোন যোগে মহকুমা কর্মকর্তা কামাল হোসেন ও আওয়ামী লীগ নেতা শঙ্করগোবিন্দ চৌধুরীকে লালপুরে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের বার্তা প্রেরণ করেন। মহকুমা কর্মকর্তা ময়নার যোদ্ধাদেরকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে কিছু পুলিশ ও আনসার সদস্যকে একটি জিপ ও ট্রাকসহ প্রেরণ করেন। (২৬)
ইতোমধ্যেই সমগ্র লালপুর, বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, রাজশাহীতে খানসেনাদের আগমনি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজার-হাজার বীর বাঙালি ময়না প্রান্তরে একত্রিত হয়। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শী কামরুজ্জামান (মাস্টার) বলেন, ‘হামিদুল হক (পোড়াবাবু), মাহাবুবুর রহমান সেন্টু, নায়েক বাবর আলী, আনসার কমান্ডার মেহের আলী, মোজাম্মেল হোসেন, আনসার গমেজ উদ্দিন, জাফর আলী, পুলিশ কর্মকর্তা জাফর আহম্মেদসহ তার বাহিনীর কিছু সদস্য এবং সরদহ ইউনিটের ইপিআর সদস্যদের এবং সুগার মিলের আনসার সদস্য নিয়ে গঠিত একটি সশস্ত্র বাহিনী ময়নার মাঠে জনতার সাথে মিলিত হয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে।’ (২৭)
চতুর্দিক থেকে প্রতিরোধে জনতার ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে হানাদার বাহিনী দিশেহারা হয়ে প্রথমে ভয় দেখানোর জন্য কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে, তাতেও প্রতিরোধকারী জনতাকে গতিপথ থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়; তখন তারা জনতাকে লক্ষ করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। জনতাও উল্টে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করেন।
পাকিস্তানিরা যাতে পিছু হটতে না পারে, সেজন্য একদল প্রতিরোধী সাবল-কুড়াল-কোদাল দিয়ে হানাদারদের পেছনে, নদীর ওপর যে ব্রিজ ছিলো, তা ভাঙতে লেগে যায়। ইতোমধ্যে নাটোর থেকে প্রতিরোধে অংশগ্রহণকারী শৈলেন্দ্র কুমার মঙ্গল নামে এক যুবক একটি খেজুর গাছে ওঠেন। পাকিস্তানিদের অবস্থা দেখে নিচে যারা হানাদারদের লক্ষ করে গুলি বা ঢিল পাটকেল ছুড়ছেন, তাদের সে তথ্য দেয়ার জন্য তার এই গাছে ওঠা। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী মঙ্গলকে গাছে উঠতে দেখে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। মঙ্গল গুলিবিদ্ধ হয়ে গাছ থেকে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। তৎক্ষণাৎ তাঁর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কয়েকজন এস.ডি.ও-র দেয়া গাড়ি নিয়ে নাটোর হাসপাতালে যান। আহত শৈলেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী মঙ্গল ওই রাতে নাটোর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শুধু নাটোর মহকুমায় নয়, সাবেক রাজশাহী জেলার শৈলেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী মঙ্গল হানাদার বাহিনীর গুলীতে প্রথম শহীদ যোদ্ধা। (২৮)
ময়না প্রান্তরের প্রতিরোধ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের উদ্ধার করার জন্য ৩০ মার্চ ১৯৭১ দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে কয়েকটি হেলিকাপ্টার আসে এবং হেলিকাপ্টার থেকে ব্যাপকভাবে গুলি ও বোমাবর্ষণ করে। কিন্তু প্রতিরোধী বাঙালিরা কী এক অসীম অদম্য সাহসে গুলিবিদ্ধ হয়েও তাদের অবস্থান থেকে এক তিলও পিছুপা হয়নি। প্রতিরোধীরা হেলিকাপ্টারকে লক্ষ করে রাইফেল দিয়ে গুলিবর্ষণ করে। এমতাবস্থায় জনতার শক্ত অবস্থান দেখে তাদের পরাজয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত বুঝে সঙ্গীদের ময়নার মাঠে নিয়তির হাতে সঁপে দিয়ে উদ্ধারের জন্য আগত হেলিকাপ্টারটি পালিয়ে যায়। সারাদিন এবং সারারাত্রি হানাদার বাহিনী অবরুদ্ধ থেকে কেউ কেউ ভোরবেলায় আত্মগোপন করে আখক্ষেতে। আবার কেউ কেউ আখক্ষেতে দিয়ে পালিয়ে কারো বাড়িতে গিয়ে অস্ত্র দেখিয়ে মহিলাদের শাড়ি নিয়ে পরে পালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। কিন্তু শাড়ি বা বোরকা পরলেও এত বিশালদেহী মহিলা যে বাঙালি গৃহে একজনও নেই, সেটা তাদের দেখে প্রতিরোধীরা স্পষ্ট বুঝে যায়। আর সে কারণেই হানাদার ঘাতকদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাতেনাতে ধরতে সক্ষম হয়। এদিকে ৩১ মার্চ সকালে পাকিস্তানিদের নিক্ষিপ্ত একটি শেল চামটিয়া গ্রামের আফসার আলীর বাড়িতে পড়ে। শেলটি বিস্ফোরিত হলে আফসার আলীর স্ত্রী জমেলা খাতুন ও সন্তান রাজলু নিহত হন। (২৯) চামটিয়া হত্যাকাণ্ডের সংবাদ ময়না প্রান্তরে পৌছালে বিক্ষুব্ধ জনতা ধৃত পাকিস্তানিদের ওপর আরো বেশি চড়াও হন। স্বজন হারানোর ক্ষোভে তারা অনেককে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। মেজর রাজা আসলামকে মুক্তিযোদ্ধা আনিসুল হক ময়নার অনতি দূরে সি অ্যান্ড বি রোডের একটি গর্তের চারদিকে জঙ্গল ঘেরা স্থানে প্রথমে দেখতে পেয়ে তাকে ধরে ফেলেন। ধৃত পাকিস্তানি হানাদারদের গোপালপুর মিলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়। বিক্ষোভকারী জনতা ধৃতদের তাদের হাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য প্রবল চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু জেনারেল ম্যানেজার লে. আজিম সাহেব, মিলের সিকিউরিটি অফিসার প্রমুখ বসে সিদ্ধান্ত নেন যে, ধৃত বন্দি তিন সদস্যকে মহকুমা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেবেন। তারা বন্দিদের সম্পর্কে কোনো ব্যবস্থা নেবেন না। জনতার চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলে জেনারেল ম্যানেজার তিন বন্দিকে তার বাসভবনের পিছন দিয়ে ট্রাকে তুলে লালপুর থানার দিকে রওনা দেন। লালপুর শ্রী সুন্দরী পাইলট হাই স্কুলের কাছে ট্রাক যেতেই জনতা পুনরায় ট্্রাক ঘিরে ফেলে। তারা বন্দিদের তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য প্রবল চাপ প্রয়োগ করে। আজিম সাহেব ও নেতৃত্বস্থানীয় অন্যান্য ব্যক্তিরা জনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মেজর আসলাম সেই ক্ষিপ্ত জনতাকে দেখেও চিৎকার করে বলেন, ‘হামকো ছোড়দে, নেহিতো ইহা বোম গিরেগা’। বিক্ষুব্ধ জনতা রাজা আসলামের কথা শুনেই ট্রাকের ওপর চড়াও হয় এবং জোরপূর্বক ট্রাক থেকে ছিনিয়ে নেয়। ১ এপ্রিল ১৯৭১ মেজর রাজা আসলামকে লালপুর হাইস্কুল মাঠে হামিদুল হক (পোড়াবাবু) গুলি করে হত্যা করেন। ধৃত অপর দুইজন গণপিটুনিতে নিহত হন। (৩০) এছাড়াও বাগাতিপাড়া, আড়ানিসহ বিভিন্ন এলাকায় পলায়নরত বেশ কিছু সেনা জনতার কাছে ধরা পড়ে এবং জনতার পিটুনিতে নিহত হন। আর এভাবেই ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ধ্বংসে রূপান্তরিত হয়।
প্রতিরোধ যুদ্ধে অস্ত্রের ব্যবহার: ময়না প্রতিরোধযুদ্ধে বীর বাঙালির হাতে ভারী কোন অস্ত্র ছিল না। তাঁরা দেশীয় অস্ত্র যেমন- ইট-পাটকেল, শাবল-কুড়াল-কোদাল, দা-হাসুয়া, বর্শা-বল্লম, তীর-ধনুক ও কিছু থ্রি নট থ্রি রাইফেল এবং অদম্য মনোবল নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে প্রশিক্ষিত ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে খানসেনারা মেশিনগান, স্টেনগান, রাইফেল ও মর্টারসেল ব্যবহার করেছিল।
প্রতিরোধযুদ্ধের ফলাফল: ময়না প্রতিরোধযুদ্ধে প্রায় ৪০ জন যোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতা শহিদ এবং ৩২ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ময়নার আবু বকর, হেলাল উদ্দিন, আবু মোল্লা, হরেন্দ্রনাথ, শঙ্কর দাস, সুধির চন্দ্র বিশ্বাস, রাজিয়া বেগম, মোমেনা খাতুন, হারুন-অর-রশিদ, শ্যামল কুমার, নিতাই চন্দ্র সরকার, গফুর আলী, অব্দুল হক, গোলাম মোস্তফা, বাহাদিপুরের আব্দুল কাদেরসহ আরো অসংখ্য ব্যক্তি। পুরাতন রাজশাহী জেলার তথা নাটোর মহকুমার লালপুর থানার ময়নার অধিবাসীই প্রথম আত্মবিসর্জন দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ নম্বর রেজিমেন্টকে সম্পূর্ণ পরাজিত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। সেদিন ময়নার প্রান্তরে প্রায় ২২ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। (৩১) তার আগে সমগ্র রাজশাহী জেলায় এমন সাহসী ঘটনার দৃষ্টান্ত আর নেই। ময়নাতে হানাদার বাহিনীর এই পরাজয়ের খবর মুহূর্তেই সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বীর বাঙালিকে যুদ্ধক্ষেত্রে উজ্জিবনী শক্তি যোগায়। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে মহিলারাও প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। তারা শুধু খাদ্য সরবরাহই করেনি, বাড়িতে ব্যবহৃত দা-কুড়াল-হাসুয়া-বটি প্রভৃতি তারা প্রতিরোধিদের হাতে পৌঁছে দেন যা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা করেছে। ময়না প্রতিরোধযুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৫ মে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের প্রায় তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারিকে লাইনে দাঁড় করে গুলি করে হত্যা এবং গুলিবিদ্ধ আহতদেরকে বেয়োনাট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে;(৩২) এছাড়াও পাকিস্তানি সেনা বাহিনী লালপুর থানার চংধুপইল ইউনিয়নের পয়তারপাড়া গ্রামে, রামকৃষ্ণপুর গ্রামে, বিলমাড়ীয়া হাটে এবং মহেশপুর গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত করে প্রায় চার শতাধিক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। অর্থাৎ ময়নার প্রতিরোধযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর চরম পরাজয়ের কারণেই নাটোর মহকুমার লালপুর থানাতেই সর্বাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ময়না প্রতিরোধযুদ্ধে শহিদদের তালিকা
ক্রমিক, নাম, পিতার নাম, গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা:
১. শহিদ সৈয়দ আলী মোল্লা, মৃত বাদল মোল্লা, ময়না, ওয়ালিয়া, লালপুর
২. শহিদ মসলেম আলী মোল্লা, মৃত মসির উদ্দিন মোল্লা, ময়না, ওয়ালিয়া, লালপুর
৩. শহিদ আবুল কাশেম মোল্লা, মৃত মসির উদ্দিন মোল্লা, ময়না, ওয়ালিয়া, লালপুর
৪. শহিদ আরজ উদ্দিন মোল্লা, মৃত ফজু মোল্লা, ময়না, ওয়ালিয়া, লালপুর
৫. শহিদ খন্দকার নুরন-নবী (মন্টু), মৃত নবাব আলী মুন্সি, ময়না, ওয়ালিয়া, লালপুর
৬. শহিদ কেরামত আলী শেখ, মৃত কুতুব উল্লাহ শেখ, নান্দ, ওয়ালিয়া, লালপুর
৭. শহিদ খাইরুল আনাম (ছাত্তার), মৃত খোরশেদ আলী, ওয়ালিয়া, ওয়ালিয়া, লালপুর
৮. শহিদ বকস সরদার, মৃত সিরাজ সরদার, ওয়ালিয়া, ওয়ালিয়া, লালপুর
৯. শহিদ করম আলী, মৃত চিনি মুন্সি, ওয়ালিয়া, ওয়ালিয়া, লালপুর
১০. শহিদ আবেদ আলী, মৃত তমেজ উদ্দিন, পানঘাটা, কদিমচিলান, লালপুর
১১. শহিদ আবুল কালাম আজাদ, মৃত গোলেহার মুন্সি, ধুপইল, ওয়ালিয়া, লালপুর
১২. শহিদ আব্দুল কুদ্দুস, টিটিয়া, দুয়ারিয়া, লালপুর
১৩. শহিদ কালু মিয়া, টিটিয়া, দুয়ারিয়া, লালপুর
১৪. শহিদ সেকেন্দার আলী, মৃত রুমু, বামনগ্রাম, অর্জুনপুর-বরমহাটি, লালপুর
১৫. শহিদ আছের উদ্দিন, মৃত ছফর উদ্দিন, বিজয়পুর, গোপালপুর, লালপুর
১৬. শহিদ জয়নাল আবেদিন, মৃত জফির উদ্দিন, ভবানিপুর, কদিমচিলান, লালপুর
১৭, শহিদ চেরু প্রাং, ভবানিপুর, কদিমচিলান, লালপুর
১৮. শহিদ নুরুন্নবী, দয়রামপুর, দয়রামপুর, বাগাতিপাড়া
১৯. শহিদ ইয়াছিন আলী, বাহাদিপুর, গোপালপুর, লালপুর
২০. শহিদ যুধিষ্ঠির প্রাং, মৃত রাম ভাদ্র প্রাং, মধুবাড়ি, গোপালপুর,লালপুর
২১. শহিদ শৈলেন্দ্র কুমার মঙ্গলম, নিচাবাজার, নাটোর সদর, নাটোর
২২. শহিদ সাহেব উল্লাহ, চাঁনপুরম, কদিমচিলান, লালপুর
২৩. শহিদ আঃ গফুর, মৃত মছির উদ্দিন, ডাঙ্গাপাড়া, কদিমচিলান, লালপুর
২৪. শহিদ নুরুল ইসলাম সরদার, আটঘড়িয়া, জোয়ারী, বড়াইগ্রাম
২৫. শহিদ তইজ আলী, রামকান্তপুর, কদিমচিলান, লালপুর
২৬. শহিদ জাহাঙ্গির হোসেন, মৃত নবাব আলী মুন্সি, ময়না, ওয়ালিয়া, লালপুর
তথ্যসূত্র: স্মরণিকা, বাংলাদেশ স্কাউটস লালপুর উপজেলা, ২০১৪; দৈনিক আমাদের সময়, ৩০ মার্চ ২০১৬; সাক্ষাৎকার: আজহার আলী মোল্লা, পিতা: মৃত মফিজ উদ্দিন মোল্লা, গ্রাম: ময়না, পো:-ওয়ালিয়া, উপজেলা: লালপুর, জেলা: নাটোর। হারন-অর-রশিদ, পিতা: মৃত. আরব আলী শেখ, গ্রাম: ময়না, পো:-ওয়ালিয়া, উপজেলা-লালপুর, জেলা: নাটোর। খ.ম. কামরুজ্জামান, পিতা: কোরেস উদ্দিন, গ্রাম: ময়না, পো:ওয়ালিয়া, লালপুর, নাটোর।
সংরক্ষণ ও স্মৃতিরক্ষার প্রয়াস: মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পর ময়না প্রতিরোধযুদ্ধের স্থানটি নিদারুন উপেক্ষার শিকার হয়। স্থানটির ইতিহাস সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে কাল ক্ষেপন করেন। অবশেষে যুদ্ধের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা জনাব মমতাজ উদ্দিনের প্রচেষ্টায় ১৯৯৮ সালে পাঁচ শতক জমির উপর নির্মিত হয় শহিদ স্মৃতিসৌধ। একই সময়ে শহিদ স্মৃতি সংগ্রহশালা ও পাঠাগারের জন্য দুই শতক জমি প্রদান করা হলেও অর্থের অভাবে তা আজও আলোর মুখ দেখেনি। শহিদদের স্মৃতির সম্মানে পরিচালিত হয়ে আসছে ময়না শহিদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতি বছর ৩০ মার্চ এলাকাবাসি স্মৃতিসৌধ চত্বরে দিনব্যাপি স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা ও মিলাদ মাহফিলের মধ্য দিয়ে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে তারা খুঁজে ফেরে তাদের স্বজনদের, কিন্তু প্রকৃতি কি ফিরিয়ে দেবে তাদের স্বজনদের? কখনও না। দেশ মাতৃকার সম্ভ্রম রক্ষার্থে তাদের স্বজনরা আত্মোৎস্বর্গ করেছে স্বজনহারা মানুষের কাছে এটাই বড় সান্তনা।
উপসংহার: ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ নাটোর মহকুমার লালপুর থানার ওয়ালিয়া ইউনিয়নের ময়না প্রান্তরের পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে স্বত:স্ফূর্ত প্রতিরোধী জনতার যুদ্ধজয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সারাদেশে তখনো হানাদার বাহিনী অপ্রতিরোধ্য ছিল। ময়না প্রান্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে প্রশিক্ষিত ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ধ্বংসে রূপান্তরিত করে নাটোরবাসী প্রথম বৃহত্তর ঐক্যশক্তি সংহত করে বিজয়ের গর্বিত ইতিহাস সৃষ্টি করে। সমগ্র বাংলাদেশে এই সাফল্য ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের মনে যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ অর্জনের আশা সঞ্চার করে। অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে লালপুর থানার বিভিন্ন স্থানে পাঁচ শতাধিক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। বাঙালির এই প্রতিরোধযুদ্ধের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের কোনো দলিলে কিংবা স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে উল্লেখ না হলেও নাটোরবাসীর স্মরণ আছে তাদের সেদিনের কীর্তির কথা। প্রতি বছর ঐতিহাসিক এই দিনটি পালিত হয় সেই স্বজনহারা ব্যক্তিদের উদ্যোগে। অথচ এসব শহিদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের অনেকেই এখনো সরকারি সব সাহায্য-সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত। অসহায় অভিভাবকহীন এসমস্ত পরিবারের খোঁজ-খবর নেয়ার লোকের বড়ই অভাব এই স্বাধীন দেশে। এদের অনেকেই সরকারি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থান পায়নি। কী অপরাধ তাদের? জানতে চায় ঐ সমস্ত শহিদ পরিবারের সদস্যরা। প্রতি বছর নির্দিষ্ট এই দিনটি শহিদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হলেও তাদের পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের কোন পদক্ষেপ আজও গৃহীত হয়নি। তাই আমাদের সবারই কাম্য ময়না প্রতিরোধযুদ্ধে শহিদ ও আহতদের সঠিক তালিকা তৈরি করে তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে যেন যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় এবং শহিদ স্মৃতি সংগ্রহশালা নির্মাণ করে মুক্তিযুদ্ধের এই গৌরবগাঁথা ইতিহাসকে সংরক্ষণের কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এর মাধ্যমে যাতায়াতের সময়ে পথিক জানতে পারবে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা ও অসংখ্য মানুষের আত্মদানের সঠিক ইতিহাস। আলোকিত হবে পরবর্তী প্রজন্ম।

* হাফিজ আহমেদ: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্যসূত্র:
১. ১৯ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকা থেকে বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব আরবাবকে পাঠানো হয়েছিল জয়দেবপুর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরী থেকে গোলাবারুদ নিয়ে আসার জন্য এবং একই সাথে জয়দেবপুরস্থ দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদেরকে নিরস্ত্র করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু জয়দেবপুরবাসীর প্রবল প্রতিরোধ ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনীর এই হীন প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। স্পষ্টতই ১৯ মার্চ, ১৯৭১ জয়দেবপুরবাসীই ইয়াহিয়ার সশস্ত্র হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ সংঘর্ষে অবতীর্ণ হওয়ার দুঃসাহস করেছিলো। দেখুন: শামসুল হুদা চৌধুরী, একাত্তরের রণাঙ্গন (ঢাকা: আহমদ পাবলিশিং হাউস, ২০১৩), পৃ.৭৩; সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.), বাংলাদেশের ইতিহাস, খণ্ড ০১ (ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০১৭), পৃ. ৪৮৫-৮৬।
২. সমর পাল, নাটোরের ইতিহাস (ঢাকা: গতিধারা প্রকাশনি, ২০১৪), পৃ.২৪।
৩. সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.), বাংলাপিডিয়া, খণ্ড ১২ (ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৩), পৃ. ২৯৭।
৪. Ashraf Siddiqi (ed.), Bangladesh District Gazetteers Rajshahi, ( Dacca: Ministry of cabinet affairs of Bangladesh Government, 1976), p.51
৫. শামসুজ্জামান খান (সম্পা.), বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা নাটোর (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১৪), পৃ. ৫৩।
৬. সমর পাল, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪।
৭. জুল্লুর রহমান, পিতা: গোলজার শেখ, গ্রাম+পো: গোপালপুর, উপজেলা: লালপুর, জেলা: নাটোর। তিনি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে লালপুর-চারঘাট আসন হতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পরে তিনি এলকার শিক্ষা উন্নয়নের লক্ষে গোপালপুর ডিগ্রী কলেজ ও গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে ১৯৭২ সালের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। গোপালপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মজীবনের সমাপ্ত করেন এবং ২০০৯ সালের ২১ অক্টোবর জীবনাবসান ঘটে।
৮. ফজলুর রহমান (পটল), পিতা: আরশাদ আলী, মাতা: ফজিলাতুন্নেছা। তিনি ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে গঠিত সরকারে তিনি যোগাযোগ, সমাজ কল্যাণ এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে কলকাতায় চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
৯. মমতাজ উদ্দিন, পিতা: বিয়াকুল প্রামানিক, মাতা: আবেজান বেওয়া, গ্রাম: মিল্কিপাড়া, পোস্ট: আব্দুলপুর, উপজেলা: লালপুর, জেলা: নাটোর। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোর-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালের ৬ জুন দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে তিনি শহিদ হন।
১০. মোসাদ্দেক হোসেন, ‘লালপুর’, আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (সম্পা.), মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, খণ্ড ০৩ (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৫), পৃ. ১৬২।
১১. সাক্ষাৎকার: আলহাজ্ব মোঃ আকিয়াব হোসেন, বয়স: ৬৮ বছর, পিতা: মৃত মোঃ দেলোয়ার হোসেন (চেয়ারম্যান, লালপুর ইউনিয়ন), গ্রাম+পো+উপজেলা: লালপুর, জেলা: নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: নিজ বাসবভন, তারিখ: ৩ জুন ২০১৭।
১২. এ. এস. এম. সামসুল আরেফিন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান (ঢাকা: সময় প্রকাশন, ২০১২), পৃ. ১২২-১৪০।
১৩. সুজিত সরকার, নাটোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস (রাজশাহী: ধ্রুব প্রকাশনী, ২০১০), পৃ.১২৯।
১৪. এ. এস. এম. সামসুল আরেফিন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৩-১৪০।
১৫. মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণেচ্ছু ব্যক্তিদের সুষ্ঠুভাবে সামরিক প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি ‘যুব শিবির নিয়ন্ত্রণ পরিষদ’ গঠন করে। বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর ভারতীয় ভূখণ্ডে কমবেশি ১১০টি অভ্যর্থনা শিবির গড়ে তোলা হয়। এই শিবিরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে আগত শরনার্থীদের আশ্রয় দেয়া হতো এবং শরনার্থীদের মধ্য থেকে যুবক ও ছাত্র বাছাই করে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রেরণ করা হতো। আগস্টের শেষদিকে মোটামুটিভাবে উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের মাধ্যমে যুব প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তোলা হতে থাকে। এই শিবির পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় নির্দেশপত্র জারী এবং শিবির প্রধান নিযুক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষাবধি যুব প্রশিক্ষণ শিবিরের সংখ্যা পঁয়ত্রিশে দাঁড়ায়। এসব প্রশিক্ষণ শিবির থেকে প্রায় আশি হাজার ছাত্র ও যুবককে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেƒরণ করা হয়।
১৬. তদেব, পৃ. ১৩৯।
১৭. সাক্ষাৎকার: আলতাফ হোসেন মাস্টার, বয়স ৭৫ বছর, পেশা: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক (লালপুর শ্রী সুন্দরি উচ্চ বিদ্যালয়), গ্রাম: নবীনগর, পো:+উপজেলা: লালপুর, জেলা: নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: নিজ বাসবভন, তারিখ: ৩ জানুয়ারি ২০১৫।
১৮. সাক্ষাৎকার: মোঃ দেলবার হোসেন, বিলমাড়ীয়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার (১৯৭১),বয়স ৬৮ বছর, গ্রাম: মহোরকয়া, পো: বিলমাড়ীয়া, লালপুর, জেলা: নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: নিজ বাসভবন, তারিখ ১ জুন ২০১৭।
১৯. সাক্ষাৎকার: বজলুর রহমান (বিজু), পিতা- এ.কে.এম শামসুদ্দিন, গ্রাম: শিবপুর, পো: গোপালপুর, উপজেলা-লালপুর, জেলা: নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: গোপালপুর বাজার, তারিখ: ১১ এপ্রিল ২০১৯; বিজু চিশতী, ‘তালিকায় ঠাঁই না পাওয়া এক মুক্তিযোদ্ধার কথা’, সাপ্তহিক পদ্মা প্রবাহ, ১৭ সেপ্টম্বর ২০১৭।
২০. সাক্ষাৎকার: আলহাজ্ব মোঃ আকিয়াব হোসেন, পিতা: মৃত মোঃ দেলোয়র হোসেন (চেয়ারম্যান, লালপুর ইউনিয়ন), বয়স ৬৮ বছর, গ্রাম+পো+উপজেলা: লালপুর, জেলা: নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: নিজ বাসবভন, তারিখ: ৩ জুন ২০১৭।
২১. মাজহারুল ইসলাম তিব্বত, ‘ধ্বংস হয়েছিল পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ’, দৈনিক আমাদের সময়, ৩০ মার্চ ২০১৬।
২২. মো. জহুরুল ইসলাম বিশু, পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের কথা (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ, ২০১০), পৃ.৪৪।
২৩. সাক্ষাৎকার: হারুন-অর-রশিদ (প্রত্যক্ষদর্শী), পিতা: মৃত. আরব আলী শেখ, বয়স: ৫৫ বছর, গ্রাম: ময়না, পো:-ওয়ালিয়া, উপজেলা-লালপুর, জেলা: নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: নিজ বাসবভন, তারিখ: ০৪ জুন ২০১৮।
২৪. সাক্ষাৎকার: আজহার আলী মোল্লা (প্রত্যক্ষদর্শী), পিতা: মৃত মফিজ উদ্দিন মোল্লা, পেশা- শিক্ষকতা (ওয়ালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়), বয়স: ৬২ বছর, গ্রাম: ময়না, পো:-ওয়ালিয়া, উপজেলা: লালপুর, জেলা: নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: নিজ বাসবভন, তারিখ: ০৭ জুন ২০১৮।
২৫. লে. আনেয়ারুল আজিম, জন্ম ১৯৩১ সালে ৩১ ডিসেম্বর নওগাঁ মহকুমার রাণীনগর উপজেলায়। তিনি ১৯৪৭ সালে দিনাজপরু জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক, ১৯৫১ সালে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে আইএ ও ১৯৫৩ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। বিএ পড়ার সময় তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে তিনি আত্মগোপন করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক লেবার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি নারায়ণগঞ্জ ডক ইয়ার্ডে সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের জেনারেল ম্যানেজার পদে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা হানাদার বাহিনীর গোচরীভূত হলে পাকিসেনারা রাজাকারদের সহায়তায় ৫ মে ১৯৭১ ঘেরাও করে শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারিকে আটক করে। সেদিন হানাদার বাহিনীর উদ্যত বন্দুকের সামনে অকুতভয়ে জামার বোতম খুলে বুক পেতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে গুলি না করে আমার একটা লোককেও গুলি করা যাবে না।’ তাঁর এই ঘোষণা হিংস্র করে তোলে ঘাতকদের, তাদের মধ্যে একজন বলে, ‘কেয়া মরণকো বহৎ শউক হো গিয়া?’ কথা হয়তো শেষ হয়নি, বৃষ্টির মতো বুলেট সবাইকে ধরাশায়ী করে ফেলল। তাঁর শহিদি আত্মদানের জন্য সরকার ২০১৭ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেন। দেখুন-দৈনিক প্রথম আলো, ২১ ডিসেম্বর ২০১৪, সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.); বাংলাপিডিয়া, খণ্ড ০১ (ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৩), পৃ. ১৫৩-৫৪; রশীদ হায়দার (সম্পা.), স্মৃতি ১৯৭১, খণ্ড ০১ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০১৭), পৃ. ১৫৯-৬২।
২৬. সাক্ষাৎকার: স্বাধীন কুমার পাল, পিতা: মৃত. স্বর্গীয় সুশিল কুমার পাল, মহল্লা: শান্তিপাড়া, পো: গোপালপুর, উপজেলা: লালপুর, জেলা: নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: আজিমনগর রেলওয়ে স্টেশন, তারিখ: ০৬ জুন ২০১৮।
২৭. সাক্ষাৎকার: খ. ম. কামরুজ্জামান (প্রত্যক্ষদর্শী), পিতা: কোরেস উদ্দিন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক (নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস হাই স্কুল), বয়স: ৬৮ বছর, গ্রাম: ময়না, পো:ওয়ালিয়া, লালপুর, নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহনের স্থান: নিজ বাসবভন, তারিখ: ২৪ জুন ২০১৭।
২৮. সুজিত সরকার, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫২।
২৯. সুকুমার বিশ্বাস (সম্পাদিত), মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী: অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, (ঢাকা: মওলা ব্রাদার্স, ২০১৪), পৃ.১৬৭।
৩০. সাক্ষাৎকার: মোঃ তোফাজ্জল হোসেন (প্রত্যক্ষদর্শী), পিতা: মৃত বছির আলী প্রাং, পেশা: চাকুরি (নিরাপত্তাকর্মী, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল), বয়স: ৫৯ বছর, গ্রাম: ভবানিপুর, পো: ওয়ালিয়া, লালপুর, নাটোর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান: আনসার ভিডিপি অফিস (বনপাড়া), তারিখ: ২১ জুন ২০১৭; সাক্ষাৎকার: খ.ম. কামরুজ্জামান, পূর্বোক্ত।
৩১. মুনতাসীর মামুন (সম্পাদিত), মুক্তিযুদ্ধ কোষ, খণ্ড ৮ম (ঢাকা: সময় প্রকাশন, ২০১৫), পৃ.৭৭।
৩২. হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পা.), বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, খণ্ড ৮ম (ঢাকা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে হাক্কানী পাবলিশার্স, ২০১০), পৃ.৪৫৬।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top