logo
news image

আবরার আলো জ্বেলে আলোড়ন

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।  ।  
আবরার হত্যাকান্ডের নৃশংসতা ও পৈশাচিকতা দেখে শুধু সারা দেশ কাঁদছে না- দেশের বাইরেও মানুষ কেঁদে হতাশা ব্যক্ত করছে। কেন ঘটলো এমন নিষ্ঠুর ঘটনা? হলে ওর কি কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল না? অথবা হৃদয়বান দরদী ছোটভাই বা কোন বড়ভাই? যার একটু দয়ামায়া ছিল, যে কিনা ওর পাশে দাড়াতো, ওকে হায়েনাদের আঘাতের হাত থেকে আগলে রাখার চেষ্টা করতে পারতো? হলো ছেলেটার শরীরে না জানি কত শতবার স্টাম্পের কষাঘাতের নির্মমতা মৃত্যুদূত হয়ে আছড়ে পড়েছে। সেই নির্যাতনের কথা ভাবলেই গা শিউরে উঠে। কিন্তু আবরার নামক আলোটা বড্ড অসময়ে নিভে এক মহা আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলেছে।
বুয়েটকে প্রকৌশলবিদ্যার প্রদীপ ভাবা হয়। সেই প্রদীপের আলো নিতে দেশের সবচে’ মেধাবীরা সেখানে জড়ো হয়। কিন্তু কবে যে সেই প্রদীপের নিচে অন্ধকার জমেছে আর সেই অন্ধকারে পাষাণ দানবরা তরুণ মেধাবীদের মাথা খেয়ে ভোতা বানিয়ে খুনী-গ্যাং তৈরী করে ফেলেছে তা আবরারের ওপর নির্মম অত্যাচারের কাহিনী পড়ে দেখে নতুন করে জানা গেল। সেটা হলো দেশের অপরাজনীতি। অতীতের একসময়কার ভোটবাক্স চুরি করা, কেন্দ্র দখল করা, বাড়ি বাড়ি টাকা দিয়ে ভোটকেনা, পরবর্তীতে রাতের ভোট ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের ন্যক্কারজনক অধ্যায় সূচিত করেছে। ভোটারবিহীন নির্বাচনে যাদের সহায়তায় নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে জনপ্রতিনিধি হওয়া যায় তারা কোন কোন ক্ষেত্রে দেশে অপরাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সেইসব কালো টাকাওয়ালা পেশীশক্তির অন্যান্য বাহুগুলো আরো শক্তি যোগানোর জন্য ছাত্র তথা  বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বহু পূর্ব হতে ব্যবহার করতে শুরু করলেও তখনকার দিনে আমরা দেশের স্বার্থের জন্যে সবাই একই সুরে কথা বলতাম। তখন ছাত্র রাজনীতি ছিল ছাত্রদের কল্যাণের জন্য। আর এখন শোনা যাচ্ছে এর বিপরীত। এখন সিংহভাগ ক্ষেত্রে ছাত্র রাজনীতি হয়েছে অসহিষ্ণু, কোন কোন ক্ষেত্রে  সহপাঠিকে খুন করার জন্য আর লেজুরবৃত্তি ও ধান্ধাবাজি করে অবৈধভাবে অর্থ উপাজন করে দুর্নীতিবাজ হবার জন্য।
একজন দেশের স্বার্থে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মত প্রকাশ করলে তাকে নির্দয়ভাবে সবাই মিলে পিটিয়ে হত্যা করতে হবে- এই মানসিকতা কেমন করে, কার প্রভাবে জন্ম নিলো? এটা গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে। বিশ^বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবেই নয়, একজন অভিভাবক হিসেবে সবাইকে গভীরভাবে এই বিষয়গুলো চিন্তা করতে অনুরোধ করছি। তা না হলে- একটি নির্মম হত্যকান্ড ও তার বিচার আরো অনেকগুলো জীবনের জন্য ও তাদের পরিবারগুলোর জন্য নিকষ অন্ধকার  এনে জড়ো করতে থাকবে বৈ কি? যা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য ভয়ংকর।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রায় সাতবছর হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে থেকেছি। আমার ফুফাতো ভাই বুয়েটের কবি নজরুল ইসলাম হলে থাকতো। তাই সেখানে মাঝেমধ্যে বেড়াতে যেতাম। সেই নিরিবিলি পরিবেশ এখনও বেশ মনে পড়ে। সেখানে এখন টর্চার সেল তৈরী হয়েছে, হত্যাকান্ড ঘটছে- এ বিষয়গুলো বড় পীড়া দিচ্ছে। ক’দিন যাবত আবরার হত্যাকান্ডের নৃশংসতার সংবাদগুলো অনবরত প্রচারিত হয়ে সেই মধুর স্মৃতিগুলোকে গুঁড়িয়ে-মুচড়িয়ে ধূলিস্মাৎ করে দিচ্ছিল। আবরার হত্যাকান্ডের পর ওর বাবা-মায়ের করুণ আহাজারি দেখে নিজে বেশ কষ্ট পাচ্ছিলাম। তাই ভেবেছিলাম কিছুই লিখবো না। কিন্তু ক’দিন পেরিয়ে গেলেও দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবাই এর প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি যেন পুরো দেশবাসী ওর সাথে কাঁদছে। বিদেশী গণমাধ্যমগুলোও এই ন্যক্কারজনক হত্যাকান্ডের জন্য ধিক্কার জানাচ্ছে। হাতি দিয়ে হাতি ধরা যায়- হাতিকে কাজে লাগানোর জন্যে। কিন্তু বুয়েটের সোনার ছেলেরা বিবেক হারিয়ে আরেক সোনার ছেলেকে হত্যা করবে এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এসব বংশবদরা ছেলেটাকে পিটুনি দিয়ে মেরে বারান্দায় ফেলে রেখে রুমে বসে টিভিতে খেলা দেখেছে। কিসের নেশায় বুঁদ হয়ে, কার প্ররোচনায় দিব্যজ্ঞান হারিয়ে ওরা ঠান্ডা মাথায় এই খুন করে ফেলল তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত।
কারণ আবরার হত্যাকান্ডের ইস্যুটি  মানুষের মনে এতটা দাগ কেটেছে যে- এর আগে সাগর-রুনি ছাড়া কোন খুনের সংবাদ এতগুলো মিডিয়ায় একসংগে এতবার প্রচার হতে দেখিনি। রাস্তায় নেমে এত ামনুষের প্রতিবাদ মিছিল হয়নি। মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এত মতামত জানায়নি। খুনিদেরকে এত ঘৃণা ও ক্ষোভ জানায়নি। এত উষ্মা প্রকাশ করেনি। ভিকটিমের প্রতি তথা আবরারের পরিবারের প্রতি এত সহানুভূতি জানায়নি, এত সাহসও কেউ দেয়নি বলে মনে হলো।
এপর্যন্ত আবরার হত্যাকান্ডের কারণ সম্পর্কে গণমাধ্যম থেকে যা জানা যাচ্ছে তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে এই হত্যাকান্ডের ইস্যু ও উৎসটি সুকঠিন! দ্রুত তদন্তে হয়তো দ্রুত এ বিষয়ে জানা যেতে পারে। কারণ, ইতোমধ্যে এ হত্যাকান্ডের বিচারের দাবীগুলো প্রবল হয়ে উঠেছে এবং রাষ্ট্র থেকে দ্রুত বিচারের আশ^াস দেয়া হয়েছে। আবরার হত্যাকান্ডের ইস্যুটি  বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চারদিকে আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলেছে। তাই চারদিকে সবাই ফুঁসে উঠেছে। আবরারের দেহের ওপর স্টাম্পের নির্মম আঘাতগুলোর লাল-কালো দাগগুলো যেন বাংলাদেশের মানচিত্র হয়ে পাশবিক শয়তানের ময়লা দাঁতগুলোকে ভেংচি দিচ্ছে। একজন তার মতামতে লিখেছেন- ‘বলতে দ্বিধা নেই আবরার হচ্ছেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম তরুণ শহীদ প্রকৌশলী’।
আমাদের সমাজ ভরে গেছে মদ, জুয়া, ধর্ষণ ও সহপাঠি হত্যার মত জঘন্য পাপকাজের অনুশীলনে। নৈতিকতা যেন নিভে গেছে। ঘুষ, দুর্নীতি ও খারাপ কাজে ধিক্কার জাগে না অনেকেরই মনে।
দেশের প্রতিটি খারাপ ইস্যুতে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু শুধু প্রান্তিকজন ধরা পড়ে, নেপথ্যজনকে স্পর্শ করতে দায়িত্বরতরা প্রায়শ:ই ভয় পায়। নেপথ্যজনের কান টানলে পরিচিত মাথা চলে আসে। এতে সাময়িক বিব্রত হবার বিষয় থাকলেও দেশের কল্যানে সেটার ভয় না করাই শ্রেয়। প্রতিটি জটিল সমস্যার উৎস খুঁজে বের করা ও নাটের গুরুদের চিহ্নিত করা, ধরা ও শাস্তি দেয়া এখন সময়ের দাবী। তাই এত ভয় কিসের? এ বিষয়ে কোনরুপ ছাড় দেয়া জাতির জন্য লজ্জাকর ও ভয়ংকর। তা না হলে নিকট বন্ধুজনরা ও বড়ভাইয়েরা হায়েনা হয়ে আবরারের মত সবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে ও এর নেপথ্য নায়করা সবাইকে শীঘ্র বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শয়তানি অট্টহাস্য করতে দ্বিধা করবে না !
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Blog single photo
October 11, 2019

Rokshana Moushumi

আমি খুব অপেক্ষায় ছিলাম যে আমার ডিপার্টমেন্টের এতো গুণী শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কি এ বিষয়ে কিছু লিখবে না! ধন্যবাদ স্যার, এ বিষয়ে লেখার জন্য। আমার মনের কথাগুলোই তুলে ধব়েছেন। সর্বোপরি আমরা একটা অপরাজনীতিমুক্ত সুশীল সমাজ চাই।

(0) Reply
Top