logo
news image

জঙ্গী দমনে সামাজিক প্রেষণা জাগানিয়া কর্মসূচি

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
সমসামায়িক বৈশি^ক বাস্তবতায় জঙ্গীবাদ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ জঙ্গীবাদের সাথে উগ্রবাদ, মৌলবাদ, রাজনীতি এমনকি অর্থনীতিও এই আলোচনার মূলসুরে মিশে একটি জটিল বিষয়ে রূপায়িত হয়েছে। প্রায়শই: একজনের ধর্ম ও আদর্শকে অন্যজনের ধমর্, আদর্শ ও বিশ্বসের সংগে হীনভাবে তুলনা করে ভেদাভেদ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ধর্ম (রিলিজিওন) ও বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক আদর্শ (আইডিওলজি)-র মধ্যে ধারনাগত পার্থক্য বুঝে, না-বুঝে অনেকের মধ্যে এই হীন প্রবণতা বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এখানে নিছক আতœহত্যা নয় বরং নিজে আতœঘাতী হয়ে বহু প্রাণ ও সম্পদ ধ্বংস করার অভীপ্সা এবং ইতোমধ্যে সংঘটিত বহু মারাতœক মৃত্যু-ঘটনা দেশে দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। নানা বাস্তবতার সন্মুখীন হয়ে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিও এই দুখ:জনক প্রবণতার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে।
আত্মহত্যা করা পাপ।  দেশের জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ন হওয়া ব্যাতিরেকে অন্য যে কোন ব্যাপারে আত্মঘাতী হওয়া নি:সন্দেহে তার চেয়ে জঘন্য কাজ। একজন মানুষ কখন কোন কারণে প্রলুব্ধ হয়ে নিজেই নিজেকে হত্যা করতে সিদ্ধাšত নিতে পারে- তা মোটামুটি সবাই অনুধাবন করতে পরেন। এর অনেক কারণ হয়তো আমাদের অজানা। আবার অনেক কারণ জেনেও গুরুত্ব দেয়া হয় না। সব অজানা কারণ উদ্ঘাটন করার সময় এসেছে।
যেমন, উন্নত সভ্যতার দাবীদার অনেক ধনী দেশেই আজকাল শূণ্য জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিরাজমান। সেসব দেশে একসময় বাজার, বাড়ি, চার্চ-উপাসনালয়ে তারা নিজেরাই যেত, শুধু নিজেরাই কেনাকাটা করতো। নিজেদের পরিবার, সন্তান, সমাজ ছিল আনন্দে ভরপুর ও নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতিতে প্রাণবন্ত। কালের করাল পরিক্রমায় শতাব্দী পরে আমরা দেখতে পাচ্ছি তাদের অনেকে বাড়ি-ঘর আজকাল ফাঁকা। জমি, বাগান, মার্কেট পরিত্যক্ত। অনেকের দোকানে-বাজারে বিদেশী অভিবাসী, বাড়ি কিনেছে বিদেশী-এমনকি সংবাদ মাধ্যমে জানা গেছে যে, চার্চে যাবার নিজ ধর্মের মানুষের অভাবে সেগুলো অন্য ধর্মের অভিবাসীগণ অল্প পয়সায় কিনে নিয়ে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলেছেন। নিউজিল্যান্ড ছাড়াও ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এই ধরনের অনেক নজির তৈরী হয়েছে।
অনেক দেশে অভিবাসীগণ শিক্ষা-দীক্ষা ও সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে জীবন যাপন করলেও অনেক দেশে নেটিভরা অভিবাসীদেরকে সহ্য করতে পারে না, এখনও ঘৃণা করে। যেমন ফ্রান্স, ইত্যাদি। এরা হিজাব দেখলে অন্য দৃষ্টিতে তাকায়। গণমাধ্যমে জানা গেছে- এজন্য অনেকের ওপর হামলাও হযেছে। নিউজিল্যান্ডের  ক্রাইস্টচার্চে অভিবাসীদের মসজিদে হামলার পিছনে এই ধরনের একটি ইস্যু কাজ করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
এক গবেষণায় দেখা গেছে- পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে খাস জমি, পরিত্যক্ত বাড়ি-ঘর তথা শত্রু সম্পত্তি ছিল সেখানে সম্পত্তিকেন্দ্রিক কলহ ও সামাজিক অস্থিরতা বেশী হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে! এখানে উগ্রবাদ তৈরী হয় সবধর্ম বা সব আদর্শের মানুষের মধ্যে। এসব জায়গায় উগ্রবাদী কলহ ও আক্রমণের কারণ শুধু ধর্ম ও আদর্শবাদ নয়- স্বার্থও জড়িত রয়েছে। যেটার মূল লক্ষ্য সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ পাবার চেষ্টা। এখানে শক্তিশালী সামজিক দলটিই সে অঞ্চলের নিয়ন্ত্রন নিয়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। অপরদিকে দুর্বলরা সাধারনত: সেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়, মৃত্যুবরণ করে অথবা তাদের কেউ প্রতিবাদী হয়ে সরাসরি বিদ্রোহ করে বা দুর্বলদের মধ্যে কেউ সরাসরি সাহস না পেয়ে প্ররোচিত হয়ে আত্মঘাতি (লোন উলফ্) হয়। এখানে টেরর বা আতœঘাতি একজন, তার দ্বারা হঠাৎ বহুজন হতাহত হয়ে থাকে। এখানেও চোখের সামনে বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষের সম্পত্তি, ধর্ম ও নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি অভিবাসীদের কাছে হারানোর বেদনা তার আতœঘাতি হবার পেছনে ইন্ধন দেয়, মানসিক শক্তি যোগায়। উত্তর আমেরিকায় স্কুল কিলিং ঘটনায় অভিবাসী শিক্ষার্থীদের ওপরে গুলি ও হামলার পিছনে এই ইস্যুগুলো জড়িত আছে বলে অনেকে মত দিয়েছেন।
একসময় অভাব, বঞ্চনা ও ভৌগলিক দারিদ্র্যকে বিশ^জঙ্গিবাদ উথ্থানের অন্যতম প্রধান কারণ বলা হতো। এর সাথে ধর্মীয় বিশ্বাস, গোত্র, বর্ণ, জাতিভেদ প্রথা সৃষ্টি হয়ে সামাজিক মতবাদের ভিন্নতা যুক্ত হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী ও নানা কারণে মানুষের মধ্যে সম্পদ ও ক্ষমতার ভাগাভাগির দ্বন্দ্ব তৈরী হয়ে সবল ও দুর্বল মানবগোষ্ঠির পরিচয় গজিয়ে উঠে। দুর্বলরা পেটের তাগিদে অথবা নতুন জীবনের আশায় ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে জীবন বাঁচাতে তৎপর হয়ে ওঠে ও স্থানান্তরিত হয়ে নতুন সভ্যতা গড়ে তোলে। এভাবে নতুন মানব সভ্যতা, কৃষ্টি ও মূল্যবোধ সম্পন্ন জাতি গড়ে উঠে ও এক সময় মানুষ উন্নত জীবন লাভের সুযোগ পেয়ে অতীতের কথা ভুলে বসে।
সাম্প্রতিক সময়ে মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বিশ্বের সব কিছুতে গতির সঞ্চার হয়েছে। বেড়েছে ব্যবসা বাণিজ্য। চাকুরী শিক্ষা, চিকিৎসা, ইত্যাদি ছাড়াও যুক্ত হযেছে নতুনরূপে পুরাতন রোগ- হিংসা, লোভ, ক্ষোভ, অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় মতভেদ নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুড়ি, মিথ্যাচার, জবরদখল, জালিয়াতি, ঘুষ-দুর্নীতি, ভোটচুরি  ও দখল-আগ্রাসন। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে যুক্ত হয়েছে অপরাধের নিত্যনতুন কৌশল ও আরো অজানা নানাকিছু। মুক্ত বাজার অর্থনীতির মত জঙ্গিবাদ এখন বৈশি^ক রাজনৈতিক একটি ব্যাপার। হীন বৈশি^ক রাজনৈতিক চক্র এখন বিশ্বজঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করে। এরা স্থানীয় সুবিধাভোগী এজেন্ট ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়।
আজকাল বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমে সামাজিক উত্তেজনার ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ভালভাবে প্রচারিত হয়। কিন্তু বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উত্তেজনা প্রশমণ করে দ্রুত শান্তি আনয়নের জন্য অনুসন্ধানী, এপিষ্টমোলজিক্যাল ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলো দ্রুত প্রচারিত হওয়া দরকার। এগুলোর পিছনে যারা অর্থ ও অস্ত্রদাতা তাদেরকেও দ্রæত চিহ্নিত করে প্রচারে আনতে হবে। প্রতিটি রাষ্ট্রকেই এই দায়িত্ব হতে নিতে হবে। তা না হলে রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও মনগড়া আদর্শ একাকার হয়ে মানবতার অকল্যাণ ডেকে আনতেই থাকবে।
আবার রাষ্ট্র দায়িত্ব নিয়ে ঢিলেমি করলে বিষয়টিকে আরো কঠিন ও গভীরে ঠেলে দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে এসব নিরসণে রাষ্ট্রের নীতিমালায় কিছুটা পরিবর্তন এনে ধর্মীয় সংগঠন, উগ্র ধর্মীয় সংগঠন, উগ্র জঙ্গী সংগঠন ইত্যাদি চিহ্নিত করে তাদের গতিবিধি নজরদারী করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। যেমন চীন, জাপানের বড় শহরগুলোর রাস্তা দিয়ে গভীর রাতে যখন ফালুন গং অথবা ব্ল্যাক সামুরাইরা অভিযানে বের হয় তখন টহল পুলিশ ও ট্রাফিক কোনভাবে বার্তা পেয়ে যায় ও বেশী সতর্ক হয়ে পড়ে। কারণ, ওরা প্রায়শই: ট্রাফিক আইন ভেঙ্গে দ্রুত সটকে পড়তে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। ওরা ধর্মীয় আবরণে সৃষ্টি হলেও আদর্শিক জঙ্গী। কিছুদিন পূর্বে ভারতে রাম-রহিম গ্রুপ সেদিকেই যাচ্ছিল। তারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে  কিন্তু ইউরোপে মাফিয়া-ডনরা ওপেন সিক্রেট হিসেবেই রয়ে গেছে। সেজন্য ধর্মীয় জঙ্গী ও মনগড়া আদর্শিক জঙ্গী বা হঠাৎ অযাচিত ঘটনায় সৃষ্ট সাময়িক উগ্রবাদীদেরকে চিহ্নিত করে শ্রেণিবিভাগ করে নিতে হবে। এতে ক্ষয়ক্ষতি কম হবে এবং পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙ্গন রহিত হতে পারে। অন্যথায় বর্তমানের নির্বিচার বা ঢালাও পদ্ধতিতে গ্রেপ্তার, হত্যা ও শাস্তি প্রদান পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙ্গন বৃদ্ধি করছে ও নতুনধারায় দীক্ষিত ও প্ররোচিত হয়ে দেশীয় আত্মঘাতি (ইনডিজিনাস লোন উলফ্) সৃষ্টি করছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্তক থাকতে হবে।
আমরা জানি উপযুক্ত গবেষণা ছাড়া মোটিভেশন কর্মসূচি কোন  ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আনে না। ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জাগ্রত করতে অপারগ হলে ব্যাখ্যা কোন ইতিবাচক সমাধান আনতে পারে না। তাই একটি সহনশীল সমাজ গড়তে প্রতিটি সামাজিক নিরাপত্তা সেবাখাতে উপযুক্ত সেবাদান নিশ্চিত করতে গবেষণা শাখাকে জোরদার করে সামাজিক প্রেষণা (স্যোশাল মটিভেশন) জাগানিয়ামূলক কর্মসূচি যথার্থ তথ্যের ভিত্তিতে হাতে নিতে হবে। এসব সামাজিক নিরাপত্তা সেবাখাত হচ্ছে- বেকার যুবকদের জন্য দ্রুত চাকুরী বা সহজলভ্য যে কোন কর্মসংস্থান, ভবঘুরে কিশোর-কিশোরীদের জন্য আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তড়িৎ পুনর্বাসন, শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম ভিক্ষুকদের চিহ্নিত করে আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ন্ত্রণ, মাদকাসক্ত ও ভাসমান পতিতাদের চিহ্নিত করে চিকিৎসা প্রদান ও নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ন্ত্রণ, ধনীর বখাটে দুলাল এবং স্কুল ও ঘর পালানো কিশোর-কিশোরীদের নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চিহ্নিত করে পারিবারিক সেবাদান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোবাইল ফোনের সেবায় সব প্রতিটি পরিবারের অভিভাবকদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গাড়ি ও ফোন সেটের সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়ে ইন্টারনেট সেবায় সবধরণের পর্ণোগ্রাফি পূর্ণনিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করা,  ইত্যাদি। এই ধরণের ইস্যুগলোতে গবেষণাভিত্তিক কৌশলী কর্মসূচির প্রেক্ষিতে তথ্যসম্ভার তৈরী করা জরুরী। তথ্যসম্ভার হাত থাকলে কোথাও অপরাধ সংঘটিত হবার পূর্বেই প্রতিরোধমূলক সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্ভব। এভাবে সকল সামাজিক অনাচার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং যেসব মানুষ আতœঘাতী হয়ে অপরের প্রাণনাশ করার মত ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেবার পথে পা বাড়ায় সে সকল মানুষকে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top