logo
news image

সোনা ফলা দ্বীপ

উদয় হাকিম।।
নীল সমুদ্র। ছোট বড় ঢেউ। তার মাঝখানে এক শান্ত দ্বীপ। বিস্তীর্ণ সবুজে ছাওয়া। পাখ পাখালির কলকাকলিতে মুখর। সহজ সরল গ্রাম্য জীবন। ঘাসে মোড়ানো মেঠো পথ। দিগন্ত জোড়া ধান ক্ষেত। জলের উপর জবা ফুলের মৃদু চলন। কিশোর-কিশোরীর সলজ্জ হাসি- এই হলো সন্দ্বীপ। চট্টগ্রামের একটি বিচ্ছিন্ন উপজেলা।
কত বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলাম! সন্দ্বীপ যাবো। হয়নি। বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট খেলা চলছিলো চট্টগ্রামে। ব্র্যান্ডিং মনিটর-এ গিয়েছিলাম। প্রথম ওয়ানডে শেষে দ্বিতীয় দিন ছিল বিরতি। সহকর্মীদের বললাম, এবার কোনোভাবেই সন্দ্বীপ মিস করবো না। তারাও সঙ্গে যেতে রাজি হলেন।
কোস্ট নামে একটি এনজিও কাজ করতো সন্দ্বীপে। এর নির্বাহী পরিচালক রেজা ভাইয়ের বাড়িও সেখানে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নেমেই তাকে ফোন করেছিলাম। জানালেন, তিনি ঢাকায়। সন্দ্বীপে খুব একটা যাওয়া পড়ে না। তার এনজিওর কার্যক্রমও এখন সেখানে নেই। তিনি আরেকজনের ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। কথা বলে জানলাম তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গা। কয়েকমাস আগে তিনি একবার সন্দ্বীপ গিয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলে মনে হলো- স্থানীয় কারো পরামর্শ নেয়াই ভালো। বাংলাদেশের ভেতরেই তো। সুতরাং সমস্যা নেই। নিজেরাই যেতে পারবো।
সকাল বেলা হোটেলে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট করে উঠলাম মাইক্রোবাসে। ড্রাইভার বিপ্লব বড়ুয়াকে বললাম, কুমিরা ঘাটে যান। নামটা শুনেছিলাম আগেই। সহকর্মী এবং সহযাত্রী ফিরোজ আলম আগের সন্ধ্যাতেই গুগল ম্যাপে জায়গাটা দেখে নিয়েছিলেন। দূরত্ব এবং সম্ভাব্য সময়ও হিসেব করেছিলেন। কুমিরা ঘাট ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের কাছেই। তাই চট্টগ্রাম থেকে ছুটলাম ঢাকার দিকেই। সকালবেলা ট্রাফিক কম ছিলো। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে জিইসি মোড় থেকে কুমিরা ঘাটে পৌঁছে গেলাম। জেটির শুরুতেই টিকিট কাউন্টার। আগে শুনেছি কুমিরা ঘাট থেকে সন্দ্বীপ যাওয়ার ট্রলার পাওয়া যায়। লঞ্চ বা স্টিমার আছে। আছে স্পিডবোট। ঘাটে গিয়ে দেখলাম স্পিডবোট ছাড়া আর কোনো জলযান নেই। জেটি অনেক লম্বা। আধা কিলোমিটারের বেশি হবে।
সকালটা ছিলো রৌদ্রকরোজ্জ্বল। রোদের কি মূল্য বুঝেছি ভিয়েতনাম গিয়ে। হা লং বে তে গিয়েছিলাম, ছিলাম দুদিন। দুদিনে একবারও সূর্যের মুখ দেখিনি। সূর্য না থাকলে ছবি ভালো হয় না। ডিএসএলআর আর মোবাইল ফোনগুলো শত চেষ্টা করেও ভালো ছবি বের করতে পারেনি, শুধু আলোর অভাবে। কারণ ক্যামেরা আলো চেনে, অন্য কিছু নয়।
সহকর্মী মিল্টন যখন স্পিডবোটের টিকিট নিচ্ছিলেন ফিরোজ আলম তখন মোবাইলে আমার ছবি তুলছিলেন। টিকিট নেয়া হলো। জনপ্রতি ভাড়া আড়াইশ’ টাকা। অবশ্য এই ভাড়ার অঙ্কটাও একেকজন একেক সংখ্যা বলছিলো। কেউ বলেছে ৫০০, কেউ বলেছে ৪০০, কেউবা ৩০০। টিকিট কেটে একটা আমড়া কিনেছিলেন মিল্টন। সেটা কামড়াতে কামড়াতে হাঁটছিলেন। এক ফাঁকে হাত বাড়ালেন। ফিরোজ আলম সেখান থেকে এক কোয়া খসিয়ে নিলেন। হাত বাড়ালেন আমার দিকেও। এটা ফিরিয়ে দেয়া যায় না। টক মিষ্টির ব্যাপার- কার না পছন্দ!
সবাই কুমিরা ঘাট থেকে জেটির শেষ মাথায় যাচ্ছিলেন রিকশাভ্যানে করে। অনেকটা পথ। চড়া রোদ। তখন ভাটা চলছিলো। ঘাট চলে গেছে শেষ মাথায়। জোয়ারের সময় যদিও বোট চলে যায় টিকিট কাউন্টারেরই কাছেই। যাচ্ছিলাম পশ্চিমে। হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম উত্তর দিকে বিশাল দুটো জাহাজ। কাদার মধ্যে বসে ছিলো। জাহাজ দুটি এতো বিশাল যে, তার সামনের দিকে নিচে কিছু মানুষজন কাজ করছিলো। যাদেরকে পিঁপড়ের মতো দেখাচ্ছিলো। জাহাজ দু’টিকে পেছনে রেখে ছবি তুললাম। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে আপলোড।
সীতাকুণ্ডের এই জায়গাটি বিখ্যাত জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য। লোহার জাহাজ ভেঙে টুকরো টুকরো করে তার বিভিন্ন অংশ বিক্রি করা হয়; এটাই জাহাজ ভাঙা শিল্প। এখানে রাস্তার দু’ধারে অসংখ্য দোকান। যেখানে জাহাজের বিভিন্ন অংশ, ফার্নিচার ইত্যাদি বিক্রি হয়। জেটির শেষ মাথায় অনেক লম্বা লাইন। যাত্রী বেশি। বোট কম। কড়া রোদে গা পুড়ে যাচ্ছিলো। আধা ঘণ্টা লেগে গেলো বোট পেতে। একটা জাহাজ ছেড়ে যাচ্ছিলো, একটা  আসছিলো। বৃহস্পতিবার ছিলো বলে দ্বীপে যাওয়ার যাত্রীর চাপ বেশি। আমরা যাচ্ছিলাম পশ্চিমে। সাগরের জলরাশির উপর দিয়ে তাকালাম সামনে। না, কোথাও কোনো লোকালয় চোখে পড়ছিলো না। নেই ভূখণ্ডও। সন্দ্বীপ আসলে কত দূর? কক্সবাজার থেকে মহেশখালী দেখা যায়। দেখা যায় সোনাদিয়া দ্বীপও। এমনকি টেকনাফ বা শাহ্ পরীর দ্বীপ থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের সেন্টমার্টিনও দেখা যায়। তাহলে সন্দ্বীপ কতদূর? ২৯ কিলোমিটার। জোয়ারের সময় আরো এক কিলো বেড়ে যায়।
স্পিডবোটে গাদাগাদি করে বসলাম। পানি অত্যন্ত ঘোলা। কাঁদামাখা। পুরোনো তেল ভাসছিলো। ওই যে বলেছিলাম জাহাজ ভাঙার কথা। এখানে জাহাজ টুকরো টুকরো করে ভাঙা হচ্ছিলো বলে জাহাজের তেল ময়লা মিশছিলো পানিতে। দক্ষিণ দিক থেকে প্রবল স্রোত বইছিলো উত্তরে। কেন? ভাটা শেষে জোয়ার আসছিলো তাই। কিছুক্ষণ আগে দেখছিলাম একটা কিশোর তিন ঠ্যাঙ্গা একটা জাল নিয়ে মাছ ধরছিলো। ততক্ষণে জায়গাটি হয়তো অথৈ জলে ভরে উঠেছিলো।
কুমিরা ছেড়ে যাচ্ছিলাম পশ্চিমে, কিছুটা উত্তর পশ্চিম কোণে। পেছনে কুমিরার জাহাজ আর কিছু পাকা ভবন দেখা যাচ্ছিলো। কুমিরা জায়গাটি সীতাকুণ্ড এবং মিরসরাই উপজেলার মাঝামাঝি। এখানে একটি খাল আছে। যেটি অন্তরীপের মতো ঢুকে গেছে লোকালয়ে। খানিকটা পথ যেতেই দেখলাম সাগরের পূর্ব তীরে আমাদের উত্তর পাশে বিশাল আকৃতির বেশকিছু স্টিলের টিউব। হয়তো তেলের ডিপো বা ল্যান্ডিং স্টেশন। আরেকটু বলে নিই- সন্দ্বীপ জায়গাটি মেঘনার মোহনায় জেগে ওঠা ভূমি। এর সোজা উত্তরে লক্ষ্মীপুর এবং নোয়াখালী জেলা। হাতিয়া এবং নিঝুম দ্বীপ ওখান থেকে কাছে। বিখ্যাত উড়িরচর এর ঠিক উত্তরে। উড়িরচর কেন বিখ্যাত জানেন তো? ১৯৮৫ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে সেখানে দশ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটেছিলো। তখন বিশ্বে আলোচিত নাম ছিলো উড়িরচর। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়েও সেখানে ব্যাপক প্রাণহানী ঘটে।
সন্দ্বীপ আর চট্টগ্রামের মাঝের জলভাগকে বলা হয় সন্দ্বীপ চ্যানেল। মাঝামাঝি পার হতেই ঢেউয়ের আকার পাল্টে গেলো। কিছুটা বড় ঢেউ আসতে শুরু করলো। খানিক পর দেখা যাচ্ছিলো সন্দ্বীপের ভূভাগ। ঘাটের কাছাকাছি যেতেই ঢেউ আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠলো। আমার ঠিক কোলের কাছে একটা তিন চার বছরের ছেলে বসে ছিলো। জিজ্ঞেস করলাম, সাঁতার জানো? গলায় কাঠের মালা পরা ওর বাবা সাথেই ছিলো। তিনিই উত্তর দিলেন, জানে না। পেছন ফিরে দেখলাম মায়ের কোলে শুয়ে আছে দুটি দুধের শিশু। বোটে কোনো লাইফ জ্যাকেট নেই। বিদেশে হলে লাইফ জ্যাকেট ছাড়া কোনো যাত্রী নেয়া অ্যালাও করতো না কর্তৃপক্ষ। আমাদের দেশে আবার এসবের কোনো কর্তৃপক্ষই নেই। ভাবছিলাম, তখন বোট উল্টে গেলে কি হতো! সাঁতার জানা লোকজন হয়তো বেঁচে যেতো। বাঁচতো হয়তো কোলে থাকা শিশুর মায়েরাও। কিন্তু ওই শিশুরা! আমরা হয়তো তাদের কান্নাও শুনতে পেতাম না! ভাবতেই গা শিউরে উঠছিলো।
ঘড়ি ধরে বসে ছিলাম। ঠিক ২৫ মিনিট লাগলো সন্দ্বীপ পৌঁছতে। এ ঘাটের নাম গুপ্তছড়া। জেটি ঘাটের পাশে নামিয়ে দিলো। কাঠের তৈরি সেতু পেরিয়ে তীরে উঠলাম। একজন ফকির আগন্তুকদের দিকে হাত বাড়িয়ে ছিলো। কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। সবার দৃষ্টি সামনে, আরো সামনে।
মহেশখালী জেটি ঘাটে দেখেছিলাম অনেক গাছ-গাছালি, প্যারাবন। অনেকেই হয়তো প্যারাবন চিনছেন না। জলের ঢেউ থেকে উপকূলকে রক্ষার জন্য সৃজিত বনকে বলা হয় প্যারাবন। সাধারণত ক্যাওড়া গাছের বন। কারণ লবণ জলে এই গাছ ভালো থাকে। সন্দ্বীপের ওই ঘাটে গাছ-গাছালির সংখ্যা খুব কম। পাকা জেটিতে উঠতেই রিকশাভ্যান ঘিরে ধরলো। আমরা যথারীতি হেঁটে রওনা হলাম। জেটির শেষ মাথায় কিছু স্কুটার ছিলো। ছিলো মোটরসাইকেল। মোটরসাইকেল শুরুতেই নাকচ করে দিলাম। চড়া রোদ। রাস্তায় ধুলাবালিও ছিলো। তাই স্কুটারই ভালো। চালকরা ঘিরে ধরলো আমাদের। জানতে চাইলেন- কোথায় যাব? বললাম, ঘুরতে এসেছি, দেখতে এসেছি। উল্টো শুনতে চাইলাম- এখানে দেখার মতো কী আছে? একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলো। জানালো, দেখার মতো অনেক কিছুই আছে। কী কী আছে? বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কালা পানি, সবুজ চর, ধলিপাড়া, সোয়াখালি, বাংলাবাজার ইত্যাদি। এইসবগুলো জায়গা বিকেলের মধ্যে ঘুরে আসা সম্ভব? বলল সম্ভব। সবগুলোতে স্কুটার নিয়ে যাওয়া যাবে? যাবে।
পাশ থেকে এক মোটরসাইকেল চালক বললেন, সবগুলো জায়গায় সিএনজি (স্কুটার) যাবেই না। তাছাড়া একদিনে সম্ভব নয়। তাহলে আর কি, মোটরসাইকেলের বিকল্প নেই। ফিরোজ আলম দুই মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে কথা বলে তাদের ঠিক করে ফেলেছিলেন। বললেন, মোটরসাইকেলে উঠেন। আমি একটাতে উঠলাম। অপর বাইকে উঠলেন ফিরোজ আর মিল্টন। কোথায় যাচ্ছিলাম? প্রথম গন্তব্য সবুজ চর আর বিদ্যুতের ল্যান্ডিং স্টেশন।
নতুন বেড়িবাঁধ হচ্ছিলো। সন্দ্বীপ রক্ষা বাঁধ। আগে যেটুকু ছিল বাঁধের, সেখান থেকে লোকজন সরিয়ে দেয়া হচ্ছিলো। বাঁধের উপর এ্যাবড়ো থেবড়ো। মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়াই দুষ্কর। এখানে স্কুটার চলার প্রশ্নই আসে না, বলছিলো বাইকের চালক জুয়েল। স্কুটারে এলে সামান্য কিছু পথ ঘুরিয়ে নিয়েই বলতো শেষ। আপনারা নতুন এসেছেন। তাই কিছু বলতেও পারতেন না। কথা সত্য। কিন্তু তুমি বা কতটুকু নিয়ে যাবে সেটা নিয়েও আমার প্রশ্ন- কথাটা মনে মনেই রাখলাম। মনে থাকলে কথাটা শেষে বলবো, হয়েছিলোও তাই।
বাঁধের পশ্চিম পাশে কিছুটা জায়গা ছেড়ে ঘরবাড়ি ছিলো। এরা নাকি আগে বাঁধের উপরেই থাকতেন। পূর্ব পাড়ে কোনো বাড়ি ঘর রাখা হয়নি। কারণ বর্ষাকালে পূর্ব দিকটা পানিতে ডুবে যায়। পূর্ব পাশে যতদূর চোখ যায় কেবল সবুজে ছাওয়া ধান ক্ষেত। রেজা ভাইয়ের কাছে এক যুগ আগেই শুনেছিলাম এখানে ব্যাপক ধান হয়। যতদূর চোখ যায় শুধু ধান ক্ষেত। ফসলও হয় খুব ভালো। পশ্চিম দিকে বাড়িগুলোর পরেই আবারো ধান ক্ষেত। বাঁধের উপর গরু চড়ছিলো। ঘাস খাচ্ছিলো ছাগল ভেড়া। ন্যাড়া কুকুরের অনাহুত ছুটছিলো। শিশু কিশোরেরা গ্রামীণ খেলা নিয়ে ব্যস্ত। কে জানে এরা স্কুলের সময়ে কেন খেলছিলো। আমাদের দেখে কিশোরীরা সলজ্জ হেসে চলে যাচ্ছিলো। কেউবা নতুন আগন্তুক দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো। গৃহিণীরা কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কেউবা ঘরের কাজ শেষ করে উঠোনো বসে উকুন মারছিলো। কেউবা গরু ছাগলের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলো। ল্যাংটো ছেলের দল চারা খেলছিলো। মাটিতে দাগ কেটে বাঘ-চোর খেলছিলো কেউ কেউ। একটা ঘরে অনেক লোকজন। ঢোলের আওয়াজ। ঢুকঢাক বাজনা। কি হচ্ছিলো। এক কিশোর বলছিলো, ‘জিন হাজির করতাছে’। করুক, মানুষজন এসব বিশ্বাস করে মরুক। একশ’ গজ পরে আরেকটা ঘরে একই রকম পরিবেশ। সম্ভবত এই দুই ঘরে জিন হাজিরের খেলা চলে নিয়মিত।
আধা ঘণ্টা পর একটা ছোট কালভার্টের সামনে এসে থামলো বাইক। নেমে গেলাম। রাস্তার পূর্ব পাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। চিকন একটা রেখা চলে গেছে বহুদূরে। কিলো দেড়েক দূরে সাগরের পাড়। একেবারে ওই পর্যন্ত রেখাটার বিস্তৃতি। পশ্চিম পাশে ছোট একটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটা ল্যান্ডিং স্টেশন। সাবমেরিন পাওয়ার লাইন হচ্ছিলো সেখান দিয়ে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানালেন, সমুদ্রের পানির নিচে আরো ২৭ ফুট গভীরে এই বিদ্যুতের লাইন বসানো। এই বিদ্যুতে আলোকিত হবে সন্দ্বীপ। কাজ চলছিলো পুরোদমে। মোবাইল ফোনে কয়েকটা ছবি নিলাম ল্যান্ডিং স্টেশনের। ক্যামেরা ঘুরিয়ে পূব দিকে ধান ক্ষেতের দিকে দৃষ্টি। মন হারিয়ে যাচ্ছিলো ছোটবেলার গ্রামে। কত দেশ বিদেশ গিয়েছি, শহুরে চাকচিক্য, সাগর নদী পাহাড় দেখেছি। কিন্তু এইসব গ্রাম স্মৃতির কোটরে এখনো নষ্টালজিক শিহরণ ছড়ায়।
মোটরসাইকেলে নেমে গেলাম রাস্তা ছেড়ে হালটে। কিছুদূর গিয়ে হালট মিশে গিয়েছিলো ক্ষেতের আ’লে। হাঁটতে হাঁটতে হাঁটা পথ তৈরি হয়েছিলো। যাচ্ছিলাম সেখান দিয়েই। কোথায় যাচ্ছিলাম? ভেড়ার বাথানে। দূরে দেখতে পাচ্ছিলাম ভেড়া চড়ছিলো। আরো দূরে নীল দিগন্তের সাথে মিশে ছিলো সাগরের জলরেখা। একপাশে ছোট মরা খাল। আরেক পাশে ধানক্ষেত। বাইক থামাতে বললাম জুয়েলকে। কেন? ধানের সঙ্গে ছবি তুলব। ধানক্ষেত আমার খুব প্রিয়। আমার কাছে সোনালি ধান মানেই সমৃদ্ধির প্রতীক। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামল বাংলার প্রতিকৃতি। ধানক্ষেত মানে স্বর্ণালি আগামী। ধানক্ষেত মানে সুখী বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন। সোনালি ধান মানে সোনালি আশা।
ফিরোজ আলমকে বললাম ছবি তুলে দিতে। ক্ষেতের আইলে, ক্ষেতের ভেতরে গিয়ে ধানের সঙ্গে ছবি তুললাম। ফিরোজ আলমের ছবির হাত ভালো, কালার কম্পোজিশন জ্ঞান টনটনা। তার সঙ্গে থেকে থেকে মিলটনও ভালোই রপ্ত করেছে। মিলটনের ব্যাগে ছিলো ডিএসএলআর। সেটি দিয়েও ক্লিক ক্লিক। ছবি তুলছিলো সবাই। ওদিকে আমার দৃষ্টি তখন পাশের শুকিয়ে যাওয়া খালের কাদায়। দুটি মহিষ কাদায় শীতলতা খুঁজছিলো।
বাইক রেখে এবার হেঁটে চললাম সামনে। মিনিট দশেক হেঁটে চলে গেলাম একটা ভেড়ার বাথানের কাছে। কিছুক্ষণ দৌড়ে একটা নাদুস নুদুস ভেড়ার বাচ্চা ধরে ফেললাম। কোলে নিলাম। ছবি তুললাম। আমার ছবি নেয়া শেষ হলেও বাচ্চাটা মুক্তি পেলো না। ও তখন মডেল হয়ে উঠেছিলো। দৌড়ে ধরার দরকার কি? শুধু কোল পাল্টালো। ফিরোজ আলম, মিলটন আহমেদ এরাও ভেড়ার সঙ্গে ছবি তুললো। দূরে দেখলাম আরো কিছু ভেড়ার পাল। সাগরের এই দিকটা বিশাল চরের মতো। অনেক সবুজ ঘাস। ভেড়াগুলো মনের সুখে ঘাস খাচ্ছিলো। এই ভেড়ার পালের নেতা আব্দুল হামিদ। কথা হলো তার সঙ্গে। শ’খানেক ভেড়া নিয়ে তার এই বাথান। তিনি দুধ দোয়ান না। দুধ যা হয় তা ভেড়ার বাচ্চাকে খেতে দেন। বলেন কি? সত্যি। হ্যাঁ সত্যি। হতে পারে। কারণ ভেগান নামে একটি ধারণার প্রচলন শুরু হয়েছে। এরা প্রধানত সবজিভোজী। এরা দুধ খায় না। তাদের মতে, দুধ হলো বাছুরের বা ওই প্রাণীর বাচ্চার খাবার। মধু খাবে না। কারণ মধু হলো মৌমাছির খাবার। তাকে ভীতি সঞ্চার করে সরিয়ে সেই মধু খাওয়া ঠিক নয়। কোনো প্রাণীর মাংস খাবে না। কারণ সেটা প্রাণ সংহারের শামিল। আবার মাংস খাওয়া মানে নানাবিধ অসুখ বিসুখ ডেকে আনা। মাছকেও তারা প্রাণীর পর্যায়ে ফেলে। যেমন দেখেছি ভুটানে। ওরা জল থেকে মাছ ধরে না। সকল প্রাণীর সুখ কামনা করে তারা। তাদের মতে, জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।
যাহোক, আব্দুল হামিদের হাতে একশ’ টাকার একটা নোট দিলাম। কারণ যখন ভেড়ার বাচ্চা ধরছিলাম, তখন তিনি বাঁধা দেননি, বিরক্তও হননি। ভেবেছিলাম হয়তো নিতে চাইবেন না। কিন্তু নিলেন। আমি অন্তত মনের দায় থেকে রক্ষা পেলাম। দূরে চরের মাঝখানে কিছু ছায়াগাছ ছিলো। সেগুলোর শরীরজুড়ে ছিলো বেশ কিছু প্লাস্টিকের ড্রাম। ওগুলো কী? জুয়েল উত্তর দিলো, জেলেদের জালের সঙ্গে ওগুলো বেঁধে দিতে হয়। যাতে জাল ভেসে থাকে। পাশের শুকিয়ে যাওয়া খালে আবারো নজর পড়লো। শুকনো বালিতে এক কিশোর মাটি খুঁড়ছিলো। বয়স চৌদ্দ পনেরো। নাম জিজ্ঞেস করলাম। লজ্জা পায়। সলজ্জ্ব হাসি। কথা বলে না। এগিয়ে গেলাম। ছবি তুললাম। অনেক পরে নাম বললো রনি। স্কুলে যাওনা কেন? উত্তর দিলো না। কী করছিলে? কাঁকড়া ধরছিলাম। শুকনো মাটিতে কাঁকড়া! হ্যাঁ, কাঁকড়ারা গর্তে থাকে। গর্তগুলো তার চেনা হয়ে গেছে। যেহেতু সে লজ্জা পাচ্ছিলো, কথা বাড়াতে চাইছিলাম না।
ফিরে যাওয়ার আগে পেছন ফিরে তাকালাম। কি অদ্ভূত সুন্দর এই চর! নাম সবুজ চর। এমন নামকরণের কারণ কি? সবুজ ঘাস আর ধান ক্ষেতের জন্যই নাকি এমন নাম। এমন দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত এখন কমই চোখে পড়ে। এই ধানই বাঁচিয়ে রেখেছে বাংলাদেশকে। এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশকে। এগুলো কী ধান? জুয়েল বললেন, এই ধানের নাম রাজ হালি। আমি বললাম, রাজ শালি হতে পারে। জুয়েলের তৎক্ষণাৎ উত্তর, না শাইল ধান বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে। ওখানে লোনা পানি যায় না। আর এই রাজ হালি লোনা পানিতেও ভালো হয়। যাক, ধান গবেষকরা ভালো বলতে পারবেন। আমি ভাবছিলাম, ছোটবেলায় দেখেছি আউশ আর আমন ধানের চাল। বোরো বা ইরি তখনো আসেনি। নানা রকমের শালি বা শাইল ধান হতো। সেগুলোর ভাত এবং মাড় বা ফ্যানও ছিলো খুব সুস্বাদু। আমরা মগে করে স্যুপের মতো নতুন চালের ফ্যান খেতাম! সে সব স্মৃতি আজো অমলিন। দিঘা ধানে চালের রঙ ছিলো লালচে। ভাত ছিলো খুবই সুস্বাদু। আরো কত রকমের চাল ছিলো। এখনতো সব সার দেয়া ইরি বোরোতে বাজার সয়লাব। ইরি ধান মেশিনে কেটে হয় মিনিকেট!
বেড়িবাঁধ ক্রস করে এই প্রথমবারের মতো পশ্চিমে যাচ্ছিলাম। রাস্তাগুলো কম চওড়া। একটা স্কুটার যেতে পারবে এরকম। কিন্তু আরসিসি রাস্তা। এটা কেন? ঝড় জলোচ্ছ্বাসে লোনা পানি যাতে রাস্তার ক্ষতি কম করতে পারে। দ্বীপটা উত্তর দক্ষিণে লম্বা। পূব দিকে থেকে পশ্চিমে যাচ্ছিলাম। একটা স্কুলে তখন অ্যাসেম্বলি হচ্ছিলো। অযথা হর্ন বাজাতে বাজাতে যাচ্ছিলো জুয়েল। বললাম, কেন এতো হর্ন দিলেন অযথা? জুয়েলের উত্তর- স্কুলতো। বাচ্চারা কেউ তলে পড়তে পারে। কেন পড়বে? রাস্তায় কি কোনো বাচ্চা ছিলো? না। তাহলে? জুয়েল একটু ভাবেন তো, প্রশ্ন করলাম। সব বাচ্চারা অ্যাসেম্বলি ফেলে আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলো। ওদের মনোযোগ নষ্ট করেছেন। এটা একটা অন্যায়। দ্বিতীয়ত গাড়ির হর্ন শুনে অনেকেই আঁতকে উঠেছিলো। আপনি ছোট বেলায় এরকম হর্ন শুনলে ভয় পেতেন না? হ্যাঁ পাইতাম। তাহলে কাজটা কি ঠিক হলো? জুয়েল বললো, এভাবে ভাইবা দেখি নাই কোনোদিন।
নিটোল গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। সবুজ গাছপালায় ঘেরা। রাস্তার পাশ দিয়ে ছোট খাল। অগভীর জলে ভেসে যাচ্ছিলো জবা ফুল। জলের ধারেই সার বেঁধে জবা ফুলের গাছ। অনাদরেই বেড়ে উঠেছিলো সেগুলো। বাড়ির সঙ্গে ছোট ছোট জলাশয়, পুকুর, পাগাড়। তাতে পুরোনো শাড়ি কাপড় দিয়ে বেড়া দেয়া। গ্রামের লোকেরা সেখানে গোসল করে। গোসলের জায়গাটা একটু আড়াল করে নেয়া আর কি। বলে রাখি, এসব দ্বীপের মানুষ খুব ধর্মপ্রাণ। এই উপমহাদেশে কম শিক্ষিত সমাজে ধর্মের বাড়াবাড়ি বেশি। আর কিছু থাক বা না থাক, একটু দাঁড়ি এবং টুপি প্রায় কমন।  কয়েকটা স্কুল পড়লো পথে। সবগুলোই দু’তলা। এগুলো ঘূর্ণিঝড়ের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আসলে নিরঙ্কুশ বা নিরন্তর সুখ কোথাও নেই। এখানে সহজ সরল সুখী জীবন যাপনের মধ্যেও আছে প্রবল ভীতি। সমুদ্র মাঝে মাঝেই উত্তাল হয়, রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। ঘূর্ণিঝড়ে প্রবল বাতাস আর জলোচ্ছ্বাসে তছনছ হয়ে যায় সাজানো বাগান। জীবন এবং পরিবেশের হয় মারাত্মক ক্ষতি। এমনই এক করুণ কাহিনি শুনেছিলাম। সে-ও অনেক বছর আগের। ১৯৯১-এর ২৯ এপ্রিলের কথা। স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কথা। প্রকৃতির এরকম তা-বলীলা পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই রয়েছে।
আমি তখন সবে ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছিলাম। ১৯৯০-এর নভেম্বর ডিসেম্বর জুড়ে ছিলো স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। এরশাদের পতনের পর হলো নতুন নির্বাচন। এসব মিলিয়ে ক্লাস হয়েছিলো খুব সামান্যই। ছিলাম উত্তর ছাত্রাবাসে। আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন রোমান ভাই। বাড়ি সন্দ্বীপ। ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের সময় তিনি ছুটিতে সন্দ্বীপ ছিলেন। তখন সাগর ফুঁসে উঠেছিলো। ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত জারি করা হয়েছিলো। তখন সংকেত ব্যবস্থাপনা, এলাবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়া এবং দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখনকার মতো শক্তিশালী ছিলো না। যার কারণে ইতিহাসের ভয়াবহতম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিলো জান-মালের। রোমান ভাই কীভাবে মৃত্যুরূপী পানি আর ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে এসেছিলেন সেই কাহিনি আমরা শুনেছিলাম তিনি ঢাকায় ফিরে আসার পর।
উত্তর ছাত্রাবাসের দু’তলার মিলনায়তন ভর্তি ছাত্র। পিনপতন নীরবতায় আমরা শুনছিলাম সেই করুণ কাহিনি। অনেক বছর আগের কথা। স্পষ্ট মনে নেই সবকিছু। রোমান ভাই ছিলেন খুব প্রাণবন্ত মানুষ। গিটার বাজাতেন। একই ছাত্রবাসে থাকতাম। ১৯৯১ এর সেই ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাড়িতে বসেই তিনি ঝড়ের সতর্ক সংকেত পেয়েছিলেন। এক, দুই তিন, চার...। বাড়তে বাড়তে ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত!  সম্ভাব্য সব এলাকায় চলছিলো দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি। রেডিও টেলিভিশনে সতর্ক সংকেত প্রচার হয়েছিলো- ঘূর্ণিঝড়ের সময় করণীয় এবং পরে কী করতে হবে। জানমাল রক্ষায় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছিলো। প্রশাসনকে রাখা হয়েছিলো প্রস্তুত। কিন্তু রোমান ভাইদের মতো অনেকেই বিপদ সংকেতকে খুব একটা পাত্তা দেননি। এর আগে নাকি সেরকম ১০ নম্বর সংকেতেও তাদের কিছুই হয়নি। তাই সে-বারও কিছুই হবে না ধরে নিয়ে তারা বাড়িতেই ছিলেন। দুপুরের পর থেকেই বৃষ্টি। বিকেলে বাতাসের বেগ ক্রমশ বাড়তে থাকলো। সন্ধ্যায় আরো বেগবান হলো ঝড়ো বাতাস। সন্ধ্যার পর শুরু হলো তুমুল ঝড়। বৃষ্টি এবং তীব্র ঝড়ে তছনছ হতে শুরু করলো উপকূল, সন্দ্বীপ। সন্ধ্যার পর শুরু হলো জলোচ্ছ্বাস। দশ-বারো ফুট উচ্চতায় প্রবল বেগে উপকূলে আঘাত হানে শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস। বাড়ি ঘর, গবাদি পশু, গাছপালা সবকিছু ভেসে যেতে শুরু করলো। রোমান ভাই বললেন, তারা পরিবারের সবাই বাসাতেই একসঙ্গে ছিলেন। বাবা-মা, ছোট ভাই, ছোটবোন। তীব্রবেগে বাতাস বইতে শুরু করলে দরজা জানালা সব আটকে দিয়েছিলেন। দেখছিলেন ঘরের ভেতরটা আস্তে আস্তে পানিতে ভরে উঠছিলো। পানি ক্রমশ বাড়ছিলো। দেখতে দেখতে ঘরের টি-টেবিল পানিতে ভাসতে লাগলো। সোফা ভাসলো। খাটে পানি উঠে গেলো। ঘরের আসবাব সব এলোমেলো ঢেউ খেলছিলো। সবকিছু কেমন উল্টাপাল্টা হয়ে উঠছিলো। কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। ধীরে ধীরে বাতাসের বেগ আরো বাড়ে। পানির তোড়জোড় পায়। কোমর অব্দি উঠে গেলো পানি। বাইরে একটানা শা শা শব্দ। মানুষের আর্তনাদ। ঘরের টিনে শো শো আওয়াজ। মহা দুর্যোগের ঘনঘটা।
ততক্ষণে মৃত্যু ভয় তাঁদের আঁকড়ে ধরেছিলো। সবাই এক ঘরে এক জায়গায় জড়ো হয়েছিলেন। পানি আরো বাড়ছিলো। ঠান্ডা লোনা পানিতে সবাই হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। মৃত্যু ভয় তাদের অন্য সব ভয়কে ম্লান করে দিয়েছিলো। ঘরে আগে থেকেই একটা চারি রাখা ছিলো (গবাদি পশুকে খাওয়ানোর জন্য মাটির বড় পাত্র)। সেখানে ছোট ভাই আর বোনকে বসিয়ে চারি ভাসিয়ে দিলেন তারা। রোমান ভাইয়ের বাবা সম্ভবত স্থানীয় একটি কলেজের শিক্ষক ছিলেন। মা-ও সম্ভবত হাই স্কুলের টিচার ছিলেন। যদিও রোমান ভাইয়ের বাবা-মা চাননি সন্তানদের এভাবে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে। মরতে হয় সবাই এক সঙ্গেই মরবেন। কিন্তু রোমান ভাই ভাবলেন যেভাবে পানি বাড়ছে তাতে ঘরের ছাউনি বা টিনের চাল ডুবে যাবে। তখন পানিতে দম বন্ধ হয়ে হয়তো সবাইকে মরতে হবে। তারচে’ ওদের বাইরে পাঠিয়ে দিই, হায়াত থাকলে বাঁচবে। ঘরের দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে পানির ঢেউ এসে ঘরে ঢুকছিলো। রোমান ভাই অনেক কষ্টে চারি পাঠিয়ে দিলেন বাইরে। হাত থেকে ছোটার পরই চারি হারিয়ে গেলো অন্ধকারে, ভাসিয়ে নিয়ে গেলো প্রবল পানির তোড়।
সময় গড়াচ্ছিলো, পানি বাড়ছিলো। এক পর্যায়ে বড়দের বুক পর্যন্ত পানি উঠে গেলো। বুঝতে পারছিলেন পানি বাড়বেই। ঝড় থামার লক্ষণ নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই গলা অব্দি উঠে গেলো পানি। তখন কেবল নিজেকে বাঁচানোর চিন্তা। টিনের চাল কোনোরকমে ফাঁকা করে ধরে বাইরে বেরিয়ে গেলেন রোমান ভাই। যাওয়ার আগে বাবা-মা কে বললেন, যেভাবেই হোক বেঁচে থাকো। ঘরের ছাউনির বাইরে যেতেই তীব্র স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়েছিলো। অন্ধকারে কেবল বুঝতে পারেন শক্তিশালী পানির থাবা তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। তলিয়ে যাচ্ছিলেন, জেগে উঠছিলেন। আবার উঠছেন। সাঁতরানোর চেষ্টা না করে স্রোতের অনুকূলে শরীর লেলিয়ে দিলেন। মাঝে মাঝেই গাছ বা শক্ত কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিলেন। ঠান্ডা পানি, প্রবল স্রোত, অন্ধকার, ভয়, সাঁতরিয়ে ক্লান্ত। এক পর্যায়ে তার কিছুই মনে ছিলো না। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
পরদিন বেলা ১১ টার দিকে তার জ্ঞান ফিরেছিলো। তখন তিনি একটি গাছের ডালে আঁটকে ছিলেন। চোখ খুলে দেখলেন নারকীয় এক দৃশ্য। চারিদিকে ধ্বংসযজ্ঞ, লন্ডভন্ড সব। বালি আর কাদায় ঢেকে আছে সবকিছু। গাছপালা সব উপুর হয়ে পড়ে ছিলো মাটিতে। মানুষের লাশ, গবাদি পশুর মৃতদেহ। চারদিকে হাহাকার। নারকীয় দৃশ্য! রোমান ভাই ধীরে ধীরে গাছ থেকে নামছিলেন। চেনা দ্বীপ তার কাছে অচেনা লাগছিলো। জন্মভূমি হয়ে গেছে মৃত্যুভূমি। আশেপাশে পড়ে ছিলো মানুষের লাশ। লোকজন খুব কম। কোথাও বা স্বজনের লাশ নিয়ে মানুষের আহাজারি। কোথাও খাবারের জন্য হাহাকার। দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। সবকিছু অচেনা ঠেকছিলো। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে নিজের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন তিনি।
বাড়িতে গিয়ে দেখলেন বাবা-মা বেঁচে আছেন, ভালো আছেন। কীভাবে বাঁচলেন সেই কাহিনি অবশ্য মনে নেই। তবে ওই বর্ণনাটুকু ছিলো দু’এক লাইনের। সন্ধ্যা নাগাদ ছোট ভাই বোনকেও জীবিত এবং সুস্থ শরীরে পেয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু ওই রাতে সম্ভবত প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো। পুরো দ্বীপ শ্মশানে পরিণত হয়েছিলো। পার্শ্ববর্তী হাতিয়া, উড়িরচর, চর কুকরিমুকরি, কুতুবদিয়া, মহেশখালি, সোনাদিয়া এসব দ্বীপেও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিলো। আঘাতটা ছিলো উপকূলজুড়ে।
একটা টিভি চ্যানেলে রিপোর্ট করার জন্য একবার কুতুবদিয়া গিয়েছিলাম; ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের বর্ষপূর্তিতে। ২০০৭ সালে, সঙ্গে ছিলেন ক্যামেরাম্যান আসাদ। এখন একুশে টিভিতে কাজ করেন তিনি। কোষ্ট নামে একটি এনজিও আমাদের নিয়ে গিয়েছিলো। বেড়িবাঁধ সংস্কার এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব নিয়ে তথ্য এবং বক্তব্য সংগ্রহ করছিলাম। হঠাৎ সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছিলো। সাগর তীরে লাল নিশান উড়ানো হয়েছিলো। তিন নম্বর সতর্ক সংকেত জারি হয়েছিলো। দেরি না করে আমরা কক্সবাজার শহরে চলে গিয়েছিলাম।
যাহোক রোমান ভাইয়ের সেই মর্মস্পর্শী বর্ণনা এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেজন্যই বলা চলে সন্দ্বীপ দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো। যা কিছুই দেখছিলাম, কল্পনায় সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনার ছবি আঁকছিলাম।  দ্বীপের পূর্ব পাশ থেকে পশ্চিমে যাচ্ছিলাম। উদ্দেশ্য রহমতপুর ঘাট। যাওয়ার পথে দেখছিলাম দুপাশে বাড়ি ঘর। নিখাঁদ গ্রাম। প্রকৃতির সুনিপুণ আধার। বাড়িগুলোর সঙ্গে একটা করে ছোট পুকুর। তাতে শাড়ি কাপড় দিয়ে বেড়া। যাতে বউ-ঝি’রা পুকুরে যেতে পারে, গোসল করতে পারে। শুধু সন্দ্বীপ নয়; বাংলাদেশের উপকূলবাসীদের মধ্যে ধর্মপালনের প্রবণতা খুব বেশি। এমনকি কোনো কোনো বাড়ির বাইরের বেড়া দেয়া হয়েছে শাড়ি কাপড় টাঙিয়ে। কোনো কোনো জলাশয়ের চারপাশে ছালা, চট, শাড়ি না হলে অন্যকোনোভাবে বেড়া দেয়া। হাউলি বেড়া, হাইচ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমার দৃষ্টি কাড়ছিলো জবা। রাস্তার দু’পাশে যত্নে কিংবা অবহেলায় বেড়ে উঠেছিলো জবা গাছের সাঁরি। জবা ফুল পড়ে ছিলো ধূসর জমিতে, ঘাস অথবা শ্যাওলার উপর। জলে ভাসছিলো ঘর ছাড়া জবা। জবার সৌভাগ্য হলো পুজোতে লাগে তাকে। ‘শুভদা’ সিনেমায় একটা গান ছিলো- লাগলাম তো কারো পূজাতে। আবার নজরুল সংগীত আছে- বলরে জবা বল/ কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল। ছোটবেলায় দেখেছিলাম, গ্রামে জিন ভূত হাজির করতে আসরে জবা ফুল লাগতো। ফকিরান্তি গানের আসরেও জবা সমাদৃত। জবার সাথে ভাব জগতের কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পায় মানুষ।
অনেকটা পথ যাওয়ার পর একটা বাজারে মোটরসাইকেল থামলো। আমি ডাব খেতে চেয়েছিলাম। ডাব পাওয়া গেলো একটা মুদি দোকানের সামনে কিন্তু দা নেই। তাহলে ডাব কেমনে খাবো। জুয়েলকে বললাম, চলেন সামনে যাই; খেতেই হবে এমন কোনো কথা নাই। মিনিট দশেক পরে আরেকটা বাজারে গিয়ে থামলো বাইক। এবার ভালো ডাবও পাওয়া গেলো, দা-ও ছিলো। পেট ভরে ডাবের পানি পান করলাম। চামচ দিয়ে নরম কচি স্তরের নারকেল! কি যে টেস্টি লাগছিলো! বোঝাতে পারব না। হয়তো খিদে বেশি লেগেছিলো বলে মজাটাও বেশি ছিলো। উপযোগও পেয়েছিলাম বেশি।
আবার ছুট। আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে পৌঁছলাম রহমতগঞ্জ ঘাটে। সেখানে তখন কোনো যাত্রীবাহী ট্রলার ছিলো না। একটা ট্রলার থেকে গরু নামানো হচ্ছিলো। আরেকটা বাল্কহেড ছিলো বালুভর্তি। কিছু ট্রলারে লম্বা গাছ দেখলাম। একটা স্লুইচ গেট ছিলো। সেটা দিয়ে বলকিয়ে পানি বাধের ভেতরে প্রবেশ করছিলো। জোয়ার চলছিলো। তাই বেড়ি বাধের বাইরে থেকে ভেতরে পানি ঢুকছিলো। জুয়েল বললো, এখানে অনেক পোলাপান মারা গেছে। কেমনে? এখানকার পানিতে পড়লে তাকে আর পাওয়া যায় না। লাশও সহজে মেলে না। স্বাভাবিক: জলঘূর্ণিতে যে কেউ পড়লে সাথে সাথে শেষ। পানির তোড়ে লাশ কোথায় ভেসে যায় কে জানে! একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা এই ঘাটের নাম কি? বললেন, রহমতগঞ্জ ঘাট। এ ঘাটে কী হয়? কী আর হবে। ট্রলারে করে গরু আসে। কাঠ আসে। মানুষজন আসে। কোত্থেকে আসে? নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া, চর কুকরিমুকরি, নোয়াখালী এইসব জায়গা থেকে। লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকেও আসে। তবে আমার কাছে সেটিকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ বা প্রচলিত ঘাট বলে মনে হলো না। সূর্য মাথার উপর থেকে পশ্চিমে অনেকটাই হেলে পড়েছিলো। আরো কিছু জায়গায় যাওয়া তখনো বাকি। দক্ষিণ দিকে রওনা হলাম। উপকূল ধরে গেলে সময় কম লাগবে সেই আশায়। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তা খারাপ। মোটর সাইকেল নিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। এরই মধ্যে একটা নিচু জায়গায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করছিলো। দৃশ্যটা দূর থেকে ভীষণ সিনেমাটিক মনে হচ্ছিলো। ভাবছিলাম কাছ থেকে জায়গাটা দেখি। কিন্তু সময় নেই। খিদে লেগেছিলো। তাই বাইক থামাতে বলিনি। আমাদের পেছনের বাইকে ছিলো ফিরোজ আর মিলটন। এরা দেখি ঠিকই বাইক থামিয়ে ওই জায়গাটার দিকে যাচ্ছিলো। জুয়েলকে বললাম, এখানে আমরা থামব না। আরো সামনে যান। আধা কিলো সামনেই আরেকটা চমৎকার জায়গা ছিলো। সাগরের পাড়জুড়ে খেঁজুর গাছ, নারকেল গাছ। গরু মহিষ চড়ছিলো। দুটো বালক কাদা পানি সেঁচে মাছ ধরছিলো। পাশেই এক কৃষক ধানের চারা থেকে কাদা ধুচ্ছিলেন। জুয়েলকে নিয়ে একবারে পানির কাছাকাছি চলে গেলাম। গাছের নিচে, ভাঙনের ভাঁজে, খাঁজে, পানির ধারে নানা ভঙ্গিতে ছবি তুললাম। সেলফি নিলাম। জুয়েলকে ফ্রেম বুঝিয়ে দিয়ে কিছু ছবি নতুন করে নিলাম। ছবি তুলে ভীষণ অন্য রকম লাগলো।
ফিরছিলাম সন্দ্বীপ শহরের দিকে। ছোট উপজেলা শহর। ভালোই জমজমাট মনে হলো। কিছু হোটেল মোটেলও আছে। শীতের প্রথম থেকেই নাকি এখানে পর্যটক আসা শুরু হয়। উপজেলা পরিষদ ভবন, থানা ভবন, স্কুল কলেজ, মার্কেট- সবমিলিয়ে বহুতল ভবন ছিলো অনেকগুলোই। জুয়েলকে বলে রেখেছিলাম আগেই। দুপুরে এমন হোটেলে খাবো যেখানে লোকজনের ভিড় কম। মাংস, পোলাও, বিরিয়ানির ধারে কাছে যাওয়া যাবে না। বাড়ি থেকে রান্না করে আনে, আবার বিক্রি শেষ হলে দোকানের ঝাপ নামিয়ে ফেলা হয় এমন হোটেলে খাবো। এমন হোটেল কেন? দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে- নামী দামি হোটেলের খাবার মজা না। সেখানকার রন্ধন প্রণালী বাড়ির রান্নার মতো না। কিন্তু ছোট হোটেলগুলোর (যাকে অনেকে ইটালিয়া, সালাদিয়া এসব নামে ডাকেন) রান্না টেস্টি হয়। একবার রাজশাহী যাওয়ার পথে তাড়াশের এক বাজারে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। বর্ষাকাল ছিলো। পাশেই খরা বা ভেশালে ধরা মাছ রান্না করে দিয়েছিলো। কি যে মজা করে খেয়েছিলাম। আরেকবার বগুড়ার সারিয়াকান্দি গিয়েছিলাম আমরা চারজন। তখনো ফিরোজ, মিলটন সঙ্গে ছিলেন। নদীর পাড়ে অস্থায়ী এক হোটেল। আমাদের সামনেই নদী থেকে ধরা চিংড়ি মাছ আনা হলো। বলা হয়েছিলো ১৫ মিনিট অপেক্ষা করেন। নদীর টাটকা চিংড়ি রেঁধে দিই। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর খেয়েছিলাম পেঁয়াজ আর ঝোলের সেই চিংড়ি মাছ। নিখাঁদ অমৃত! সোনাদিয়া দ্বীপে এক বাড়িতে খেয়েছিলাম। সেবার চ্যানেল আইয়ের কক্সবাজার প্রতিনিধি মানিক ভাই আর এক ক্যামেরাম্যান ছিলেন। মুরগীর মাংস আর লইট্টা মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম। অমৃতের স্বাদ লেগে গিয়েছিলো মুখে। আরেকটা ঘটনা না বললেই নয়। কুষ্টিয়া গিয়েছিলাম। লালনের মাজার, মীর মশাররফ হোসেনের বাড়ি আর রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি দেখে ফিরছিলাম। আমি আর ফিরোজ আলম ছিলাম মাইক্রোবাসে। পথে গোয়ালন্দ মোড়ে খিদে লেগে গেলো। সালাদিয়া হোটেলে বসলাম খেতে। চটের বেড়ার ফাঁক দিয়ে নিচের আবর্জনা দেখা যাচ্ছিলো। হোটেলের পরিবেশ ছিলো ভালোই নোংরা। চেয়ার টেবিল ময়লাযুক্ত। কিন্তু খাবার কেমন? পেছনে গিয়ে দেখলাম মাছ মাংস ছিলো। একটা টিউবওয়েলে দোকানি কচু শাক ধুচ্ছিলেন। আমাদের বললেন, একটু বসেন- কচু শাক রান্না করে দিই। ভর্তা খেয়ে মজা পাবেন। অপেক্ষার ফল যে এত মধুর হয়, আমরা কল্পনাও করিনি। সেই কচু শাকের মতো সুস্বাদু খাবার আমার জীবনে আর কখনো খাওয়া হবে কি না তুমুল সন্দেহ! এখনো আমাদের আড্ডায় সেসব কথা বার বার আসে।
জুয়েল অবশ্য যে হোটেলে নিয়ে গেলো সেখানে লোকজন অনেক। বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। মোটরসাইকেলে চলার সময় আমার পায়ে একটা কাক ইয়ে করেছিলো। দোকানের ড্রাম থেকে পানি নিয়ে সেসব ধুলাম। হাতে মুখে তখন ধুলোর আস্তরণ। টেবিলে বসলাম। খুব খিদে পেয়েছিলো ততক্ষণে। শুরুতে ভাতের সঙ্গে এলো পাতলা ডাল আর আলুভর্তা। ভর্তাটাতে ছিলো খাঁটি সরিষার তেল। ভীষণ টেস্টি। আমি আরেকবার ভর্তা আনিয়ে খেলাম। এরপর মিল্টন নিলো গরুর মাংস। আমার পছন্দ লইট্টা মাছ। মাছটাও ছিলো অনেক টেস্টি। সব শেষে ভেড়ার দুধের দই। এমন স্বাদ! কি আর কই!
ফিরতি পথ ধরছিলাম। আবার যেতে হবে ঘাটে। গুপ্তছড়া ঘাট! পনেরো থেকে কুঁড়ি মিনিটের মধ্যে বাইক আমাদের বয়ে নিয়ে গেলো সেই ঘাটে। ততক্ষণে ভরা জোয়ার। ঘাটের দক্ষিণে একটা অস্থায়ী মোকাম। গ্রামের গঞ্জ বা হাটের মতো। সেখানে কিছু ট্রলার ভেড়ানো। ট্রলার থেকে নানা ধরনের পণ্য নামানো হচ্ছে। অনেকটা ছোট বন্দরের মতো। বোঝা গেলো সন্দ্বীপের প্রায় সব রসদ এ পথ দিয়েই আসে। আমি কয়েকটা ছবি নিলাম মোবাইলে। জোয়ার ভাটার খেলা এমনি যে, ভাটার সময় এর আশেপাশে নৌকা আসতে পারবে না। শুকিয়ে যাবে চারপাশ।
নামার সময় এক হিন্দু ছেলেকে পরিচয় করিয়ে দিলো সবাই। নাম তার ফারুক। হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে। ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে সহানুভূতি চাইছিলো। কিন্তু ধর্ম নিয়ে আমার কোনো আবেগ নেই। যার যার ধর্ম তার কাছে। এটি ত্যাগ বা গ্রহণ করা নিয়ে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। মানুষই সবচে’ বড় ধর্ম।
ভাড়া চুকিয়ে হাঁটা শুরু করলাম জেটি ধরে। জেটির শেষ মাথা পর্যন্ত রিকশা বা ভ্যানে গেলে ভাড়া গুণতে হবে একশ’ টাকা। এত কেন? এই ঘাট নাকি ইজারা নেয়া। স্থানীয় নেতারা এই ভাড়া নির্ধারণ করেছেন। তাই বলে ৫ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা! আমরা হেঁটে গেলাম। ভালোই লাগলো। বিকেলের সাগর হাওয়া গায়ে লাগছিলো। ঘাটে গিয়ে স্পিডবোটের টিকিট নিলেন মিলটন। আসার সময় যে পথ দিয়ে নেমেছিলাম, সে পথ তখন পুরোটাই ঘোলা জলে ডুবে ছিলো। জেটির দক্ষিণে কিছুটা প্যারাবন পেরিয়ে বোট থামছিলো। কাদামাটি পায়ে মেখে সবাই পরি মরি করে সেদিকে ছুটছিলো। কে কার আগে বোটে উঠতে পারে। কোনো সিরিয়াল নেই। যাত্রীও অনেক। অবশ্য বোটও একটার পর একটা আসছিলো কুমিরা ঘাট থেকে।
দূর থেকে দেখছিলাম সন্দ্বীপ চ্যানেলের পূর্ব পাড়। কিছু তেলের ডিপো। বাড়িঘর, ট্রলার, ছোট জাহাজ, স্পিডবোট। ফেরার সময় ঢেউ ছিলো কম। ছোট ছোট। ২৫ মিনিটে আবারো কুমিরা। এ ঘাটে সকাল বেলা অনেক পথ হাঁটতে হয়েছিলো। বিকেলে ঠিক তার উল্টো। গাড়ির কাছে গিয়ে বোট ভিড়লো। ওদিকে যেসব বড় বড় জাহাজ দেখেছিলাম যাওয়ার সময় কাদায় আটকে ছিলো, ফেরার সময় সেগুলো দিব্যি পানিতে ভাসছিলো।
বিপ্লব বড়ুয়ার মাইক্রোবাসে ফিরছিলাম চট্টগ্রাম শহরে। পেছনে পড়ে রইলো জ্বলজ্বলে স্মৃতি। সন্দ্বীপের ধানি রঙা স্মৃতি, সবুজ চর আর বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। সন্দ্বীপ! সোনা ফলা দ্বীপ!

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top