logo
news image

উন্নত বিশ্বে জোরে হর্ন বাজানোর অর্থ গালি দেয়া

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।।
আমাদের দেশে রাস্তায় চলতে ফিরতে গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা অথবা নিজেই বাজানো একটা অতি সাধারণ ব্যাপার। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার হর্নের যন্ত্রণা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশায় বিধি বহির্ভূতভাবে নানা উচ্চ শব্দের আধুনিক হর্ন কিনে লাগানো হয় ও হরদম বাজানো হয়ে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল প্রাঙ্গণ, আবাসিক এলাকা ইত্যাদির সামনে সতর্ক বাণী লেখা থাকলেও গাড়ি চালকরা তা মানে না। অথচ সভ্য দুনিয়ায় রাস্তায় হর্ন বাজানোর অর্থ বিপদসংকেত অথবা গালি দেয়া বুঝায়। সেখানে কেউ কোন জরুরি বিপদে পড়লে হর্ন বজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কেউ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে পাশের ড্রাইভার তাকে হর্ন দিয়ে সতর্ক করে দেন। সাধারণত: এটাকে গালি দেয়া বুঝায়! উন্নত বিশ্বের রাস্তায় তাই ইচ্ছে করে কেউ হর্ন বাজায় না অথবা কারো বাজানো হর্ন শুনতে চায় না।
উন্নত দেশের হাইওয়েতে যেখানে যেমন স্পিডে গাড়ি চালনোর নির্দেশ দেয়া আছে সেখানে সেই গতিতেই চালানোর নিয়ম। কেউ কম গতিতে চালালে তাকেও হর্নের গালি খেতে হয়। একবার জাপানের রাস্তায় হাইওয়েতে তৃতীয় লেনে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। আমার পিছনের গাড়িওয়ালা হঠাৎ কড়া লম্বা হর্ন দিয়ে দ্বিতীয় ট্রাকে রং সাইডে উঠে সাঁই সাঁই করে চলে গেল। কারণ আমি নির্ধারিত গতির চেয়ে কম গতিতে গাড়ি চালানোয় সে বিরক্ত হয়ে হর্ন বাজিয়ে আমাকে ক্রস করে রং সাইড দিয়ে চলে গিয়েছিল। যাতে ট্রফিকের ক্যামেরায় তার রং সাইডে উঠে যাওয়াটা হালাল হয়ে যায়! তখন আমি জাপানের রাস্তায় নতুন চালক। তাই এ সবকিছুর অভিজ্ঞতা ছিল না। ওখানে রাস্তায় ট্রফিক মানব নেই কিন্তু রাস্তায় পাতানো ক্যামেরার মাধ্যমে নিকটস্থ ট্রফিক অফিসার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। কেউ বেশি উলোটাপাল্টা করলে ভিডিও দেখে তার মাসিক আয় থেকে জরিমানার টাকা কর্তিত হয়ে যায়। রাস্তায় নেমে ট্রাফিকজনিত অপরাধ করলেই বেতনের টাকা হাওয়া হয়ে যাবেই! তাই সচরাচর কোন চালক রাস্তায় নেমে বেপরোয়া হয়ে উঠে না বা ট্রাফিক আইন অমান্য করেন না।
আমাদের দেশে সেরকম নিয়ম যে কবে সম্ভব হবে! আমাদের দেশে বৃটিশ আমলের প্রচলিত ভিআইপি, ভিভিআইপি নামক নানা যন্ত্রণা রয়েছে। এর সাথে চাকরির জাতভেদ তথা বর্ণপ্রথার দাপুটে বিচরণ রাস্তা-ঘাটে প্রবল আপত্তির সঙ্গে লক্ষ্যণীয়। সরকারি বড় আমলাদের পতাকাবাহী গাড়ি নিয়ে রাস্তার রং সাইডে উঠে যাওয়াটা অনিয়ম হলেও সেটাকে নিয়ম বলে মেনে নেন চুনোপঁটি নিরীহ ট্রাফিকগণ। কারণ তারা বেশী বাড়াবাড়ি করলে বড়কর্তা বা অনেক সময় পাতি নেতারা বিলাস বহুল গাড়ি থেকে নেমে রেগে মেগে চড়-থাপ্পর দিতে দেরী করেন না। অনেক সময় মহারথীদের গাড়ি আটকানোর দায়ে নিরীহ ট্রাফিক বেচারার চাকরি নিয়ে টানা-হেঁচড়া শুরু হয়ে যায়। এটাকে এদেশের রাস্তায় হোমরা-চোমড়া বা দামী গাড়িওয়ালাদের নির্লজ্য মাস্তানী বললেও অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশে রাস্তায় শৃংখলা ফেরাতে সকল গাড়ির জন্য একই ধরনের গণতান্ত্রিক নিয়ম চালু থাকাটা জরুরি!
রাস্তায় ভিআইপি, ভিভিআইপির জন্য জনগণের সেবায় নিয়োজিত জরুরি লেন বন্ধ করে দেয়া, গাড়িতে উৎকট শব্দের, উদ্ভট আলোর ঝলকানি দিয়ে দামি বিলাসী গাড়ির ব্যবহার আমাদের মত গরীব দেশের জন্য বেমানান! এটা একদিকে শ্রেণিপ্রথা, গাড়িবর্ণপ্রথা, আর্থিক বিভেদ ও বৈষম্যকে হীনভাবে উপস্থাপন করে মাত্র। আমাদের দেশের আশিভাগ সম্পদ যে পনের ভাগ মানুষের হাতে কুক্ষিগত এবং মাত্র কুড়িভাগ সম্পদ যে আশিভাগ দরিদ্র মানুষের হাতে কায়ক্লেশে জীবন যাপনের উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে তার পরিসংখ্যানকে নির্দয়ভাবে উপস্থাপন করে- মানবতাকে হেয় করে মাত্র।
এছাড়া হর্নের জন্য শব্দদুষণ জনিত কারণে স্বাস্থ্যগত সমস্যার বিপর্যয় তো রয়েছেই। মোটর সাইকেল ও অবৈধ অটোরিকশা সংখ্যা বর্তমানে এতটাই বেড়ে গেছে যে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। ট্রেনিং ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই এসব যানবাহন হরদম রাস্তায় ছুটছে।
দু’দিন পূর্বে বিয়ের দাওয়াতে যাবার জন্য একজন ভিআইপি নিজেদের দাপটে জনসেবাকে উপেক্ষা করে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ফেরী ঘাটে ফেরীটি নিজের জন্য দু’ঘণ্টা আটকে রাখার ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত তিতাস নামের ছেলেটি মাঝ নদীতে ফেরিতেই মৃত্যুবরণ করেছিল। অথচ জাপানে কোন এক মন্ত্রীর জন্য মাত্র তিন মিনিট ট্রেন দেরী করে ছাড়ায় তার মন্ত্রিত্ব চলে গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে দু’ঘণ্টা ফেরি আটকানোর ফলে কোন রোগীর মৃত্যু হলেও কোন ভিআইপি-র জবাবদিহিতা নেই। মারা যাওয়া ছেলেটি ছিল স্কুল পড়ুয়া। সে কম বয়সী হলেও নিজ প্রয়োজনের তাগিদে মোটর বাইক নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়েছিল। সেটাও অভিভাবদের অগোচরে বা অসতর্কতার কারণে ঘটেছে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। সব মৃত্যুই কষ্টকর ও বেদনাদায়ক। এ মৃত্যুর প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট ৩১ জুলাই রায় দিয়েছে যে, দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ ভিভিআইপি নন। এ কথাটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনে রখে ক্ষমতার ব্যবহার করলে দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। ক্ষমতার অপব্যবহারে কোন পর্যায়ে যদি কারো সামান্য স্বার্থপরতা, অবহেলা ইত্যাদি অপরের মৃত্যুর কারণ হয়ে যায়-তাহলে সেটার ক্ষতিপূরণ বা খেসারত দেয়া খুবই কঠিন ও জটিল।
তাই আসুন অপরের কষ্টের কথা চিন্তা করে নিজেদের ভিআইপি নামক বিলাসবহুল, ক্ষমতার অপব্যবহার ও  অহমিকা কমিয়ে ফেলি। রাস্তায় নেমে গাড়িতে হর্ন বাজানোকে গালি হিসেবে মনে করে তা দেয়া ও শোনা থেকে নিবৃত্ত থাকি। একটি শব্দদূষণমুক্ত, শান্ত, ক্লান্তিহীন, পরিচ্ছন্ন যাতায়ত নিশ্চিত করতে নিজেদের গাড়িতে অহেতুক হর্ন বাজানো পরিহার করি ও অপরকে হর্ন বাজাতে নিরুৎসাহিত করি।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top