logo
news image

মেঘলা কফি হাউসের আমন্ত্রণে কিছুক্ষণ

গোলাম তোফাজ্জল কবীর মিলন, বাঘাঃ
ঐতিহ্যের স্পর্শে সমৃদ্ধ রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম দিঘা। রাজা জমিদারদের সেই জৌলুসের ধ্বংশাবশেষ এখনো রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এখানকার একজন হিন্দু জমিদারের একটি গানের ঘর যেখানে কীর্তনের আসর ও পূঁজা পার্বণে দিঘা গ্রাম যেন উৎসবের শহরে পরিনত হত। স্মৃতিময় সেই ঘর আশেপাশের জায়গা নিয়ে দিঘা গ্রামের নামেই তৎকালীন সময়ে গড়ে তোলা হয় বাজার।  
আর এ বাজারের পাশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কলেজ। এছাড়া জমিদারদের পুকুর ও সেই ভিটাতেই সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি বালিকা বিদ্যালয়।
সময়ের প্রয়োজনে প্রসার হয়েছে এক সময়ের হাটখ্যাত বাজারটি। স্কুল কলেজ ও বাজারের মানুষের উপস্থিতিতে জনারন্যে পরিণত হয়েছে বাজারটি। এক সময়ের কাঁদাবালির রাস্তা এখন কার্পেটে মোড়া। বিজ্ঞানের অবারিত ছোঁয়ায় আধুনিক সভ্যতা জানি ফিরতে শুরু করেছে এই লোকালয়ে। অজো পাঁড়াগাও হলেও এখানে আধুনিকতাকে পূর্নতা দিয়েছে একটি কফি হাউজ। নানা চা'য়ের দোকানের পাশে স্থানীয় ভোক্তাদের ভিন্নস্বাদ দিচ্ছে ‘মেঘলা কফি হাউস’। প্রাচীন এই বাজারে উপজেলার এটিই একমাত্র কফি হাউস। এর সাথে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক জুড়েও রয়েছে ছায়া সুনিবিড় প্রকৃতি ঘেরা এই কফি হাউজটির আমন্ত্রণ।  
সেই ফেসবুকের আমন্ত্রণেই ছুটে আসা সেই ‘মেঘলা কফি হাউস’-এ। পরিপাটি একটি কক্ষ জৌলুস না থাকলেও জড়িয়ে আছে আতিথেয়তা। বসতেই চটপট করে বিশেষ কাপে কফি পরিবেশন করল কিছুটা শারীরিক প্রতিবন্ধি মামুন নামের এক যুবক। দেখাগেল মামুনের পিতা আব্দুল মান্নানও শারীরিক প্রতিবন্ধি। তার একটি পা প্রায় অচল , ফলে কষ্টের কোন কাজ তিনি করতে পারেননা। ফলে এই প্রতিবন্ধিতাকে পূঁজি না করে সংসার চালাতে মান্নান একটি চায়ের দোকান দেন। এটিই তার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে কফির স্বাদের সাথে পান করছিলাম কফি হাউজ গড়ে ওঠার কাহিনীটা। মান্নানের একার পরিশ্রমে শুধু চায়ের দোকানের আয়ে চলতে চায়না তার সাত সদস্যের পরিবার । ফলে নবম শ্রেণীতে পড়া বড় ছেলে মামুনের পাঠ চুকিয়ে তাকেও কাজে লাগান দোকানে। ১৫ বছর বয়সে বাবার চায়ের দোকানের হাল ধরেই এর চেহারা বদলে ফেলে। বৃদ্ধি পায় দোকানের আয় তাতেও নিত্য প্রয়োজন মেটাতে চায়ের দোকান যেন অক্ষম। তাই প্রয়োজনের তাগিদে নতুন চিন্তা যোগ করে মামুন।
২০০৩ সালে চায়ের সাথে যোগ করেন কফি। মেয়ের নাম অনুসারে দোকানের নাম রাখেন মেঘলা কফি হাউস। গ্রামের দোকানে কফি বিষয়টি এক সময় শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও এখন মামুনের কফি হাউসের ক্রেতাদের ব্যাপক ভীড়। শুরুতে আট-দশটা কফি শপের মতোই চিনামাটি বা সিরামিকের পাত্রে কফি সরবরাহ করা হতো। তবে সম্প্রতি এতে যুক্ত হয়েছে মাটির পাত্রে হাতের তৈরি কফি সেবা। বৈশাখকে ঘিরে মা-মাটির সংস্কৃতির ছোঁয়া যেন মফস্বলের এই মেঘলা কফি হাউজে।
মামুনের ভাগ্যের চাকা যেন এখন ঘুরতে শুরু করেছে। ছনের ঘরের দোকানের পরিবর্তে হয়েছে টিনের চালা পাঁকাঘর, যোগ হয়েছে আধুনিক চেয়ার টেবিলও। ক্রেতাদের চাহিদার প্রেক্ষিতে কফির সাথে যোগ হয়েছে উন্নত মানের মিষ্টি, লাচ্ছি, দই ও কোমল পানীয়। বিভিন্ন ঔষধ ও মোবাইল কোম্পানির প্রতিনিধি, শিক্ষক, ছাত্র, ব্যবসায়ী, চিকিৎসকসহ অনেক দূর দুরান্তের মানুষরা এখন মেঘলা কফি হাউজের নিয়মিত ক্রেতা। কফি পোড়া গন্ধের আভিজাত্যে তারা জড়িয়ে ফেলেছেন নিজেদের।
এক সময়ের চা বিক্রেতা ও বর্তমানে মেঘলা কফি হাউজের মালিক মামুন অনেকটা গর্বেই বললেন , দোকানের আয়ে তিনি বাড়িতে তিন রুম বিশিষ্ট পাঁকা ঘর করেছেন। দোকানের আয়ে চলছে রাজশাহী কলেজের সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছোট ভাই রিপনের পড়াশোনা। ছোট বোন সাথীও এখন স্থানীয় কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। মেয়ে মেঘলা এখন তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্রী। সংসারের সবার চাহিদা মিটিয়ে দোকানের আয়ে সুখেই আছে মামুন ও তার পরিবার।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে পূঁজি করে অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে সঠিক চিন্তা সিন্ধান্ত মানুষকে সাফল্য এনে দিতে পারে মামুন যেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আপনিও এসে দেখে যেতে পারেন সাফল্যে ঘেরা এই বাণিজ্যালয়টি আর কফির পোড়া গন্ধ্যে ঝাঁঝিয়ে নিতে পারেন নিজের চিন্তাকে, এমনকি যোগাযোগ করতে পারেন মেঘলা কফি হাউজের   www.facebook.com/meghla.coffee ফেসবুক আইডিতে এমনই আবেদন মামুনের।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top