logo
news image

একজন সংগ্রামী মানুষ মিঠু

নিজস্ব প্রতিবেদক।  ।  
একজন কিশোর স্বপ্ন দেখতো সুন্দর একটি সমাজের। যেখানে থাকবে না সন্ত্রাস-মাদক, অন্যায়-অবিচার, থাকবে না দারিদ্র্যের অভিশাপ। এই কিশোর ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য কবিতা লেখা শুরু করে। সবুজের মাঠ নামের সেই কবিতাটি অাজও প্রকাশিত হয়নি, নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক দুর্জয় বাংলা পত্রিকায় 'জয়-পরাজয়' কবিতা প্রকাশ হয়। স্কুলের পড়ালেখা আর গান, কবিতা ও গল্প লেখা যেন তার নেশা। সেই থেকে গল্প, কবিতা, গান ও সমসাময়িক বিষয়ে ছোটখাটো পত্রিকায় কলাম লেখা চলছেই।
কিশোর কবির কাছে মনে হয়েছিল শুরু কবিতা-গল্প-গান লিখে সমাজের পরিবর্তন কি সম্ভব? রাজপথের লড়াই দরকার। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র অবস্থায় কিশোর কবি ১৯৯৫ সালে চর ও ড্যাগার মানুষের মারামারি ও দ্বন্দ্ব নিরসনে থানা ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। দশম শ্রেণীতে এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিবর্তনের প্রতিবাদে আন্দোলন করেন। ১৯৯৮ সালে শ্রীসুন্দরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অর্জন করেন।
পিতা এ কে এম আব্দুল মতিন রামানন্দপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক।  ছয় সদস্যের পরিবারের তিনিই প্রথম সন্তান। বাবা টিউশনি করে সংসার চালাতেন, ১৯৯১-৯২ সাল থেকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে বেতন পেতে থাকেন। তরুন কবির ছাত্র অবস্থায় পরিবারের অভাব মেটাতে ও পড়াশোনার খরচ চালতে আখ মাড়াই কলে কাজ করেছেন ক্ষুধার জ্বালায়। এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করেও সময়মত কলেজে ভর্তি হবার ফিস জোগাড় করতে না পেরে অবশেষে খালা-মামা-চাচাদের কাছে  নির্লজ্জের মত হাত পেতেছেন।  তার সেজো কাকা মামুনের সহযোগিতায় কলেজে ভর্তি হন।  প্রায় আট মাস পরে একটি দুটি করে বইপত্র কিনে টিউশনি করে লেখাপড়া চলিয়েছেন। তিনি বন্ধুদের বলতেন পড়শুনা ও জীবনে এগিয়ে চলার জন্য যে কোন কাজ করতে প্রস্তুত। একজন বন্ধু বলেছিল- করে দেখা! ইন্টারমেডিয়েট ফাষ্ট ইয়ার পড়াকালে প্রায় ছয় মাস সেলুনে নাপিতের কাজও করেছেন। ২০০০ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় যখন নকলের উৎসব চলছে, তখন আদর্শবান শিক্ষক পিতার অনুরোধে নকলের আশ্রয় নেন নি, ৬১০ মার্কস পেয়েও তিনি ফেল করলেন, কারণ অবশ্য দুটি- ১) মাছের বাজারের মত হলের পরিবেশে মুখস্থ পড়া ভুলে যাওয়া ও ২) প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেলে হতাশায় ভুগা। ইংরেজি ১ম পত্রে মাত্র ২ মার্কস কম পাওয়ায় ফেল করলেন।
হতাশ কবি নতুন করে স্বপ্ন দেখেন নতুন কিছু করবেন বলে, তাই গ্রামের মহিলাদের নিয়ে চানাচুর তৈরির কারখানা করলেন। বেশ ভালো চলতো চানাচুরের ব্যবসা। কিন্তু স্বল্প পুঁজির ব্যবসায় বেশি দিন টিকে থাকা গেল না। সাইকেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে পুরাতন কাগজ কিনে তিন ভাই ঠোংগা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন। খালাত ভাই সুজনের সাথে ঢাকা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে বেশ কিছু দিন কাজ করতে থাকেন, কিন্তু জন্ডিস আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা।  পুনরায় লেখাপড়ায় মনোযোগ দিলেন, কিন্তু পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকা পাবেন কোথায়?  মামাতো ভাই মোয়াজ্জেম অর্থ সহযোগিতায় ফরম ফিলাপ হলো। ২০০৩ এইচএসসি পাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাডমিশন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এ সময় বাবা নাটোর পিটিআই তে ট্রেনিং করা অবস্থায় স্ট্রোক করেন।  বাবাকে নিয়ে ডাক্তারদের কাছে দৌড়াদৌড়ি ও সংসারের চিন্তায় এ্যাডমিশন দেওয়া হলো না।  সিদ্ধান্ত নিলেন আর পড়ালেখা করবেন না, অন্যকিছু করতে হবে। এ সময়ে প্রতিবেশি ও বাবার ছাত্র মোহরকয়া ডিগ্রী কলেজের গণিতের শিক্ষক রেজাউল করিমের (রাজ আলী) সহযোগিতায় তিন বছরের নতুন  বিএ কোর্সে ভর্তি হলেন।  এ ব্যাচে মাত্র ১১ জন ছাত্রের মধ্যে তিনি ২য় বিভাগে বিএ পাশ করেন। এরপর ঢাকা মহানগর ল'কলেজ হতে এলএলবি পাশ করেন।
তার মাথায় শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির চিন্তা সব সময় উদ্বেলিত করতো, তাই কলেজ পড়া অবস্থায় লালপুর কলেজে বহিরাগতদের প্রবেশ-মাদক গ্রহন ও ছাত্রীদের উত্যক্ত করার প্রতিবাদে ছাত্র ও শিক্ষকদের মাঝে ঐক্য গড়ে তুলে প্রতিরোধের ব্যবস্থা, ছাত্রদের সাইকেল চুরির প্রতিবাদে কলেজ মোড়ে দুই ঘন্টা রাস্তা অবরোধ ও সাইকেল সেড নির্মাণ করতে বাধ্য করেন। লালপুর কলেজকে ডিগ্রী কলেজ করনের আন্দোলনে যোগদান ও সমসাময়িক সময়ে ক্ষমতাশীল পাার্টি আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ যোগদান। ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ পযর্ন্ত আওয়ামী-বিএনপির দিয়ে মানবমুক্তির সমাজ গড়া সম্ভব নয় বলে উপলব্ধি হলো।
২০০৫ এ পাশের গ্রামের চাচা কমরেড় মুজাহার আলীর নিকট মার্ক্সবাদী রাজনীতির হাতেখড়ি বা অনুশীলন শুরু হয়। তিনি স্বল্প শিক্ষিত, তবে প্রচুরসংখ্যক মার্কসবাদী গ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন ও নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন, অথচ কর্মজীবনে ছিলেন চাল কলের শ্রমিক।  ৭৯ বছরের শেষ জীবনে লালপুর বাজারের ফুটপাতের একজন পুরাতন কাপড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি ইট ভাটার শ্রমিকদের অধিকার সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে ইটভাটা শ্রমিক আব্দুল মালেকের সহযোগিতায় জোতদৈবকী শিব ও কালি মন্দির সংলগ্ন সমাজ কল্যাণ ভবনে প্রায় প্রতিদিন রাতে কিছু শ্রমজীবী মানুষ নিয়ে গঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি মিঠুকে তার কাজে যুক্ত করেন। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সচেতন করার পাশাপাশি ১০/১২ জন  ছাত্র নিয়ে ছাত্র ফেডারেশনে কাজ তথা মার্ক্স অনুশীলন করতে থাকেন। ২০০৫ এর জুন সমমনা লেখালেখি করেন এমন ৭/৮ জন তরুন নিয়ে সৃষ্টি সাহিত্য সংস্কৃতি  সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছিল।  দন্তাস্য বর্ণ মিল করে নামকরণ করেছিল আরিফুল ইসলাম পলাশ, তিনি এখন অর্থনীতিতে পড়া শেষ করে প্রাইম লাইফ ইনসুরেন্স কোম্পানী লিঃ এর একজন সিনিয়র আইটি অফিসার, সম্পাদক ছিলেন কবি সরোয়ার জাহান মানিক, তিনি এখন ছাত্রলীগ নেতা, তবে কবি হিসেবে বেশ পরিচিত। সহ- সভাপতি ছিলেন জিল্লুর রহমান রাজু, তিনি খুব ভালো কবিতা লিখতেন, সংসারের চাহিদা মেটাত গুড়ের ব্যবসা করেন, কবিতা লেখা আর হয়ে ওঠে না। শামীম আহামেদ বিএ পাশ করে বাবা ইলেট্রিক্যাল ব্যবসাটা দেখাশুনো করেন, আজিজুল শিকদার ঢাকায় কোন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকুরি করেন, সবাই তাকে কবি মর্তপথিক নামে চিনত। রাজ নামের  বয়সে ছোট একটি ছেলে ঢাকায় পড়তে গিয়ে নগরের ব্যস্ততায় ঢাকা পড়ে গেছে হয়ত। আর গণমানুষের মুক্তির শপথে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা তরুণ যিনি কিশোর ছাত্রজীবনে চাকরি করবেন, শুধু মানবমুক্তির ব্রত নিয়ে কাজ করে যাবেন, তিনি মনজুর রহমান মিঠু ২০০৬ একমাত্র সংসারের উপার্জনক্ষম পিতার মৃত্যুর পরে সংসারের প্রয়োজনে ডিগ্রি ২য় বর্ষের ছাত্র থাকা কালে শাহরিমা খাতুন ছন্দার সাথে ১৯ মে ২০০৬ বিবাহ করেন। তার স্ত্রী বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের সহকারী শিক্ষক। ২০০৯ এর ১১ জানুয়ারি কন্যা সন্তান মাহিন্তী রহমানের জন্ম হয়। সে এখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। বাবার মত সেও কবিতা লেখে ও আবৃত্তি করে। তবুও সংগ্রাম থেকে যায় নি।  
টিউশনি ও পড়াশুনা পাশাপাশি বাবার মৃত্যুর পরে লালপুর শিল্প ও বণিক সমিতিতে খন্ডকালীন চাকুরি। ২০০৭-০৮ সেনা সমর্থিত সরকার ফকরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনের সময় প্রায় দেড় বছর ঢাকার একটি বিজ্ঞাপনি সংস্থায় পার্ট টাইম কাজ করেন। ২০০৮-এর মাঝামাঝি সময়ে কমরেড মুজাহার আলীর সাথে নাটোর জেলা সাম্যবাদী দলে যোগদান করেন। প্রথমে বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন লালপুর থানা শাখার আহবায়ক, এরপর লালপুর থানা কমিটি, নাটোর সদর কমিটি, এনএস কলেজ কমিটি গঠন করে জেলা সম্মেলনের মাধ্যমে নাটোর জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সময়ে লালপুরে বাসষ্ট্যান্ড স্থাপন, শহীদ মিনার সংস্কার ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, বাজারের ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার ও বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগের দাবিতে আন্দোলন করেন। ২০০৯-এ ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, পরের বছর যুগ্ন সাধারন সম্পাদক, তারপর সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময়ে ২০০৯ এর ফ্রেব্রুয়ারিতে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্য পুস্তকের দাবিতে ঢাবি ক্যাম্পাসে মিছিল, সন্ত্রাস বিরোধী ছয় ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মিছিল ও সমাবেশ এবং মধুর কেন্টিনে নিয়মিত রাজনৈতিক চর্চা ও চলমান আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহন করতে থাকেন। পার্টির নিয়মতি কর্মসূচী-যেমন ভাষা সংগ্রামী কমরেড় তোয়াহা র স্মরণ সভা, মহান মে দিবস, জাতীয় দিবস সমূহ, পার্টির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও সমাবেশ, হোটেল সোনারগাঁও এবং শেরাটনে চীন প্রতিনিধির সাথে কনফারেন্স ও চীন বিপ্লব বার্ষিকী উদযাপন। সর্বশেষ শাহবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরন মঞ্চের আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন। ২০১৩-২০১৫ সভাপতির দায়িত্ব পালন শেষে আবার গ্রামে ফিরে আসা। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির জেলা আহবায়ক এর দায়িত্বে আছেন।
সামাজিক কাজে অবদানঃ  মনজুর রহমান মিঠু ২০০২ সালে লালপুর পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন, মুক্তিযোদ্ধা আদম আলী শিক্ষা বৃত্তি, ছাত্র কল্যাণ তহবিল, একুশে বইমেলা আয়োজন, প্রাকীর্তি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা, ঢুশপাড়া যুব সংঘ গঠনে সহযোগিতা, লালপুর বার্তার উপদেষ্টা, পদ্মার চরে আলোর দরজা শিশুবিদ্যানিকেতন প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভুমিকা পালন ও চরাঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করেছেন।কিশোরী  চুমকি ও মেধাবী ছাত্র জালাল হত্যার বিচারের দাবিতে সভা-সমাবেশ ও শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল স্যারের উপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন। ২০১৫ এর জুন হতে অদ্যাবধি মৃত্তিকা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেন (এমসিডিও) শীতবস্ত্র বিতরন, বৃক্ষরোপন, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক, চরাঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস প্রদান, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বিরোধী উঠান বৈঠক, টেকসই উন্নয়ন সভা এবং নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে আলোচনা সভা ও হতদরিদ্রদের আর্থিক উন্নয়নে করনীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা করেছেন।   এই কবি, কলাম লেখক, রাজনৈতিক কর্মী শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে আজও বিভিন্ন রকম আন্দোলন - সংগ্রামে নিয়োজিত নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Blog single photo
March 16, 2019

Shibli sayeed Simul

আপনার জীবনী পড়ে ভালো লাগলো এবং আপনার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে গেলো,ভালোবাসা এবং শুভকাম। আপনার স্বপ্ন পূরণ হবে নিশ্চয় একদিন ভাই।

(0) Reply
Blog single photo
March 21, 2019

u genious......u beauty....I salute u boss

(0) Reply
Top