logo
news image

পলান সরকারের শৈশব কাটে তাঁর নিজ বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়ায়

মো. মঞ্জুরুল আলম মাসুম, বাগাতিপাড়াঃ
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের অশিক্ষার অন্ধকারের উজ্জ্বল প্রদীপ হয়ে উঠা একুশে পদকপ্রাপ্ত বইপ্রেমী পলান সরকারের শৈশব কাটে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায়। পলান সরকার ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা সন ১৩২৯) নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার নূরপুর মালঞ্চি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে তাঁর বাবা হায়াত উল্লাহ সরকার মৃত্যুবরণ করেন। এরপর চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া শেষে মায়ের সাথে নানার বাড়ি রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামে চলে যান তিনি। পলান সরকারের দাদার নাম ছমির সরকার। তাঁদের অন্য বংশ ধরেরা এখনও বাগাতিপাড়ার নূরপুর মালঞ্চি গ্রামেই বসবাস করেন। পলান সরকারের নিজের চাচাত ভাইয়ের ছেলে অধ্যক্ষ মামুনূর রশীদ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, বাবা হারা পলান সরকারের শৈশব বাগাতিপাড়ার নূরপুর মালঞ্চি গ্রামেই কেটেছে। নূরপুর মালঞ্চি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পলান সরকারের হাতে খড়ি। সেখানে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর অর্থনৈতিক সংকটে লেখাপড়া বন্ধ করে দেন। এরপর তাঁর নানা ময়েন উদ্দিন সরকার মা মইফুন নেসাসহ পলান সরকারকে রাজশাহীর বাঘার উপজেলার বাউসা গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তিনি একটি স্কুলে ভর্তি হন যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। তাঁর বাবা-মা নাম রেখেছিলেন হারেজ উদ্দিন সরকার। তবে জন্মের পর থেকেই মা “পলান” নামে ডাকতেন। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে পলান সরকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন। কিন্তু বই পড়ার অভ্যাস থেকে যায় আজীবন।

কর্মজীবনঃ  নানা ময়েন উদ্দিন সরকার ছিলেন স্থানীয় ছোট জমিদার। যৌবনে পলান সরকার নানার জমিদারির খাজনা আদায় করতেন এবং দেশ বিভাগের পর জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলে ১৯৬২ সালে বাউসা ইউনিয়নে কর আদায়কারীর চাকরি পান। নানার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৪০ বিঘা সম্পত্তির মালিক হন। ব্রিটিশ আমলেই তিনি যাত্রাদলে যোগ দিয়েছিলেন। ভাঁড়ের চরিত্রে অভিনয় করতেন। তিনিই আবার যাত্রার পা-ুলিপি হাতে লিখে কপি করতেন। অন্যদিকে মঞ্চের পেছন থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংলাপ বলে দিতেন। এভাবেই বই পড়ার নেশা জাগ্রত হয়। দীর্ঘদিন ধরে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৬৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় ৫২ শতাংশ জমি দান করার পর প্রচারবিমুখ পলান সরকার স্থানীয়দের অনুরোধেই চেয়ারম্যান পদে আসীন হন।

বই বিতরণঃ ১৯৯০ সাল থেকে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিবছর যারা মেধাতালিকায় প্রথম দশটি স্থান অর্জন করত তাদের বই উপহার দিতেন পলান সরকার। এরপর অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও তাঁর কাছে বইয়ের আবদার করলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তাদেরও বই দিবেন তবে তা ফেরত দিতে হবে। এরপর গ্রামের মানুষ ও তাঁর কাছে বই চাইতে শুরু করে। এভাবেই শুরু হয বই পড়া আন্দোলনের ভিত। ১৯৯২ সালে ডায়াবেটিকসে আক্রান্ত হওয়ায় পলান সরকারকে হাঁটার অভ্যাস করতে হয়। তখনই তাঁর মাথায় এক অভিনব চিন্তা আসে। তিনি স্কুলকেন্দ্রিক বই বিতরণের প্রথা ভেঙে বাড়িতে বাড়িতে বই পৌঁছে দেয়া এবং ফেরত
নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি তিনি বইও উপহার দেন। এছাড়া যারা তাঁর বাউসা বাজারে থাকা চালকলে দেনা পরিশোধ করে তাদেরও তিনি বই উপহার দেন। তাঁর কর্মকা- সমাজে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এলাকার চায়ের দোকানী পর্যন্ত হয়ে ওঠে বই পাগল, প্রতি বিকালে তার দোকানে বসে বই পড়ার আসর। ২০০৯ সালে রাজশাহী জেলা পরিষদ তাঁর বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে।

অর্জন ও সম্মাননাঃ প্রথমে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষই জানত পলান সরকারের এই অসামান্য শিক্ষা আন্দোলনের গল্প। ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিটিভি নামক রাষ্ট্রীয় চ্যানেলের ইত্যাদি নামক জনপ্রিয অনুষ্ঠানে তাঁকে আলোকিত মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে পলান সরকারের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তিনি ২০১১ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তাঁর উপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার জীবনের ছায়া অবলম্বনে বিটিভির জন্য গোলাম সারোয়ার দোদুল নির্মাণ করেন ঈদের নাটক 'অবদান'। বিনামূল্যে বই বিতরণ করে সকলের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টির করার জন্য ইউনিলিভার বাংলাদেশ পলান সরকারকে 'সাদা মনের মানুষ' খেতাবে ভূষিত করে।
অবশেষে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামের বাড়িতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে শুক্রবার (১ মার্চ) দুপুরে পরপারে পাড়ি জমান এই আলোকিত মানুষ পলান সরকার।

সাম্প্রতিক মন্তব্য