logo
news image

বিজ্ঞান গবেষকদের পুনর্মিলনী

মোহাম্মদ আব্দুল বাছিত।  ।  
ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের কাছ থেকে একটি টেলিফোন কল এসেছিল। কুশলাদি বিনিময়ের পর অধ্যাপক মাহবুব জানালেন, ১২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ‘পলিমার কোলাইডস অ্যান্ড ন্যানোমাটেরিয়ালস গ্রুপ’ প্রথমবারের মতো প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী ও সায়েন্টিফিক মিটিং এর আয়োজন করেছে। ওই অনুষ্ঠানে আমাকে ন্যানোম্যাটেরিয়ালস এর উপর একটি বক্তৃতা দিতে হবে।
উল্লেখ্য যে আজ থেকে কুড়ি বছর  আগে ‘পলিমার কোলাইডস অ্যান্ড ন্যানোমাটেরিয়ালস’ গ্রুপটি প্রফেসর ড. হাসান আহমদের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল। এই ধরনের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠান শুনলে স্বভাবতই চোখের সামনে ভেসে উঠে টি-শার্ট আর টুপি পরিহিত বিভিন্ন বয়সের কিছু মানুষ, একটি র‍্যালি, পায়রা ওড়ানো, খাওয়া দাওয়া আর স্মৃতিচারণ। অথচ ড. মাহবুব বলছেন, এই রিইউনিয়ন শুরু হবে একটি সায়েন্টিফিক মিটিং এর মাধ্যমে। সেখানে ইনভাইটেড স্পিকার পদার্থ বিজ্ঞানের একজন তরুণ গবেষক। মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, আমি সেখানে যাবো। এটি হবে নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী রিইউনিয়ন, হয়তো বাংলাদেশের অ্যাকাডেমিক ইতিহাসের একটি মাইলফলক। ইতিহাসের একটি অংশ হতে পারলে কার না ভালো লাগে।  এই ধরনের অ্যালামনাই রিইউনিয়ন গবেষণা ফান্ড, হার্ডশিপ ফান্ড তৈরি থেকে শুরু করে অনেক ইতিবাচক কাজের সূচনা করে দিতে পারে।  সর্বোপরি গ্রুপের বর্তমান তরুণ সদস্যদেরকে গবেষণায় বিশেষ উৎসাহ প্রদান করবে নিঃসন্দেহে। এই মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হয়।
২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে বুয়েটের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে আমরা আয়োজন করেছিলাম International Conference on Nanotechnology and Condensed Matter Physics।  ওই কনফারেন্সের জন্য ইনভাইটেড স্পিকার সার্চ করতে গিয়ে আমি ওয়েবসাইটে প্রফেসর ড. হাসান আহমদের গবেষণার সাথে পরিচিত হই। তাকে আমাদের কনফারেন্সে আমন্ত্রণ করি, তিনি তার গ্রুপের কয়েকজন গবেষকসহ আমাদের কনফারেন্সে যোগ দেন।  ওই গ্রুপের সদস্যদের সরব উপস্থিতি, ভিন্ন ভিন্ন গবেষণাপত্র উপস্থাপন আমাদের কনফারেন্সের মান অনেকখানি বৃদ্ধি করেছিল।
কল্পনা করি আজ থেকে বিশ বছর পূর্বে যখন গবেষণার জন্য কোনও ফান্ড ছিল না, দেশে ভালো মানের কোনও যন্ত্রপাতি ছিল না, জার্নাল ছিল না, নিয়মিত কনফারেন্স, সেমিনার সিম্পজিয়াম অনুষ্ঠিত হতো না- সেই সময়ে একজন স্বপ্নবাজ মানুষ একটি গবেষণা গ্রুপের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিলেন। কতখানি সাহস, দৃঢ় সংকল্প আর দেশপ্রেম থাকলে বাংলাদেশে একজন মানুষ দীর্ঘ বিশ বছর গবেষণা কর্ম চালিয়ে যেতে পারেন!  এই গ্রুপ থেকে নিয়মিত পিয়ার রিভিউড ‘আইএসআই’ জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ হচ্ছে, বিশ্বের গবেষণা মানচিত্রে বাংলাদেশও স্থান করে নিচ্ছে।  যতদূর শুনেছি ওই গ্রুপ থেকে এই পর্যন্ত তেষট্টি জন ছাত্র এমএসসি, এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গ্রুপের এগারো জন গবেষক ইতিমধ্যে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। গ্রুপ সদস্যদের বেশিরভাগই দেশে বিদেশে সুনামের সাথে শিক্ষকতা, গবেষণাসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির সায়েন্টিফিক মিটিং এ গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে আমেরিকা থেকে এসেছেন গ্রুপের প্রাক্তন গবেষক ড. সাহিনুর রাহমান। তিনি বর্তমানে রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে EMD Performance Materials Corp (Merck) এর মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক ড. মোতাহার, ড. রবিউল এবং ড. আশরাফুলের গবেষণায় হাতেখড়ি এই গ্রুপে প্রফেসর হাসানের তত্ত্বাবধানে। অনেক সময় যা হয় একটি গ্রুপের প্রধান গবেষক অবসর নিলে গ্রুপের সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে প্রফেসর হাসান অনেক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।  গ্রুপটি টিকিয়ে রাখার জন্য  তিনি ড. মাহবুব, ড. মোতাহার, ড. রবিউল, ড. আশরাফের মতো আরও কয়েকজন যোগ্য উত্তরসূরী গড়ে তুলেছেন। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই গ্রুপ আরও অনেক অনেক বছর দেশের গবেষণায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। উন্নত দেশগুলির ল্যাবরেটরিতে একজন গ্রুপ লিডারের সাথে সবসময় বিভিন্ন বয়সের দুই তিন-জন সহযোগী গবেষক থাকেন, গ্রুপ লিডারের অবর্তমানে তারা গ্রুপের হাল ধরেন। আধুনিক গবেষণায়, বিশেষ করে ব্যবহারিক (এক্সপেরিমেন্টাল) গবেষণা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন গবেষণা ক্ষেত্রে এক্সপার্টাইজের প্রয়োজন হয়। গ্রুপে কাছাকাছি গবেষণা ক্ষেত্রের একাধিক অভিজ্ঞ সদস্য থাকলে বিভিন্ন রকমের আইডিয়া যেমন শেয়ার  করা যায় ঠিক তেমনভাবে বিভিন্ন গাণিতিক, তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক সমস্যার সমাধানে বিশেষ সুবিধা হয়।
প্রফেসর হাসানের গ্রুপের কয়েকজন খুব নবীন সদস্যের সাথে আমার আলাপ হয়। তাদের দুই তিনজন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে সদ্য যোগ দিয়েছেন। ভালো মানের গবেষণার প্রতি তাদের উৎসাহ এবং উদ্দীপনা দেখে আমি মুগ্ধ। নিঃসন্দেহে এই উৎসাহ উদ্দীপনার বীজ বপন করেছেন প্রফেসর হাসান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের অনেক মানুষের ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ক্লাস করানোই একজন শিক্ষকের কাজ। অনেকে সঠিকভাবে ক্লাস নেন, অনেকে নেন না। তারা মনে করেন যে, শিক্ষকদের একটি অংশ রাজনীতি নিয়ে থাকেন, বিভিন্ন পদ-পদবীর লোভ তাদেরকে গ্রাস করে এবং ওইভাবেই শিক্ষকতা জীবন অতিবাহিত করেন। দুঃখজনক হলেও বলতে হয় এই ধারণাটি একদম ভুল নয়। কিন্তু অনেকের যা অজানা তা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক এখনো পড়ানোর পাশাপাশি জ্ঞান সৃষ্টিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এর সুফল দুই এক কথায় বুঝানো যাবে না। এই রকম একজন শিক্ষক গবেষকের সান্নিধ্যে থেকে অনেক ছাত্রের জীবন দর্শন পরিবর্তন হয়ে যায়। বাস্তবতা স্বীকার করে বলতে হয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এখনো পড়াশোনা এবং গবেষণা ক্ষেত্রে উন্নত সংস্কৃতি গড়ে উঠে নাই।
এহেন অবস্থায় একজন ছাত্র হতাশায় বিষাদগ্রস্ত হতে পারে, তার চারিত্রিক স্খলন হতে পারে, মাদকাসক্ত হতে পারে। ছাত্ররা যদি একটি ভালো গ্রুপের সংস্পর্শে থাকে তখন স্বভাবতই ক্লাসের পড়াশোনার বাইরের সময়টুকু তারা একটি ক্রিয়েটিভ কাজে ব্যয় করার সুযোগ পায়। গ্রুপের কোনও সদস্য গবেষণায় ভালো ফলাফল পেলে বাকি সদস্যরা এক ধরনের পিয়ার প্রেসার অনুভব করে, অন্য গ্রুপের সদস্যরাও একই ভাবে পিয়ার প্রেসার অনুভব করে। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো মানের গবেষণার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়। সুতরাং একজন অধ্যাপক যিনি গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত থাকেন, যিনি একটি গবেষণা গ্রুপের নেতৃত্ব দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবদান বহুমাত্রিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় অসুস্থ রাজনীতির বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়া থেকে পরিত্রাণের জন্য গবেষণার উন্নত সংস্কৃতি লালন এবং গবেষকদের গবেষণায় মনোনিবেশ হতে পারে একটি কার্যকরী উপায়।
দীর্ঘ সময় ধরে আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি তারা এক বাক্যে স্বীকার করবো যে, আমাদের দেশের মেধাবী ছাত্ররা গত  দুই তিন যুগ সময় থেকে মৌলিক বিজ্ঞান পড়াশুনার আগ্রহ ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে। মৌলিক বিজ্ঞানে মেধাবীরা না আসলে জ্ঞান বিজ্ঞানের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমাদের কোন অংশগ্রহণই থাকবে না, অদূর ভবিষ্যতে এক ধরণের বিপর্যয় নেমে আসবে। অবনতির গ্রাফ ত্রিশ-চল্লিশ বছর থেকে ক্রমশ নিম্নমুখি হলে স্বভাবতই কোনও এক সময় উন্নতির প্রচেষ্টা শুরু হলেও তা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে আরও ত্রিশ-চল্লিশ বছর সময় লাগবে। এই বিষয়টিকে আমরা মোটেও গুরুত্বের সাথে নিচ্ছি না। কার্যকরী প্রদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এর ভয়াবহ পরিণাম পর্যবেক্ষণের জন্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না।
প্রফেসর হাসানের মতো স্রোতের বিপরীতে চলা অধ্যাপক গবেষকদের উন্নত মানের গবেষণা পরিচালনার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ, গবেষণা ফান্ড, অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদান করা প্রয়োজন। ষোল কোটি মানুষের দেশের খুব অল্প সংখ্যক ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। তার মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু ছাত্র গবেষণা করার সুযোগ পায়। এই মুষ্টিমেয় ছাত্রকে সার্বিকভাবে তত্ত্বাবধান করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা গ্রুপগুলিকে সমস্ত সহায়তা  দেওয়া অপরিহার্য।  বিভাগের এবং বিভাগের বাইরের সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং অনুপ্রেরণা, প্রশাসনের অন্তরিকতা পেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রফেসর হাসানের গ্রুপের মতো অনেক গবেষণা গ্রুপ গড়ে উঠবে। আপাত দৃষ্টিতে এইসব গবেষণা গ্রুপের কর্মের সুফল হয়তো দেখা যাবে না, সহজে উপলব্ধি করা যাবে না, তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল হবে কল্পনাতীত।
* মোহাম্মদ আব্দুল বাছিত: অধ্যাপক

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top