logo
news image

বাঘা নামচা

জুলফিকার আলি মাণিক।  ।
বাঘা নামচা-১
"বাঘা" নামটা মনে ধরেছে। রাজশাহী জেলার একটি উপজেলা। নামকরণ নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে, যার মধ্যে মজার হলো- বহু শত বছর আগে বাঘের নিরাপদ বিচরণ ক্ষেত্র ছিল এই জনপদ। বাঘ নিয়ে তাই গল্পের শেষ নেই। ছিল ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে ছয়-সাতশ' বছর আগে ভিন দেশ থেকে আসা মানুষদের নিয়ে নানা গল্প। তেমনই এক প্রচলিত গল্প বললেন একজন-- হা করে দাড়িয়ে থাকা অনেক বাঘ দেখে বিশেষ কারও বলে ওঠা "বাঘ হা" থেকে পরে বাঘা নাম হয়েছে। অল্প সময়ে নামকরণের রহস্যভেদ অসম্ভব, তবে প্রচলিত মজার গল্পগুলো স্থানীয়দের কাছে শুনতে দারুণ লাগে। পদ্মা নদী ঘেসে গড়ে ওঠা জনপদ বাঘা। ঢাকার বাইরে গেলেই কাঠ পুড়িয়ে বানানো গরুর দুধের চা খুঁজি। কিন্তু পাওয়া দুস্কর। সব জায়গায় সিলিন্ডার গ্যাসের চুলা, আর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর 'কনডেন্সড মিল্কের" চা। বাঘা নেমে ভাবলাম গন্তব্যে যাবার আগে চা খাই। কাছের ছাপড়া খাবার হোটেলে উল্টো করে জিজ্ঞেস করলাম-- কৌটার দুধ অর্থাৎ কনডেন্সড মিল্কের চা আছে? ওমা, এবার ঘটলোও উল্টো। আমার কল্পনার বাইরে লোকটি বললেন, বাঘায় কোথাও কন্ডেন্সড মিল্কের চা বিক্রি হয়না, সব জায়গায় শুধু গরুর দুধের চা।তার ওপর আবার কাঠের লাকড়ি পুড়িয়ে চা হয়, রান্না হয় বাঘা জুড়ে। মুখে উল্টোটা বলায় মনের গভীড়ে লুকিয়ে রাখা চাওয়াটা পেয়ে মনে আন্ন্দ আর ধরে না। তাই বাঘায় চায়ের ওপরেই বাস। এখানে বিচিত্র ইতিহাসের সমাবেশ, তাই বৈচিত্রময় শোনা গল্পের অভাব নেই। বাঘায় প্রায় পাঁচশ বছরের পুরোনো মসজিদ সত্যিই দেখবার মত একটি নির্মাণ শৈলী।
বাঘা নামচা-২
“মাটিতে নয়, বটগাছের গায়ে খেজুর গাছের জন্ম!” এই নিয়ে বিস্ময় আর গল্পের শেষ নেই রাজশাহীর বাঘায়। এমনিতেই বট গাছ নিয়ে কতো যে কল্প-কাহিনী শুনে বেড়ে উঠেছি। এবার বাঘায় একদম নতুন গল্প, তবে জলজ্যান্ত দৃষ্টান্তসহ। সাবার মুখে মুখে এই গাছের কথা। এক বিস্ময়কর দর্শনীয় বৃক্ষ যুগল।তার ওপর রহস্যময় এই গাছের নিচেই একটি মাজার। যুগের পর যুগ বটগাছটির ডালপালা, শেকড় বেড়েছে আর আকাশমুখী খেজুর গাছটি উঁচু থেকে উঁচু হয়েছে। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাজারের ওপর এই “জোড়া গাছ” নিয়ে মানুষের মাঝে গল্পেরও ডালপালা বিস্তৃত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। সত্য-মিথ্যা, যৌক্তিক-অযৌক্তিক কি-না সেসব খুঁজে দেখবার তাগিদ কেউ অনুভব করে না। মানুষের মুখে শোনা গল্পই বলছে সবাই।
সন্ধ্যায় বাঘায় নেমেই এক চায়ের দোকানে শুনলাম এই গাছের গল্প।নিচের ছোট্ট মাজার ছাড়া, এই বট-খেজুর বৃক্ষের দুই পাশে নিকটবর্তী দুই প্রতিবেশীরা হলো-- মুঘল আমলে স্থাপিত প্রায় পাঁচশ’ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ আর একটি বিশাল দেহী তেুঁতল গাছ, যার বয়সও নাকি চারশ’ বছরের ওপরে। বট-খেজুর গাছটির বয়সও কয়েকশ’ বছর।
তেতুল আর বট গাছ নিয়ে ভীতিকর, লোমহর্ষক নানা গল্প শৈশব থেকে শুনেছি। তখন রাতে তো বটেই, দিনেও তেতুল আর বট গাছের কাছ দিয়ে গেলে গা ছম ছম করতো। বাঘায় দেখি, রাতে তেতুল গাছের নিচে মাটিতে বসে কলাইয়ের রুটি বানাচ্ছে এক দরিদ্র নারী-পুরুষ। সাথে কাঠের লাকড়ির আগুনে পুড়িয়ে বানানো বেগুন আর মরিচ ভর্তা। কী যে দারুণ স্বাদ, তা বর্ণণা করবার সামর্থ আমার নেই। বসে খাচ্ছে স্থানীয় ক্রেতারা। তেতুল তলায় খাবারের এই ব্যবসা শুরু হয় সকাল ১০টায়, চলে রাত ১০টা অব্দি। রাতে সব দোকান বন্ধের পর বাঘা শান্ত, নিথর হয়। যেন ঘুমিয়ে পড়ে বাঘা। এগিয়ে আসে মধ্যরাত। কিন্তু জীবনের এই মধ্য বেলায় মধ্যরাতের আধারে তেতুল-বট গাছের নিচে একাকী বিচরণ আর লোমহর্ষক লাগে না।
তবে ভোর-সকালের আলোয় সত্যিই দ্বিধা জাগায়। যখন দেখি, বটগাছের ঠিক মাঝখান থেকে সোজা আকাশমুখী উঠে যাওয়া খেজুর গাছের অস্তিত্ব। নিচের ছোট্ট মাজারের গা ঘেষে মাটি থেকে উঠেছে আরেকটি খেজুর গাছ। দেখি, মাটিতে জন্ম নেয়া আর, আলোচিত বটগাছে জন্ম নেয়া খেজুর গাছটির উচ্চতা সমান। তাদের দেহ, পাতার গড়নেও মিল। বাঘায় সব খেজুর গাছই বেশ উঁচু, একই রকম গড়ন। বটগাছও আছে অনেক। বটগাছের ডালপালা থেকে নিম্নগামী অসংখ্য শেকড় ছাড়ে, যাকে ছোটবেলায় বলতাম-- বটগাছের দাড়ি। এই দাড়িগুলো বড় হতে হতে একসময় মাটি ছোঁয়। চারদিক দিয়ে বটগাছের কান্ডকে ঘিরে ফেলে দাড়িগুলো। তারপর নিজেরা মোটা হতে থাকে, একটার গায়ে আরেকটা লেগে যায়। এক সময় দাড়িগুলো বটগাছের মূল কান্ডকে এমন ভাবে ঘিরে ফেলে যে, তারাই বটবৃক্ষের বিশাল কান্ডে পরিণত হয়। এভাবেই বটগাছ বিশাল দেহী হয়। কিন্তু দাড়ির মত গজানো শেকড়দের ভীড়ে বটগাছের মূল কান্ড আমাদের চোখের আড়ালে পরে।
বটগাছের ডালপালা থেকে যখন শেকড়গুলো নেমে এসে মাটি ছোঁয়, তখন শুরুর দিকে এই সব শেকড়গুলো এবং গাছের মূল কান্ডের মধ্যে ফাঁক থাকে, পড়ে শেকড়গুলো প্রশস্ত হতে হতে সেই ফাঁকগুলো দূর হয়ে যায়। সেই রকম কোন এক ফাঁক গলেই মাটিতেই জন্ম নেয়া খেঁজুর গাছটি বটগাছের ভেতর দিয়ে সোজা বড়ে উঠেছে, যা বটগাছের পূর্ণ বৃদ্ধির পর দেখে সবার মনে হচ্ছে বটগাছের গায়ে জন্মেছে খেজুর গাছ। হতে পারে দুটো গাছ প্রায় একই সময় জন্মেছে কিংবা খেজুর গাছ খানিক আগে। সে যাই হোক, মাটিতেই জন্ম খেজুর গাছের এবং বটবৃক্ষের শেকড় আর কান্ডের ফাঁক গলেই তার উর্ধমুখী বেড়ে ওঠা। এই “রহস্যময়” গাছ যুগলের নিচে সকাল হলেই চায়ের পসরা সাজিয়ে বসে এক তরুণ। লাকড়ির আগুনে গাভীড় দুধের চা। দারুণ মজার সেই চা বেশ কয়েক কাপ খেতে খেতে গাছ রহস্য নিয়ে এই যোক্তিক উপসংহারে নিজের মনে নিজেই টানলাম।
চা বানিয়ে দেয়া তরুণকে জিজ্ঞেস করলাম, এই খেজুর গাছের রস পাড়ে না কেউ?
বললো-- “অনেক আগে রসের জন্য একজন হাড়ি পাতছিলো। কিন্তু নামিয়ে দেখে হাড়ি ভর্তি রক্ত। তারপর থেকে আর কেউ রসের জন্য হাড়ি পাতে না।”
এটা কবের ঘটনা? তুমি নিজে দেখেছো সেই হাড়ি?
তরুণ-- “জানি না কবের, শুনছি অনেক আগের।”
এই বট-খেঁজুর গাছের খুব কাছেই ডাক বাংলোতে রাতে ছিলাম। ভোরে উঠে বাংলোর দেখভালের দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়কের সাথে দেখা। তাকেও একই প্রশ্ন করেছিলাম। চায়ের দোকানের তরুণের কথা শুনে মনে পড়লো বাংলোর কেয়ারটেকারও একই গল্প বলেছিল। খেঁজুর গাছে পাতা শেষ হাড়িতে রসের বদলে নাকি রক্ত পাওয়া গেছে!
তরুণের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম-- আরেকটা চা বানাও, গাছটার ছবি নেই।

* জুলফিকার আলি মাণিক: স্ট্রিংগার, নিউইয়র্ক টাইমস।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top