logo
news image

মান্ধাতার আমল কি?

সাদ আহমেদ।  ।  
সাধারণ অর্থে মান্ধাতার আমল অর্থ অতি প্রাচীন কাল; পুরনো কাল। আমার কেউ পুরনো যুগের সিনেমা দেখলেই বলি মান্ধাতার আমলের ছবি।আসলে এই কথাটা বর্তমান কালের একটা উদাহরণ ছাড়া আর কিছু নয়।মোট কথা প্রাচীন কালের উক্তি বা কার্যক্রমকে উল্লেখ করে বলা হয় ''মান্ধাতার আমল''। কখন ছিল মান্ধাতার এ আমলটা? হিন্দুধর্ম মতে, মহাকাল (সময়কাল/যুগ) সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই চার যুগে বিভক্ত। এদের মধ্যে সত্য যুগটা শ্রেষ্ঠ যুগ। সে যুগে কোন পাপ ছিলনা। মৃত্যু ছিল ইচ্ছাধীন। সে যুগের রাজা ছিলেন মান্ধাতা। তার আমলটা ছিল হয়তো এখন থেকে লক্ষ লক্ষ বছর আগে। কারণ সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সময়কাল ছিল যথাক্রমে ১৭,২৮,০০০ বছর, ১২,৯৬,০০০ বছর এবং ৮,৬৪,০০০ বছর। আর আমরা যে পাপের যুগে (কলি কাল) বাস করছি তার দৈর্ঘ্য ৪,৩২,০০০ বছর। বোঝা যাচ্ছে, মান্ধাতার আমলটা অনেক প্রাচীন। সুতরাং এজন্যই প্রাচীন বা পুরণো জিনিস বুঝাতে ‘মান্ধাতার আমল’ কথাটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
মান্ধাতা সত্যিকার অর্থে একজন মিথোলজিক্যাল চরিত্র। তিনি রাজা যবনাশ্বের পুত্র ও সূর্য বংশের একজন রাজা, তার শাসনামল পৌরানিক যুগে। শ্রী রামচন্দ্রের পূর্ব পুরুষ রঘুবংশের অনেক আগে এই বংশের রাজারা রাজত্ত্ব করতেন। তাঁর জন্ম বৃত্তান্তটি  নিয়ে বেশ একটা অদ্ভুত ও খুব মজার কাহিনী প্রচলিত আছে। মাতৃগর্ভ নয়, পিতৃগর্ভে জন্মেছিলেন মান্ধাতা। চলুন এই মান্ধাতা'র জন্মগ্রহনের গল্পটা শুনি। অনেক চেষ্টা করেও মান্ধাতার পিতা  যুবনাস্ব বা যুবনাশ্বের এবং মাতা কালনিমি দম্পতির কোন ছেলেপুলে হয়নি। ইন্ডিয়ান মিথোলজি অনুযায়ী পাপের মাশুল দিতে গিয়ে সন্তান ধারণ করতে হয়েছিল এক রাজাকে যুবনাশ্বরকে। বিষ্ণুপুরাণ এবং শ্রীমদ্ভগবৎ গীতায় উল্লেখ আছে সেই কাহিনীর। একশো রানি থাকা সত্ত্বেও বল্লভী রাজ্যের রাজা যুবনাশ্ব ছিলেন অপুত্রক। রাজা হয়ে শাসনকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তিনি চলে গেলেন বানপ্রস্থে। সঙ্গে একশো জন রানি। বনে তপস্যারত ঋষিদের দয়া হল যুবনাশ্ব ও তাঁর মহিষীদের দেখে। শেষে মুনিদের আশ্রমে গিয়ে যোগ সাধনা শুরু করলেন যেন একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তারা যুবনাশ্বের জন্য এক যজ্ঞ আরম্ভ করলেন। ঋষিরা তাঁদের জন্য ইন্দ্র যজ্ঞ করেন। রাতভর যজ্ঞের পরে শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন ব্রাহ্মণরা। যজ্ঞ শেষ হতে হতে মাঝরাত। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কলসি ভর্তি মন্ত্রপূত পানি বেদিতে রেখে গেলেন তারা। এই কলসির পানি যদি যুবনাশ্বের স্ত্রী পান করে, তবেই জন্ম হবে পুত্রসন্তানের। কিন্তু বিধিবাম। তো একদিন তিনি বনে শিকার করতে গিয়ে প্রচুর পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েন। পিপাসায় কাতর হয়ে তিনি পানির খোঁজে বনের ভিতর হাঁটতে হাঁটতে ঋষি ভৃগুর আশ্রমে যান। কিন্তু তখন আশ্রমে কেউই ছিলেন না। অনেক ডাকাডাকি করে কারো কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন সময় উনার চোখে পড়ল ঘরের কোনায় রাখা এক কলস পানি। প্রচণ্ড পিপাসায় তিনি ঐ কলসের এক আঁজলা পানি। পানি পান করে ফেলেন। কিছুক্ষণ পর যখন ঋষি ভৃগু এলেন তখন তিনি জানালেন যে এই পানি উনার স্ত্রীর জন্য রাখা ছিল, যাতে তাঁর বাচ্চা হয়।মন্ত্রঃপুত জলেই ছিল সন্তানধারণের ক্ষমতা।  পানি যেহেতু যুবনাশ্বর খেয়েছে, সন্তান তার গর্ভেই জন্মাবে! তবে মুনিরা নারীর গর্ভধারনের কষ্ট থেকে যুবনাশ্বরকে মুক্তি দিলেন। যুবনাশ্বর নিজের ভুলে গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলেন। পৌরাণিক এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু গল্প লেখা হয়েছে, যেখানে যুবনাশ্বকে বলা হয়েছে ‘দ্য প্রেগনেন্ট কিং’। একই নামে দেবদূত পৌত্তনিকের একটি বইও আছে।  এর একশত বছর পর যুবনাশ্বের পেটের বাম দিক বিদীর্ণ করে তাঁর উদর থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল রাজ চক্রবর্তীর সুলক্ষণযুক্ত এক শিশু এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাজা যুবনাস্ব প্রাণ হারালেন। এই ভাবে আবির্ভাব হল পরবর্তি রাজা মান্ধাতার। কিন্তু সদ্যোজাতর জন্য খাদ্য কোথা থেকে আসবে ভাবছিলেন যুবনাশ্ব। স্তন্যপানের জন্য সে তখন তারস্বরে কাঁদছে। সমস্যা মেটালেন দেবরাজ ইন্দ্র।তার মুখে নিজের তর্জনী পুরে দিয়ে বললেন, “মাম ধাস্যতি”, মানে আমাকে পান করো। সেখান থেকেই খাদ্যের যোগান হল নবজাতকের। সেখান থেকেই পুত্রটির নাম রাখা হয় মাম-ধাতা বা  মানধত্ত বা মান্ধাতা। ইন্দ্রের সেই আঙুল ছিল অমৃতক্ষরা। মানে সেই আঙুল দিয়ে অমৃত ঝরত। ঋষিদের করুণাবলে সন্তানের জন্মের পরেও সুস্থ থাকেন রাজা যুবনাশ্ব। কঠোর প্রায়শ্চিত্ত করে পাপমুক্ত হন তিনি। মান্ধাতা ছিলেন নিরামিষাশী। রাজা হিসেবেও ছিলেন বেশ ভালো। একবার তার রাজ্যে অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছিল। তখন তিনি মুনীদের কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। মুনীরা জানালেন, তার রাজ্যে এক শূদ্র তপস্যা করছেন। এমনিতেই ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কারো তপস্যা করার নিয়ম নেই। তার উপর আবার সত্যযুগ চলছিল। সে যুগে পাপ-অনাচারের ফল হাতেনাতে মিলত। এই অধর্মের কারণেই মান্ধাতার রাজ্যে অনাবৃষ্টি হচ্ছিল বলে জানান মুনীরা। সেই শূদ্রকে হত্যা করলেই অনাবৃষ্টি দূর হবে বলে মতামত দিলেন তারা। কিন্তু মান্ধাতা তাতে রাজি হলেন না। সৃষ্টিকর্তার তপস্যা করার কারণে জীবন কেড়ে নেয়ার কথাটি তার মনঃপুত হলো না। উল্লেখ্য, এ বংশেই মান্ধাতার বহুকাল পরে রামের জন্ম হয়েছিল। কৃত্তিবাসের রামায়ণে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আছে।
জন্মের পরে এক বিস্ময় শিশুর মতো বড় হতে লাগলেন মান্ধাতা। দেবরাজ ইন্দ্রের আশীর্বাদে মাত্র ১২ দিনে তিনি পূর্ণতা পেলেন ১২ বছর বয়সী বালকের মতো। কিছুদিন পরেই তিনি পড়াশোনায় এবং অস্ত্রবিদ্যায় অতুলনীয় হয়ে পড়েন। তিনি চন্দ্রবংশীয় রাজকন্যা বিন্দুমতিকে বিয়ে করেন। বিন্দুমতির গর্ভে পুরুকুৎস‚ অম্বরীশ ও মুচকুন্দ নামে  তিন পুত্র এবং পঞ্চাশ কন্যা জন্মগ্রহণ করে। এই মেয়েদের তারা বিয়ে দিয়েছিলেন ঋষি সৌভরির সঙ্গে। বড় হয়ে মান্ধাতা বাবার রাজ্যের রাজা হয়েই তিনি পৃথিবী জয়ে বেরিয়ে পড়লেন। যুদ্ধ করতে করতে মান্ধাতা প্রায় সারা বিশ্বই জয় করে ফেললেন। তিনি কেবল জিততে পারলেন না রাবণের সাথে। সুমেরু পর্বতে রাক্ষসরাজ রাবণের সাথে তার তুমুল যুদ্ধ হলো। উভয়ের শক্তি সমান হওয়ায় কেউই পরাজিত হলেন না। যুদ্ধে কেউ জিততেও পারছিল না। যাকে বলে, একেবারে সমানে সমানে লড়াই, সেটাই চলছিল। শেষে তারা যুদ্ধ বাদ দিয়ে সন্ধি করলেন। আর সেই সন্ধির মধ্য দিয়ে রাবণের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপিত হলো মান্ধাতার।
বল্লভী বংশের রাজা মান্ধাতা মাত্র একদিনে জয় করলেন মর্ত্যলোক। পাতাল জয়ের পরে অধিকার করলেন অর্ধ স্বর্গ। কার্যত ত্রিলোকের অধীশ্বর হলেন তিনি। মহাভারতে আছে‚ মান্ধাতা প্রসিদ্ধ ছিলেন দান-ধ্যান-অশ্বমেধ ও রাজসূয় যজ্ঞে। নিজ বাহুবলে এবং অস্ত্রবিদ্যার সহায়তায় প্রথমে তিনি সমগ্র পৃথিবী অর্থাৎ ভূলোক নিজ শাসনে নিয়ে আসেন, তারপর তিনি জয় করেন পাতাল লোক। এরপর মান্ধাতা পাতাল ছেড়ে স্বর্গরাজ্য জয় করার অভিযানে বের হলেন। তখনস্বর্গের রাজা দেবরাজ ইন্দ্র তাকে থামালেন। বললেন, তুমি তো এখনও পুরো পৃথিবী জয় করতে পারোনি। মধূ পুত্র লবণাসুর এখনো তোমার অধীনতা স্বীকার করেননি। আগে তাকে পরাজিত করে এসো, তারপর না হয় স্বর্গ জয়ের কথা ভেবে দেখ। এই কথা শুনে মান্ধাতা লবনাসুরের সাথে যুদ্ধ শুরুর পায়তারা করতে লাগলেন।এই লবণাসুর ছিলেন রাজা মধুর ছেলে। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণভক্ত। তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে শিব তাকে নিজের ত্রিশূলের একটি শূল দিয়েছিলেন। এই শূল শত্রুদের ভস্ম করে আবার মধুর হাতেই ফিরে আসতো। সাথে অবশ্য শিব এটাও বলে দিয়েছিলেন, দেবতা বা ব্রাহ্মণদের বিরোধিতা করলে এই শূলের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। মধু আবার উপযাচক হয়ে আরেকটি বর চেয়ে নিয়েছিলেন। এই শূল যেন উত্তরাধিকার সূত্রে তার বংশের সবাই ব্যবহার করতে পারে, সেই অনুমতিও চেয়ে নেন মধু। শিব অবশ্য তাকে এতটা স্বাধীনতা দেননি। কেবল তার ছেলে লবণকে এই শূল ব্যবহারের অধিকার দেন শিব। কিন্তু তবুও স্বর্গ জয়ের আশায় মান্ধাতা লুবনাসুরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন কিন্তু লবনাসুরের সাথে যুদ্ধে তিনি নিহত হন।আর বাবা মধু ও ছেলের মধ্যে বাবা মধুর সঙ্গে লড়াই হয় রাবণের।মধু-রাবণের যুদ্ধে জয়ী হয় রাবণ। তার হাতে মারা পড়েন মধু। কিন্তু মান্ধাতা লবণকে হারাতে পারেননি। উল্টো লবণের হাতে মারা পড়েন মান্ধাতা। পরবর্তীতে অবশ্য মান্ধাতারই বংশধর শত্রুঘ্ন লবণকে পরাজিত ও নিহত করেছিলেন।
মানুষের বা পৃথিবীর বছরের হিসেবে একেকটা দৈবযুগের মেয়াদকাল ৪৩ লক্ষ ২০ হাজার বছর। এর মধ্যে প্রথম ১৭ লক্ষ ২৮ হাজার বছর হলো সত্যযুগ। তার পরের ১২ লক্ষ ৯৬ হাজার বছর জুড়ে চলে ত্রেতাযুগ। পরের ৮ লক্ষ ৬৪ হাজার বছর ব্যাপী বিরাজ করে দ্বাপরযুগ। আর শেষ ৪ লক্ষ ৩২ হাজার বছর ধরে চলছে, চলবে কলিযুগ। সব মিলিয়ে, এই রাজা মান্ধাতা কম করে হলেও এখন থেকে প্রায় ৩৫ লক্ষ বছর আগেরকার রাজা। অর্থাৎ, মান্ধাতার আমল মানে যে বহুদিনের পুরনো কিছুই হবে তা আর আলাদা করে বলাই বাহুল্য। এ কারণেই আমরা অনেক পুরনো কিছু বোঝাতে গিয়ে মান্ধাতার আমলের কথা উল্লেখ করি। মান্ধাতার মৃত্যু নিয়েও দ্বিমত আছে পৌরাণিক কাহিনীতে। কোথাও বলা হয়েছে তিনি বিশাল ধনসম্পত্তি ত্যাগ করে বানপ্রস্থে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভগবান বিষ্ণুর চরণে। মহাভারতে বলা হয়েছে‚ লবণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন রাজা মান্ধাতা। ইক্ষ্বাকু বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজা দশরথ ও তাঁর পুত্ররা মান্ধাতার বংশধর। অবশ্য মান্ধাতারই বংশধর দশরথপুত্র শত্রুঘ্ন লবণাসুরকে পরাজিত ও বধ করে মান্ধাতা-হত্যার প্রতিশোধ নেন।
* সাদ আহমেদ: গবেষক ও কলাম লেখক এবং সম্পাদক, সাপ্তাহিক শহীদ সাগর।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top