logo
news image

১১৪তম দেশে পা রাখলেন লাল-সবুজ পতাকার ফেরিওয়ালা

প্রাপ্তি প্রসঙ্গ ডেস্ক।  ।  
জীবনের আরেক নাম মুগ্ধতা। এর পিছনে ছুটতে ছুটতে মুগ্ধতা প্রেমী মানুষেরা মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করে নিতে পারেন নির্বিবাদে। কিন্তু মুগ্ধতার নেশা তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারে না।
নাজমুন নাহার সোহাগী একে একে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন বিস্ময়, ফেরি করছেন বাংলাদেশের পতাকা। সকল বাধা, ভয়-শঙ্কা, মৃত্যুসহ সব পিছুটানকে দু'পায়ে দলে দুর্বার আকর্ষণে নদী, সাগর, পাহাড়, উপত্যকার বাধাকে উপেক্ষা করে ছিনিয়ে এনেছেন কাঙ্ক্ষিত বিজয়, লাল সবুজের পতাকা উড়িয়েছেন দিগন্ত জুড়ে। পেয়েছেন 'ফ্লাগ গার্ল' উপাধি।
যাকে নিয়ে এতো ভূমিকা, উপমা-উৎপ্রেক্ষা সেই বিশ্বজয়ী পতাকার ফেরিওয়ালা তরুণীর নাম নাজমুন নাহার। এদেশে জল-হাওয়ায় যার পদচারণা, বেড়ে ওঠা।
জীবনের সব চাওয়া পাওয়াকে তিনি মিলিয়েছেন দেশ ভ্রমণ ও সেখানে দেশের পতাকা উড়ানোর মধ্যে। আর জীবনের এই কঠিন ব্রতটিকে সঙ্গী করেই তিনি যেতে চান আরও অনেক দূর, ফেরি করতে চান লাল সবুজের পতাকাটিকে।
৩০ নভেম্বর তিনি তার অভিযাত্রার ১১৪তম দেশে তিনি উড়িয়েছেন লাল সবুজের বিজয় নিশান। একশ চৌদ্দ’তম দেশে হিসেবে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি বিসাওতে পৌঁছেছেন নাজমুন।
এ বিষয়ে নাজমুন তার নিজের ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, 'লাল সবুজের পতাকা হাতে সাহারার তপ্ত মরু থেকে শুরু করে শহর, বন্দর, আফ্রিকার দুর্গম জঙ্গল, মৌরিতানিয়া, সেনেগাল, গাম্বিয়া পার হয়ে বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি বিসাও – এ অবস্থান করছি।'
এর আগে, প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে শততম দেশ ভ্রমণের বিরল কৃতিত্ব অর্জন করছেন নাজমুন নাহার।
তার এই জার্নিটি কখনো ফুল বিছানো ছিল না। ৩৮ বছর বয়সী নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের শুরুটা ২০০০ সালে, ভারত ভ্রমণের মাধ্যমে। তখন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাঠ শেষে রাজশাহী থেকে ঢাকায় চলে আসেন নাজমুন। কিছুদিন সাংবাদিকতা করেন এক বিনোদন সাময়িকীতে।
২০০৬ সালে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে চলে যান সুইডেন। লক্ষ্মীপুরের মেয়ে নাজমুন সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। পড়াশোনার ফাঁকে খণ্ডকালীন কাজও করতেন তখন। কয়েক মাসের জমানো টাকায় জাহাজে ভ্রমণ করেন ফিনল্যান্ড।
তারপরই শুরু হয় তাঁর ভ্রমণ অধ্যায়ের অন্য পর্ব। সুইডওয়াচসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় খণ্ডকালীন চাকরি করেছেন। রোজকার খরচ বাদে যা জমান, তা নিয়েই পা বাড়িয়েছেন নতুন কোনও দেশে। বাংলাদেশের এই নারী ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ঘুরেছেন ৩৫টি দেশ। এ তালিকায় আছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, পেরু, চিলি, প্যারাগুয়েসহ দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি দেশ। এই দুই সাল মিলিয়ে এটাকে তাঁর ‘ভ্রমণবর্ষ’ বলা যায়!
টাকা জমিয়ে মানুষ সম্পদ গড়ে। আর তিনি বাংলাদেশের পতাকাকে সঙ্গী করে বিশ্বের প্রতিটি দেশে আঁকতে চান তার পদচিহ্ন।
নাজমুনের বিশ্বাস, 'মনের উদ্দামতা আর শরীরের শক্তি দিয়ে বাংলাদেশের নারীরাও গোটা পৃথিবীকে মাড়িয়ে যেতে পারে তার প্রমাণ আমি নিজেই। সমুদ্র থেকে সমুদ্রে, পাহাড় থেকে পাহাড়ে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে, পৃথিবীর ইতিহাসকে বাস্তব চোখে দেখা- আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
নাজমুন ফেসবুকে লিখেছেন, প্রিয় বাংলাদেশ, বিশ্ব ভ্রমণের একশ চৌদ্দ'তম দেশে পৌঁছলো বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা! দুর্গম সব গিরি পথ অতিক্রম করে শত শত মাইল বাই রোডে জার্নি করে গাম্বিয়া'র বানজুল শহর পার হয়ে আজ পৌঁছালাম পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি বিসাও!
লাল সবুজের পতাকা হাতে সাহারার তপ্ত মরু থেকে শুরু করে শহর, বন্দর, আফ্রিকার দুর্গম জঙ্গল, মৌরিতানিয়া, সেনেগাল, গাম্বিয়া পার হয়ে বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি বিসাও - এ অবস্থান করছি!
মৌরিতানিয়া ও সেনেগাল জয় খুব একটা সহজ ছিল না! সাহারা মরুভুমি এডভেঞ্চারের সময় প্রচন্ড ধুলো ঝড়ের মধ্যে পড়তে হয়েছে! ওই সময় ঝড়ের তোড়ে চোখে, মুখে ও নাকের মধ্যে মরুর তপ্ত ধারালো বালির
আঘাতে ঠোঁটের এক পাশে প্রচন্ড ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ফুলে যায়! তপ্ত মরুর বুকের দাবাদহ রোদ, ঝড় কোনো কিছুই থামিয়ে রাখতে পারেনি আমাকে! মরুর বুকের সুউচ্চ ভ্যালিতে উড়িয়েছি লাল সবুজের পতাকা! মুরুর বুকে রাতের চাঁদের আলো উপভোগ, ভোরের সূর্যোদয় ও বিকেলের সূর্যাস্ত দেখেছি! এরপর মৌরিতানিয়ার বিভিন্ন ক্যামেল ভিলেজে মানুষের বৈচিত্রময় জীবন যাত্রা, পথে পথে বিভিন্ন স্কুলের বাচ্চাদের সাথে দেখা করা সবই ছিলো আমার এই ভ্রমণের অন্তর্ভুক্ত!
মৌরিতানিয়া সফর শেষে আবারো শত শত মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাই রোডে সেনেগালের রোসো বর্ডার ক্রস করি! রোসো রিভার পার হয়ে, বর্ডার ক্রস করে সেনেগালের ছোট্ট টাউন সেন্ট লুই'তে আসি! তারপর সেন্ট লুই ভ্রমণ শেষ করে রাতের বাসে সেনেগালের রাজধানী ডাকার পৌঁছাই! সেনেগালের সকল দর্শনীয় স্থান গোরে আইল্যান্ড, লেক রোজ সহ সব কিছু দেখা হয়!
সেনেগালের ম্যাপের মধ্যে অবস্থিত দেশ গাম্বিয়া'র বানজুল শহরে বাররা রিভার পার হয়ে পৌঁছাই! পশ্চিম আফ্রিকার এই দুর্গম দেশগুলিতে একা একা বাই রোডে এই কঠিন অভিযাত্রা অনেক বিপদ সংকুল সম্ভাবনা থাকলেও সাহসিকতার সাথে পার হচ্ছি সকল দুস্তর পথ! কঠিনকে ভালোবেসেই ত্যাগ, তিতিক্ষা আর সকল বাধা মাড়িয়ে চলছি বাংলাদেশের পতাকাকে হাতে নিয়ে সামনের পথে সু-উচ্চতায়!

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top