logo
news image

বিশ্ব মানবতার এক উজ্জল বাতিঘর

মোঃ শাহানেওয়াজ সেতু্।  ।  
কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে কে বলে তা বহুদুর? মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক মানুষেতে সুরাসুর! শেখ ফজলল করিমের এই অমীয় বাণী থেকে বোঝা যায়, সৃষ্টির সেরা জীব (আশরাফুল মাখলুখাত) মানুষকে ভালবেসে অথাৎ নিপীড়িত- নির্যাতিত, অবহেলিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা করার মধ্যে দিয়ে সর্বোত্তম পুরষ্কার পাওয়া সম্ভব তেমনি দাম্ভিকতা আর ক্ষমতার দাপটে মানুষকে ঘৃণা করলে অসহনীয় নরকের যন্ত্রনাই হবে তার একমাত্র প্রাপ্য। পবিত্র কোরআন মাজীদ ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে মানবিক কল্যাণ, সহায়- সম্বলহীন, ক্ষুধার্ত, নিগৃহীত মানুষের সেবা করা এবং পরোপকার এই কাজগুলোই হল সর্বোত্তম গুণ। আমরা একটু চিন্তুা করে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো বিশ্বের অনেক বড় বড় ধনসম্পদশালী রাষ্ট্রের মানবতাবোধ আজ বিপদগ্রস্ত ও প্রায় বিপন্ন। এখানে উল্লেখ্য যে, সেই সব রাষ্ট্রের কর্তাবাবুরাই জাতিসংঘ অধিবেশন সহ অন্যান্য বৈশ্বিক সম্মেলনে গলা উঁচিয়ে বুক ফুলিয়ে মানবতার জয়গান করেন। বিগত কয়েক বছরের বিশ্বমানবতার এ্যালবাম দেখলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, সবচেয়ে বৃহৎ অর্থনীতির পরাক্রমশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে কিভাবে মধ্যেপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে ক্ষমতার উন্মত্ত জোয়া খেলায় মেতে উঠেছিল এবং তা এখনও চলমান। তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের ঝনঝনানি আর নতুন নতুন প্রযুক্তি সমৃদ্ধ বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত আজ  বিশ্বের মানবতা। আফগানিস্তান, ইরাক, মিশর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিন সহ অন্যান্য দেশসমুহে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ বিনা অপরাধে মৃত্যুবরণ করছে যাদের অধিকাংশই শিশু ও নারী। সেসব দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ বাস্তুহারা। তারা খোলা আকাশের নিচে অনাহারে অর্ধাহারে মৃত্যুভয়ের আতঙ্কে দিন অতিবাহিত করছে। হাজার হাজার শিশু এতিম হয়ে পড়েছে যাদের ভবিষ্যৎ কেউই বলতে পারবে না আবার অসংখ্য শিশু অসহনীয় ক্ষুধার জ্বালায় হাড্ডিসার হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে। কেউ শুনতে পায় না তাদের এই বুকফাটা আত্মচিৎকার! বিশ্ব বিবেক শুধু অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে কিন্তু কারোও কি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়? সত্যিকার অর্থে মুখে সবাই মানবতার পক্ষে মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেও কাজে আমরা কাউকেই এগিয়ে আসতে দেখিনি। এইতো বছর খানেক আগে ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ মায়ানমারে রাখাইন সহ রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলোতে নিরপরাধ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষদের  উপর চলে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম বর্বর নির্যাতন যাকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউএনএইচসিআর, জাতিসংঘ সহ অনেক সংস্থা জাতিগত নিধন অথবা গণহত্যা (জেনোসাইড) বলে আখ্যা দিয়েছে। রাখাইন প্রদেশে নারী ও শিশুদের নির্বিচারে পুড়িয়ে হত্যা ও গণধর্ষন করে সেদেশের সেনাবাহিনী এবং উগ্র বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন। এছাড়াও রোহিঙ্গা মুসলিমদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় এবং সবকিছু লুটপাটের মাধ্যমে সর্বসান্ত করে নিজ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করে। রোহিঙ্গারা প্রাণভয়ে তাদের জমি, বসতভিটা, দোকানপাট ফেলে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে পালিয়ে আসে বাংলাদেশে। সেই মায়ানমার রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সুচি যিনি শান্তিতে ১৯৯৩ সালে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন কিন্তু নিজ দেশে তিনি যখন ক্ষমতায় তখন নির্বাক দৃষ্টিতে এই মানবিক বিপর্যয় শুধুমাত্র অবলোকন করেছেন কার্যত কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেন নি। তবে এই গণহত্যার দায় কোনভাবেই তিনি এড়াতে পারেন না। মানবতা যেখানে বিপর্যস্ত, বিশ্ব বিবেক যেখানে বাকরুদ্ধ এমনকি পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের দিকে বন্দুক তাক করে রেখেছে সেখানে উদার নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্ব নেতাদের অবাক করে দিয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, রাজনীতির কবি, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের  যোগ্য উত্তরসূরী, সৎ, সাহসী ও দৃঢ়চেতা রাষ্ট্রনায়ক, দেশরতœ, গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা সীমান্তদ্বার উন্মুক্ত করে দিলেন। তিনি বলেন রোহিঙ্গারাও তো মানুষ সুতরাং আমরা দু’বেলা খাবার খেলে তারাও দু’বেলা খাবার খাবে। শেখ হাসিনা তার পরম সহানুভূতি আর মমতার আঁচল বিছিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন নিজ দেশে এবং অস্থায়ীভাবে নোয়াখালীর ভাসানচরে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ঘরবাড়ি তৈরী করে দিচ্ছেন যাতে তারা নিরাপদ ভাবে বসবাস করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখেরও বেশি। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো যেখানে তাদের দেশের সীমান্তবেড়া বেশি করে মজবুত করছে সেখানে মমতাময়ী জননী মানবতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে সেবা করে যাচ্ছে। আজকের পৃথিবীতে মানবতার জন্য এ এক উজ্জল বাতিঘর যে দৃষ্টান্ত সব দেশেরই অনুকরণীয় হতে পারে।

* মোঃ শাহানেওয়াজ সেতু, সহকারী শিক্ষক, ভূইয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোপালপুর, লালপুর, নাটোর।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top