logo
news image

কবি শামসুর রাহমানের ৯০তম জন্মদিন

নিজস্ব প্রতিবেদক।  ।  
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ৯০তম জন্মদিন মঙ্গলবার (২৩ অক্টোবর)।
মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা আর মুক্ত চেতনায় বাংলাদেশের হৃদয় হয়ে ওঠা এই কবি বেঁচে থাকলে এদিন তার বয়স হত ৮৯ বছর।
কবি শামসুর রাহমানের জন্ম পুরনো ঢাকার মাহুতটুলি এলাকায় নানাবাড়িতে। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পাড়াতলী গ্রামে। কবি শামসুর রাহমান ১৩ জন ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেন ৪র্থ। ১৯৪৫ সালে পুরনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাস করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর মূল পরীক্ষা দেননি। ১৯৫৩ সালে পাস কোর্সে বিএ পাশ করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ (প্রিলিমিনারি) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।
শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ। সেখানে তিনি ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৪ সালের নভেম্বর মাসে দৈনিক পাকিস্তান (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা) এর সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন এবং ১৯৭৭ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি একইসাথে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর তিনি অধুনা নামের একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শামসুর রাহমান একাধারে কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও গীতিকার। গত শতকের পঞ্চশের দশক থেকে বিরামহীন তার কলম চলেছে প্রায় ছয় দশক। এই পথযাত্রায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘কবিতার রাজপুত্র’।
জন্ম ঢাকা শহরে, এই নগরেই তার বেড়ে ওঠা। পড়ালেখার শুরু পোগোজ স্কুলে। শামসুর রাহমানের কবিতায় নাগরিক জীবনের আনন্দ বেদনার কথা যেমন এসেছে, তেমনি তা ধারণ করেছে সংগ্রামী বাঙালির গৌরবদীপ্ত ইতিহাস।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে শামসুর রাহমানের লেখনী ছিল সোচ্চার।
'আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা' কিংবা শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে লেখা 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়' স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রকামী বাঙালিরই প্রাণের কথা।
গদ্য কবিতার দুর্বোধ্যতার দেয়াল ভেঙে শামসুর রাহমানের সহজ অথচ ধারালো পংক্তি পৌঁছে গেছে সব ধরনের পাঠকের হৃদয়ে।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। এরপর নিজ বাসভূমে', 'বন্দী শিবির থেকে', 'দুঃসময়ে মুখোমুখি', 'ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা', 'বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে', 'ইকারুসের আকাশ', 'উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ', 'যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে', 'অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই', 'দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে', 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়', 'ভস্মস্তূপে গোলাপের হাসি'সহ শতাধিক গ্রন্থে তিনি ঋদ্ধ করে গেছেন বাংলা সাহিত্যকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষ করে ১৯৫৭ সালে ডেইলি মর্নিং সানে শামসুর রাহমানের কর্মজীবন শুরু হয়। পরে রেডিওতেও বছর দেড়েক কাজ করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৈনিক বাংলায় যোগ দেন শামসুর রাহমান। তিনি পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদকও হয়েছিলেন। তার সম্পাদনায় বেশ কিছুদিন প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিচিত্রা। মূলধারা ও অধূনা নামে দুটি সাহিত্য পত্রিকাও তিনি সম্পাদনা করেন।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, আদমজী পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জীবনানন্দ পুরস্কারসহ বহু সম্মননায় ভূষিত হয়েছেন শামসুর রাহমান।
আনন্দবাজার পত্রিকা ১৯৯৪ সালে তাকে আনন্দ পুরস্কার দেয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৪ সালে এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৬ সালে তাকে সম্মানসূচক ডি লিট উপাধি দেয়।
কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা বেজে ৩৫ মিনিটে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে, নিজ মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top