logo
news image

অবহেলিত রাজশাহী চিড়িয়াখানা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী।  ।  
নানা অব্যবস্থাপনা, অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। প্রতিনিয়তই ফাঁকা হচ্ছে একের পর এক খাঁচা। যে কয়টি পশুপাখি বেঁচে আছে, তাও সুষম খাদ্য, বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে হাড্ডিসার। কর্তৃপক্ষের অযত্ন-অবহেলায় পশুপাখির এমন করুণ দশা দেখে দর্শনার্থীদের অনেককেই চরম ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া উদ্যানের ভেতর উঠতি তরুণ-তরুণীদের অবাধ বিচরণ ও অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিনিয়ত দর্শনার্থী হারাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী চিড়িয়াখানাটি।
সরেজমিনে উদ্যান ও চিড়িয়াখানাটি ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ খাঁচাই পশুপাখি-শূন্য, যা আছে তাও যৎসামান্য। স্যাঁতসেঁতে, নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাঁচায় রাখা আটটি খরগোশের বেশির ভাগের শরীরেই ঘা। খাবারও পাচ্ছে না ঠিকমতো। এদিক-সেদিক কেবল পড়ে আছে পোকায় খাওয়া কয়েকটি বেগুন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দীর্ঘদিন থেকেই পরিষ্কার করা হয় না খাঁচাটি। এভাবে অযতœ-অবহেলায় আর কিছুদিন থাকলে খরগোশগুলোকে বাঁচানোই কষ্ট হবে।
শুধু খরগোশই নয়, চিড়িয়াখানার গাধার খাঁচার কাছে যেতেই একটি গাধা ছুটে এলো। মনে হলো যেন তার বুকে জমা হয়ে আছে রাজ্যের অভিযোগ। কিন্তু হতাশ হয়ে শুয়ে পড়ল কাছাকাছি এসে। খাবার না পেয়ে হাড্ডিসার গাধার শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ, বিভিন্ন স্থানে ঘা। অজগরের খাঁচার সামনে গিয়ে দেখা গেল, কোনো খাবার নেই। নড়াচড়া নেই, দুর্বল হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। মেছো বাঘগুলোও হাড্ডিসার। আর ভল্লুকের খাঁচায় গিয়ে মিলল পচাবাসি খাবার। ঘুমিয়ে থাকা বনবিড়ালের সামনে দু-একটি হাড্ডি ছাড়া কোনো খাবার দেখা যায়নি। প্রতিটি পশুপাখির খাঁচার সামনে গিয়েই কর্তৃপক্ষের এমন অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০৩ সালে রাজশাহীর কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় ছিল দুটি সিংহ, একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ১৯৪টি চিত্রা হরিণ, দুটি মায়া হরিণ, ২৬টি বানর, ৯টি বেবুন, চারটি গাধা, দুটি ভল্লুক, একটি ঘোড়া, দুটি সাদা ময়ূর, তিনটি দেশি ময়ূর, ৮৫টি তিলা ঘুঘু, ৬৮টি দেশি কবুতর, চারটি সজারু, ২৮টি বালিহাঁস, দুটি ওয়াকপাখি, একটি পেলিকেন, ছয়টি টিয়া, চারটি ভুবন চিল, চারটি বাজপাখি, একটি হাড়গিল, তিনটি হুতোম পেঁচা, নয়টি শকুন, দুটি ভোদর, তিনটি ঘড়িয়াল ও একটি অজগর।
এখন অবশ্য বাঘ-সিংহ নেই। কয়েক বছর আগে বার্ধক্যজনিত কারণে সেগুলোর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সেই বাঘ ও সিংহের চামড়া বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরে সংরক্ষিত। আর পশুপাখির মধ্যে রয়েছে কেবলÑ চারটি বনবিড়াল, দুটি বেবুন, ১৭টি বানর, ৬১টি চিত্রা হরিণ, একটি মায়া হরিণ, ছয়টি গাধা, একটি ভল্লুক, ১৭টি খরগোশ, দুটি গিনিপিগ, তিনটি হনুমান এবং গন্ধগকুল রয়েছে চারটি। সরীসৃপের মধ্যে রয়েছে- একটি অজগর, দুটি ঘড়িয়াল এবং ১২টি কচ্ছপ। আর পাখি রয়েছেÑ ৫৩টি বক, নয়টি চিল, ছয়টি টার্কি, ১৬টি বালিহাঁস, ৩০০টি ঘুঘু, ১০টি ছোট ঘুঘু, একটি ময়না, দুটি সাদা ও কালো তিতির, পাঁচটি সাদা ও সিলভার তিতির, চীনাহাঁস ২১টি, হাড়গিলা একটি, ময়ূর দুটি, রাজহাঁস ২৯টি, টিয়া আটটি, পেলিকেন একটি, পাতিহাঁস দুটি, কবুতর ১০০টি এবং কালিম রয়েছে তিনটি।
মহানগরীর চন্ডীপুর এলাকা থেকে সপরিবারে বেড়াতে আসা আজিজ উল্লাহ জানালেন, আগে চিড়িয়াখানায় পর্যাপ্ত পশুপাখি ছিল। দিন দিন এদের সংখ্যা কমায় অনেক খাঁচা শূন্য। বর্তমানে বাঘ-সিংহও নেই। বানরের সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে। এটি রক্ষায় কর্তৃপক্ষ এখনই ব্যবস্থা না নিলে এটিকে আর চিড়িয়াখানা হিসেবেই পরিচয় দেওয়া যাবে না। পাবনা থেকে পরিবার নিয়ে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি মানুষের চেয়ে পশুপাখিকে বেশি ভালোবাসি। কিন্তু বদ্ধ খাঁচায় এখানকার পশুপাখিকে যেভাবে অনাহার-অর্ধাহারে রাখা হয়েছে, তা আমি মানতে পারছি না।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিহাব পারভেন অনিকের ভাষায়, ‘চিড়িয়াখানার আগের পরিবেশ নেই। বসার জায়গাগুলোয় প্রেমিক যুগলদের অসামাজিক কার্যকলাপ দেখে মনে হয়েছে, এটি যেন তাদের অভয়ারণ্য। তাই পুরো উদ্যান না ঘুরেই বাবা-মাকে নিয়ে চলে যাচ্ছি।’ বেড়াতে আসা স্থানীয় কলেজের ছাত্র আলমগীর হোসেন জানালেন, চিড়িয়াখানার ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ময়লা আবর্জনা। ফাঁকা জায়গাগুলোও ভরে গেছে বড় বড় ঘাস আর জঙ্গলে। পশুপাখির সংখ্যাও কম। তাই আগের মতো আর ঘন ঘন বেড়াতে আসেন না এখানে।
তবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, আগের চেয়ে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থী বেড়েছে। কারণ হিসেবে তারা জানান, চিড়িয়াখানায় এর আগে কোনো পিকনিক স্পট ছিল না। এখন সেটি চালু করায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে এর ভেতরে নভোথিয়েটার নির্মাণের কাজ চলছে। এটি চালু হলে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। যদিও টিকিট কাউন্টার সূত্রে জানা যায়, সব মিলিয়ে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয় প্রতিদিন। বর্তমানে দর্শনার্থীদের প্রবেশমূল্য ২৫ টাকা।
এ ব্যাপারে রাজশাহী এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ ফরহাদ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা চিড়িয়াখানার অত্যাধুনিকায়নে কাজ করে যাচ্ছি। তবে আমাদের এখানে বেশ কিছু সংকট রয়েছে। এর মধ্যে লোকবল সংকটটা সবচেয়ে বেশি। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সব কাজ একার পক্ষে করা সম্ভব হচ্ছে না। তার পরও সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল দপ্তরের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী আমাদের কাজ চলছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্বভার গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছি। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এটির অধিকতর উন্নয়নে পুরোদমে কাজ শুরু করব। নতুন করে বাজেট হলে আরও নতুন নতুন পশুপাখি কেনা কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করা হবে।’ তবে পশুপাখির বেহাল অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে আমাদের এখানে সুষম খাদ্য তালিকার একটি চার্ট রয়েছে। সেই চার্ট এবং শিডিউল অনুযায়ী প্রত্যেকটি পশুপাখি খাবার পায়। আর খাঁচা যেগুলো আছে যেমনÑ খরগোশের জন্য কোনো খাঁচাই ছিল না। আমরা পশুপাখি যেহেতু নতুন করে কালেকশন করছি, সেজন্য খাঁচার সংকট দেখা দিয়েছিল। আমরা প্রতিটি পশুপাখির জন্য আলাদা খাঁচার ব্যবস্থা করছি। নতুন খাঁচাও তৈরি করা হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখার কারণে চিকিৎসা চলাকালীন তাদের রোগের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। এ ছাড়া কিছু প্রাণী আছে, যেগুলোর গড় আয়ু প্রায় শেষের দিকে। এ জন্য তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। তার পরও আমাদের প্রকৌশলীরা পশুপাখির বসবাসের জন্য যে প্ল্যান করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তাতে এ পরিস্থিতি থেকে পশুপাখিগুলো মুক্তি পাবে। তবে এদের সুস্থতার জন্য আলাদা ভেটেরিনারি বা চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রয়োজন, যা রাজশাহীতে নেই। তবে এগুলো আমাদের মাস্টার প্ল্যানে রয়েছে।’

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top