logo
news image

শ্রীলঙ্কা পারলেও আমরা বন্ধ করতে পারি না কেন?

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।  । 
বাজারে যেতে আমার ভাল না লাগলেও ফিবছর কোরবানীর পশু কিনতে হাটে যেতে আমার বরাবরই ভাল লাগে।  নিজের পছন্দনীয় সুস্থ-সবল সুন্দর পশু কিনে নিজ হাতে কোরবানী দেয়ার কোন বিকল্প নেই।  তাই এটা আমার পছন্দনীয় কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে সংগে থাকতে হবে অনেক সাগরেদ।  এবারও তাই হলো।
তবে বৈরী সাধলো প্রচন্ড রোদ, গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়া।  বাসায় কলো ছাতা নইে, রঙীন ছাতা দেখলে অনেক গরু ক্ষেপে যায়।  তাই কেয়ারটেকার ছেলেটি সংগে ছাতা নিতে দিল না।  আজ রাস্তায় ভীড় হবে জন্যে গাড়ি বের করা হলো না।  সবাই অটোরিক্সায় চেপে হাটে গেলাম।  অনেক ভীড়, গিজ গিজ করা গরু-ছাগল-ক্রেতা-বিক্রেতা ও দাালাল।  মাইকে ঘোষনা করা হচ্ছে- নকল টাকা ও পকেটমার থেকে সাবধান থাকুন। পশুর হাটে সবসময় পকেটমার, অজ্ঞানপার্টি ও ছিনতাইকারী ঘুরঘুর করে। তাই পশু কেনার সব টাকা নিজের কাছে না রেখে সংগীদের নিকট আগেই ভাগ করে দিয়েছিলাম।  একহাঁটু কাদা জমে গেছে পুরো হাটে। তাই প্যান্টের নিচটা গুটিয়ে নিয়ে নিজের পকেটের টাকাগুলো একবার নেড়েচেড়ে দেখেসাবধানে হাটে ঢুকলাম।
হাটে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলো।  রোদে ঘেমে ভিজে গিয়েছি।  সাথে বিড়ি-সিগারেটের গন্ধে মাথা ঘুড়ে বমি হবার উপক্রম হলো। যেদিকে তাকাই, দেখি যেন প্রায় সবার হতে জ্বলন্ত বিড়ি সিগারেট! কোর রকম ভীড় ঠেলে বাইরে আসার চেষ্টা করলাম। হাটের ইজারাদাররা অনেক টেন্ট তৈরী করেছেন।  ক্রয়-বিক্রয়ের ট্যাক্স আদায় করার জন্য।একটিতে মাইকে ঘোষনা হচ্ছে- কেউ বিনা রশিদে হাট থেকে পশু নিয়ে যেতে ধরা পড়লে ছাগলের জন্য দশ হাজার, গরু-মহিষের জন্য বিশ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।মাইক দেখে সেই টেন্টের দিকে অগ্রসর হলাম। সংগীদের একজনকে সাথে নিয়ে বাকীদের বললাম, আমি মাইকের টেন্টে কিছুক্ষণ থাকবো, তোমরা পশু পছন্দ হয়ে গেলে আমাকে ফোন কর। আমার মনে পড়লো ২০০৫ সালের ধূমপান, তামাজাতপণ্য উৎপাদন, বিপণন, ব্যবহার ও  প্রচারণা  আইনের ২ ধারার ই.এফ.জি. ক্লজ অনুযায়ী জনসমাগমপূর্ণজায়গায় (পাবলিক প্লেসে) বিড়ি সিগারেট খাওয়া আইনত: দন্ডনীয়। এই বিষয়টি মাইকে ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করতে বলে আসি।
জনসমুদ্র ঠেলে মাইকওয়ালা ঘোষকের নিকট পৌঁছালাম।  বললাম, এইযে ভাই শুনুন- হাটের ভিতরে এবং প্রতিটি টেন্টের ভিতরে অনেকেই বিড়ি-সিগারেট খাচ্ছে। আমরা গন্ধে টিকতে পারছি না।  পাবলিক প্লেসে বিড়ি সিগারেট খাওয়া আইনত: দন্ডনীয়।  এটা বে-আইনি। মাইকে ঘোষণা দিয়ে মানুষকে নিবৃত্ত থাকতে বলুন।
ঘোষক বেশ সুন্দর গোঁফওয়ালা ও স্বাস্থ্যবান একজন মানুষ।  তিনি আমার কথাটি শুনে কিছুটা অবাক হয়ে কি যেন লুকানোর চেষ্টা করলেন। আমি আবার বললাম। হয়তো বুঝলেন।কিন্তু চোখ বড় করে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।আমি লক্ষ্য করলাম সেখানেও বিড়ির গন্ধ!  ধোঁয়া উড়ছে, দাড়ানো মুষ্কিল তবুও আমি বেশ কিছুক্ষণ সেখানে দাড়িয়ে থাকলাম কিন্তু তিনি কোন ঘোষণা দিলেন না। তার ইতস্ত:তা দেখে আমি এদিক সেদেক তাকিয়ে দেখি প্রায় একগজ সামনে একজন উর্দ্দিপড়া আ্ইন শৃংখলা বাহিনীর লোক একটি প্লাস্টিক চেয়ারে বসে আয়েস করে সিগারেট খাচ্ছেন!তার দু’জন অধস্তন: ও উপস্থিত অন্যেরা তার দেখাদেখি নির্দ্বিধায় তার সাথে ধোঁয়া ফুকাচ্ছে।  জনবহুল জায়গায় বসে গণস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছেন একজন নেমপ্লেট লাগানো উর্দ্দিপড়া জনসেবক! এইতো হলো দেশের আইন! কথায় বলে না-কার গোয়াল কে দেয় ধুয়োঁ ! এবার কা’কে দোষ দিব, কার কাছে অভিযোগ করবো? আমি লজ্জা পেলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। হঠাৎ নিকটস্থ মসজিদ থেকে আসরের নামাজের আজান ভেসে আসতে থাকলো।  সংগী ছেলেটি বলে উঠলো, স্যার কিছু বলার দরকার নেই। চলুন আগে নামাজ পড়ে আসি।  সে রাগে গদগদ করে বলতে থাকলো- একশ্রেনির জীব আছে যাদের লেজ সবসময় কুঁকড়ানো থাকে। হাজার মন ঘি দিয়ে ঘষলেও সোজা করা যায় না।  বিরক্ত ও হতাশ হয়ে হাট থেকে বের হয়ে গেলাম।
গত ১৭ আগস্টে কাঁটাখালী হাটের উক্ত ঘটনাটি মনের মধ্যে গেঁথেই থাকলো।এর মধ্যে গত ২৩.আগস্টের একটি সংবাদ পড়ে চমকে উঠলাম।  শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজিথা সেনেরাত্নের উক্তিকে উদ্ধৃতি দিয়েসিনহুয়া প্রকাশ করেছে যে, শ্রীলঙ্কার ১০০টিরও বেশী শহরে সিগারেট বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে জাফনায় ২২টি, মারায় ১৭টি, কুরিনগালায় ১৬টি শহরে সিগারেট বিক্রি বন্ধ রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন ২০১৯ সালের মধ্যে ২০০টি শহরে সিগারেট বিক্রি বন্ধ করা হবে। কি চমৎকার অভিপ্রায় একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর!
আমাদের দেশে মানুষ বেশী। তাই অল্প জায়গায় অনেকজন একত্রে গাদাগাদি করে বাস করে থাকে।কোন একটি জনবহুল জায়গায় একজনের প্রত্যক্ষ ধুমপানের ফলে সেখানকার সকল মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরোক্ষ ধুমপানের ক্ষতির শিকার হয়। স্টেশনে, ট্রেনে-বাসে, লঞ্চে, হাটে বাজারে, অফিসে একশ্রেণির মানুষ নিত্য প্রকাশ্যেই ধুমপান করতে দ্বিধা করে না।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫-এ জনসমাগমপূর্ণ স্থানে প্রকাশ্যে ধুমপানের ওপর বিধিনিশেষ বলা আছে। ২০০৫ সালের ধূমপান, তামাজাতপণ্য উৎপাদন, বিপণন, ব্যবহার ও  প্রচারণা  আইনের ২ ধারার ই.এফ.জি. ক্লজ অনুযায়ী জনসমাগমপূর্ণ জায়গায় (পাবলিক প্লেসে) বিড়ি সিগারেট খাওয়া আইনত: দন্ডনীয়। এখানে পাবলিক প্লেস বলতে-“যে কোন সরকারী-আধাসরকারী অফিস, হাসপাতাল, ক্লিনিক, কোর্ট, বিমান-নদী-সমুদ্রবন্দর, রেল-বাস-ফেরী যানবাহন, কেনাকাটা করার জায়গা, গণ শৌচাগার, সিনেমা-থিয়েটার হল, শিশুপার্ক, মেলা, লাইব্রেরী এবং সরকারঘোষিত অন্যান্য যে কোন জায়গা বুঝায়।” শপিং এলাকা জনবহুল থাকে। এখানে বিড়ি-সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ ও দন্ডনীয়।  কিন্তু আমার হরদম এর ব্যত্যয় ঘটতে দেখছি।
এছাড়া এ আইনে তামাকের পরিবর্তে বিকল্প ফসল উৎপাদনে সহয়োগিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তামাক চাষীদের তামাকের বিকল্প ফসল উৎপাদন সহযোগীতা প্রদান করা সম্ভব হলে অনেকে তামাক চাষের পরিবর্তে অন্য ফসল উৎপাদনে এগিয়ে আসবে।বাংলাদেশ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ‘ফ্রেমওয়ার্ক ফর টোবাকো কন্ট্রোল কনভেনশন’-এর সদস্য। এ অনুযায়ী বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত “২০৪০ সালের মধ্যে তামাকের ব্যবহার শূণ্যের কোটায় নামিয়ে আনার অনুপ্রেরণা” অনুযায়ী তামাক চাষীদের বিকল্প ফসর চাষে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি তেমন চোখে পড়ে না। এজন্য ন্যাশনাল ট্যোবাকো কন্ট্রোল সেল ২০১৬ (এন.টি.সি.সি) গঠন করা হয়েছিল। এই সেলের উদ্দেশ্য ছিল-তামাক নিয়ন্ত্রণ ও ধুমপান প্রতিরোধের জন্যএমন নীতিমালা তৈরী করা যাতে ধূমপানসৃষ্ট অসংক্রমক রোগসমূহ যেমন- ক্যান্সার, যক্ষা, ফুসফুসের সংক্রমণ, ইত্যাদি থেকে দুরে থাকা যায়। ‘বিশ্ব ফুসফুস ফাউন্ডেশন’-এর তথ্য সম্ভার ‘ট্যেবাকো এটলাস’ অনুযায়ী জানা যায়, বাংলাদেশে চারকোটির অধিক বয়স্করা ছাড়াও প্রতিদিন এক কোটি ৬৪ লক্ষ শিশু ধুমপান করে থাকে এবং তামাকসংশ্লিষ্ট অসুখে প্রতিবছর ৯২,১০০ জন মারা যায়।
অনেকেই তামাক চাষের সমস্যা সম্পর্কে জানেন না ও জানার কোন প্রুকার আগ্রহ প্রকশ করেন না। সেক্ষেত্রে তামাক কোম্পানিগুলি তাদের মুনাফা অর্জন করার জন্য দ্ররিদ্র ও অশিক্ষিত এলাকায়আগাম অর্থলগ্নি করে প্রন্তিক কৃষকদের জমি লীজ নিয়ে তামাক চাষ করে চলেছে। এর ফলেপ্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি সাধন করে জটিল রোগ সৃষ্টিসহ নানা সমস্যা তৈরী করে মৃত্যুরমুখে  ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
অল্প খরচে অধিক লাভের আশায় তামাক চাষীরা তাদের জমিতে তামাক চাষ করছে। এতে আবাদী জমির ক্ষতি হচ্ছে। যে সব জমিতে ইরিধান, গম, সরিষা, ডাল শোভাবর্ধন করতো সেখানে এখন তামাকের সমারোহ। তামাক চাষের জমিতে ব্যাপক পরিমাণ সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছে। এর ফলে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। সাথে সাথে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে ও বিপর্যয় ঘটছে। তামাকে থাকে নিকোটিন নামক বিষ। এ বিষ একই সাথে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।
তামাক চাষের ফলে পারিবেশিক অবক্ষয় ও ভূমির উর্বরতা হ্রাস পাবার সাথে বিড়ি কারখানায় শিশু শ্রম ও শিশু শ্রমিকজনিত সামাজিক ও মানসিকসমস্যার সৃষ্টি হয়।এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের চারটি বিড়ি তৈরীর কারখানায় প্রতিটি ফ্যাক্টরীতে প্রায় ১০০০-১২০০ জন শ্রমিক কাজ করে। এদের মধ্যে প্রায় ৯% শিশু শ্রমিক। বিড়ির ফ্যাক্টরীতে কাজ করতে গিয়ে শিশু শ্রমিকের স্কুলে যাওয়া হয়ে উঠে না। যারা   কাজের ফাঁকে স্কুলে যাবার সুযোগ পায় তাদের মধ্যে হাঁচি-কাশি, জ্বর, বুকেব্যাথা, ক্ষুধামন্দা, পাঠবৈরাগ্য (এটারক্সিয়া) ইত্যাদি উপসর্গ রেগে থাকে। ফলে তাদের পড়াশুনার বিঘিœত হয়।
তামাক চাষ আপাত দৃষ্টিতে লাভজনক মনে হলেও তামাক চাষ ও তামাকজাত পন্য প্রস্তুতকরণও বিপননের স্বাস্থ্যগত সমস্যা প্রকট, তাই তামাক চাষে লাভের চেয়ে ক্ষতির অংকটাই বেশি।বলা হয়-ধূমপানে বিষপান। তবে কেন আমরা বিষের আবাদ করছি আর কেনইবা জেনেশুনে বিষপান করছি? সুস্থ্য মানব সম্পদ গড়তে হলে কঠোরভাবে ধুমপান নিরোধ আইন প্রয়োগ করতে হবে।সেজন্য সেদিনের সেই কোরবানীর পশুরহাটের ন্যাক্কারজনক ঘটনার মত সমাজসেবায় নিয়োজিত সরকারীভাবে উর্দ্দিপরা মানুষগুলোকে আগে ধুমপান ত্যাগ করতে হবে। তা না হলে সাধারণ মানুষষের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিবে কিভাবে? মানুষ সামাজিক ও পারিপাশ্বিক নৈতিকতা শিখবে কার কাছে? এছাড়া সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারীভাবে ১০৭টি শহরে সিগারেট বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করতে পারলেও জনস্বাস্থ্যের কথা ভেবে আমাদের দেশে কেন সেটা করা হচ্ছে না?

*প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান এবং অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, পরিবেশ বিজ্ঞানইনস্টিটিউট, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস)-এর একজন গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top