logo
news image

ইয়াবা ও ‘ইয়াবাই’ বন্ধে হচ্ছে না কোনটাই-কেন?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।  ।  
ইয়াবা সমস্যা এখন প্রতিদিনের জীবন-ঘনিষ্ঠ চলমান সংকটগুলোর মধ্যে একটি মহা-সংকটরূপে আবির্ভূত হয়েছে। এটা এখন প্রতি-সকালের সংবাদের শিরোনাম, ইয়াবা আক্রান্ত মানুষ ও পরিবারগুলোর জন্য প্রতি-দুপুরের দু:শ্চিন্তা, প্রতি-দিনান্তের দু:খ-বেদনা। আমরা সবাই জানি, ইয়াবা একটি ‘ক্রেজি ড্রাগ’। এ মাদকদ্রব্যটি সেবন করলে মানুষের মতিভ্রম ঘটে ও চরম মাতলামী শুরু হয়। এতে নিজের সর্বনাশ ঘটে এবং  পরিবার, সমাজ ও দেশের চরম ক্ষতি সাধিত হয়।
অপরদিকে ‘ইয়াবাই’ একটি জাপানীজ মন্দ বা গালি শব্দ। এ ছাড়া জাপানে ইয়াবাকে বলে ‘কাকুসেইজাই’ সংক্ষেপে ডাকে ‘কাকু’। আর ‘ইয়াবাই’ অর্থ বাজেকিছু বা ‘বিপদ ভয়ঙ্কর’। এই শব্দটিহাল্কা মন্দ থেকে চরম নেতিবাচক সব পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয়। যেমন, বাংলায়- চুপ কর! বেয়াদব কোথাকার। বাক্যটিকে এককথায় ‘ইয়াবাই’ শব্দ দিয়ে বোঝানো যায়। আবার- অন্যায়, অধর্ম, অবিচার, কঠিনকাজ, ভয়ঙ্কর, সামনে মহাবিপদ, ইত্যাদিও ক্ষেত্রেও ‘ইয়াবাই’ শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়। যেমন- দুর্নীতি, ঘুষ-সুদের বিপক্ষে আমারা সবাই সোচ্চার। অথচ, শতকরা পঁচাশি ভাগ মুসলিম-এর এ দেশে ঘুষ-সুদের বিকল্প কীতা কখনই মাথায় নিই না। ঘুষ-সুদ ইত্যাদি নেয়া-দেয়া তো মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ বা হারাম। অথচ, আমরা কুম্ভকর্ণের মত ঘুষ-সুদের চর্চা করছি। এটাকেও ‘ইয়াবাই’ বলা যায়।
ইয়াবা ও ‘ইয়াবাই’ নিয়ে আমরা আজ চরমভাবে বিব্রত। এ দু’টো প্রত্যয়একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে। সাধারণত: কোন দেশের জননিরাপত্তা তার মধ্যে বসবাসরত মানুষের স্বা¯হ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা সূচকের সংগে সংযুক্ত থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে ইয়াবা ও ‘ইয়াবাই’ সমস্যা সব ধরনের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।বিশ্বায়নের যুগ পেরিয়ে মানুষ আজ নব্য উদারীকরণের ধারায় উদ্ভাসিত হয়ে অতি আধুনিক জীবনযাত্রার সাথে চলতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে। এক শ্রেণির অতি আধুনিক মানুষ সেই হোঁচটের চোঁট সামাল দিতে না পেরে বেছে নেয় মাদকদ্রব্য।যারা এটা ঘরে বাইরে সেবন করতে অভ্যস্ত, তারা অন্যকে ব্যবহার করতে উৎসাহ দেয়। কারণ, তারা মাদকদ্রব্য আমদানী-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে, এটার ব্যবসা করে। আবার এদের অনেকেই মাদকসঞ্জাত সমস্যা নিরসনে গণমাধ্যমে বসে গলা ফাটিয়ে সাধুগিরি দেখায়! মূলত: এরাই বাংলাদেশে ইয়াবা ও ‘ইয়াবাই’ সমস্যার নেতা-হোতা। এরা ড্রাগ-মাফিয়া, ইসলামের ভাষায় এরাই মুনাফিক ও মুশরিক।“যারা মুশরিক (আল্লাহ পাকের বিদ্রোহী তথা- প্রদর্শিত পথ ছেড়ে উল্টো পথে চলে; যারা মিথ্যা বলে, চুরি, ডাকাতি, জালিায়াতি করে, মানুষ খুন করে-গুম করে, মদ্যপ, জেনা-ধর্ষণ করে); হিংসুক; পিতামাতার অবাধ্য হয়ে তাঁদেরকে কষ্ট দেয়, ওজনে কম দেয়, ইত্যাদি।এরা মন্দমানুষ,এরা প্রতারক, সৃষ্টিকর্তা তথামহাপ্রভু আল্লাহ পাকের সংগে প্রতারণা করে, সম্পদ জমিয়ে রাখে, সুদ খায়। এই দৃষ্টিতে এরা সবাই ‘ইয়াবাই’।”প্রিয় পাঠক, আপনারা বিচার করুন যে-দুনীর্তিতে এখনও প্রথম সারিতে থাকা আমাদের দেশের কতভাগ মানুষ‘ইয়াবাই’!
বর্তমানে ইয়াবা সমস্যা নিরসনের জন্য বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিন হাজারো নিয়ন্ত্রকজন, শত শত আধুনিক যানবাহন নিয়ে বহু অভিযান পরিচালনা করছেন।এসকল অভিযানকে সাধুবাদ জানাই। মাদকবিরোধী এসব অভিযান কিন্তু বহুবিতর্কের সৃষ্টি করে চলেছে। কারণ, মাদকবিরোধী এসব অভিযানেপ্রায়শ: তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ নামক(ওপেন সিক্রেট)সাধারনত: গভীর বা ভোর রাতের যুদ্ধেমানুষের ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে এবং কোন সময় বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হবার আগেও টাকা এবং পরেও টাকা নেয়ার নির্লজ্জ অভিযোগ পওয়া গেছে (প্রথম আলো মে, ২২ ২০১৮ ও নতুন প্রভাত, মে ২৪, ২০১৮)। প্রফেসর আলী রিয়াজ তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন, নির্বিচার বন্দুকযুদ্ধ ২০১৬ সালে ফিলিপাইনে কোন ফল দেয়নি, এখন বাংলাদেশেও কোন ফল দেবে না। এটা বাংলাদেশে আরো বেশী সামাজিক বৈরীতা সৃষ্টি করবেও সামাজিক ও পারিবারিক ভাঙ্গন ত্বরান্বিত করবে।
প্রশ্ন হ’লো- মাদকবিরোধী এসব অভিযান চলা সত্ত্বেওইয়াবা ও ‘ইয়াবাই’ কোনটাই বন্ধ হচ্ছে না-কেন?  আরো কিছু কৌতুহল জাতির মধ্যেপ্রতিনিয়ত নানা প্রশ্নের উদ্রেক করেই চলেছে!
একটি দৈনিকে লিখেছে- হাত বাড়ালেই যত্রতত্র কেন ইয়াবা পাওয়া যায়? কেনই বা আসক্তের সংখ্যাও বাড়ছে? দেশের মোট ইয়াবার পঞ্চাশভাগ নাকি ঢাকার বাজারে বিক্রি হয় (প্রাগুক্ত; মে ২২, ২০১৮)। তাহলে কি খোদ ঢাকা শহরেই ৫০ ভাগ ইয়াবাসেবী আছে? এটা অত্যাশ্চর্য্য বিষয় নয় কী? তাহলে মসজিদের শহর নামে খ্যাত এই রাজধানী শহরের মানুষগুলোর কি হতাশা ও মানসিক কষ্ট খুব বেশী? নাকিঅভাব-অনটন বা অতি লোভ নামক কোন মামদো ভুত- পিশাচ বা ডাইনীর আঁচড়ে চারিত্রিক অবনমন হয়েছে?
ঢাকা শহরে মাছের গাড়িতে ইয়াবা পাচার হয়ে ঢুকে পড়ছে (প্রাগুক্ত; জুন ০৫, ২০১৮)!ঢাকার মানুষের মধ্যে কি মাছের রুচি কমে গেছে বা নেই? মাছ দেখলে কি বমি আসে? নাকিইয়াবাতে রুচি ধরে গেছে? আমার অসংখ্য নিকটাত্মীয়, বন্ধুরা ঢাকায় বাস করেন। ভয়ংকর এ তথ্য শুধু আমাকে নয় গোটা জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে।কারণ শিল্প বিপ্লবের পর পর শিল্পদূষণ ও মাদকের অপব্যবহারের ফলে ইউরোপের অনেক নামকরা শহরে মহামারীর ফলে জনশুণ্যতা সৃষ্টি ও শহর ফেলে অন্যত্র পালিয়ে যাবার চরম ঐতিহাসিক সত্যঘটনারকথা আমরা অনেকে জানি।
আরো জানা গেল- দেশে কোন কারখানায় ইয়াবা বা ফেন্সিডিল তৈরী হয় না(প্রাগুক্ত; মে ২২,২০১৮)। ইয়াবা বা ফেন্সিডিল দেশের বাইরে থেকে আসে। কক্সবাজারে স্থল ও জলপথে ঢুকছে ইয়াবা।এই অনুপ্রবেশের কায়দা-কৌশল বহুমুখী। আইন-শৃংখলা বাহিনীর কঠোর পাহারার মধ্যেও পায়ুপথে, শরীরের চামড়া কেটে ভেতরে ঢুকিয়ে, ক্ষতস্থানের ব্যন্ডেজে লুকিয়ে, নারীর গোপনাঙ্গে, মাছ ও গৃহপালিত পশুপাখির পেটে, ক্রিকেটের ব্যাটে, ফুটবলে, আম, কাঁঠাল, কুমড়া, তরমুজ, পিঁয়াজ, সুপারি, ইত্যাদিতে ঢুকিয়ে ও যানবহনে লুকিয়ে নানা কায়দায় পাচারকারীরা সারাদেশে ইয়াবা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সদা সক্রিয় ভুমিকা পালন করে চলেছে(প্রাগুক্ত; জুন ২৫, ২০১৮)।অভিযানের ফলে কিছু কিছু মাদক ধরা পড়ে। তবে সিংহভাগই অধরা থেকে যায় ও নানাভাবে পাচারকারী নিয়োজিত দালালদের মাধ্যমে সেবনকারীদের দোরগোড়ায় পৌঁছিয়ে দেয়া হয়। এসব দালালকে কারা প্রশ্রয় দেয়? মূল হোতা ও দালালকে আড়াল  রে প্রতিদিন ফেন্সিডিলের ভরা বোতল বুলডোজার দিয়ে ভাঙ্গা হয় কেন? জ্যান্ত ইয়াবা বড়ির কবর দেয়ার দরকার কী?দরকার হলো- দালালসহ এসব জ্যান্ত ইয়াবা বড়ির জন্ম দিল কে বা দিয়ে চলেছে কে তা জানা।জন্মের পূর্বে  সতর্ক হলেই তো এসব লোক দেখানো কবর ও জানাজার দরকার পড়ে না!কবর দেয়ার আগে জন্ম না দেয়ার শপথ নিলেই তো বেশ হয়- যে আর সীমান্ত পথে এই জ্যান্ত ইয়াবা-মুর্দা ইয়াবাকে ঢুকতে দেয়া হবে না, অথবা যারা পুনরায় ঢুকতে দিতে সহায়তা করবে তাদের মাটিচাপা দেয়া হবে। সীমান্তের পাহারাদারগণ রাত-দিন সদা জাগ্রত থাকতে ইয়াবাকে কোন পথে কার ইশারায়দেশে ঢুকতে অনুমতি দেয়া হয়? সেটা জানা আজ জরুরী হয়ে পড়েছে।বিজ্ঞ গোয়েন্দা সদস্যরা তা কি জানেন না?
অপরদিকে আমাদেরকে আহত করে- যখন শুনি খোদ মাদকদ্রব্য নির্মূল করার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই এসব কাজে জড়িত হন!  একসংগে বাহাত্তর জন মাদক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থাই বা কেন নিতে হয়? (প্রাগুক্ত; মে ২২, ২০১৮)। তাহলে দেশকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাবে কে বা কারা?
সীমান্তের ‘মাছিরী’ দিনে ও ‘মশারী’ রাতে ভালভাবে গুঁজে রাখার দায়িত্ব কার? ইয়াবা ও ফেন্সিডিল নামক মশা-মাছিগুলোর হুল কি তবে খুব বেশী ধারালো? এ বিষাক্ত হুলের হাত থেকে জনগণ তথা দেশকে বাঁচাবে কে বা কারা?
বর্তমানে আমাদেরদেশের অর্থনীতিতেকিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হলেও পারিবারিক, সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থার একটা অস্থির ট্রানজিশন চলছে। এর ফলে উচ্চবিত্ত ও উচ্চমার্গের অপরাধীরাআমাদের দেশে বুক ফুলিয়ে চলার দু:সাহস দেখায়। এরা শাসন ও আইন মানে না, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, খারাপ কাজে ষৃণা ও লজ্জা পায়না, ইহকাল-পরকাল কোন কিছুকেই ভয় পায় না।শহরাঞ্চলের উচ্চবিত্ত মানুষগুলোরও সময় নেই পরিবার ও পরিবেশকে নিয়ে গঠনমূলক চিন্তা করার। যেন,‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ অবস্থা। তাঁদের আদরের সন্তানরা কোথায় যায়, কি খায়, কার সংগে চলাফেরা করে কোন কিছুরই খোঁজ নেয়ার ফুরসৎ পান না এক শ্রেণির বাবা মা। বাবা মা- রা কত আয় করেন, সন্তান তা জানে না, স্বামীর আয়-ব্যয় স্ত্রী জানেন না। সর্ম্পকের টানাপোড়ন আজ শহুরে জীবন-যাপনের সাথী। জীবনের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্নার ভাগাভাগি হয়ে ওঠে না, কখনও হলেও তা ইতিবাচকভাবে হয় না। এই ফাঁকে আদরের সন্তান বিরক্ত হয়ে একদিন বখে যায় ও মাদকের পথ বেছে নেয়।আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আজইএ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।
তাই মাদক নির্মূলে বন্দুক যুদ্ধ কোন সমাধান নয়, সীমান্তের ‘মাছিরী’ দিনে ও ‘মশারী’রাতে ভালভাবে গুঁজে রাখুন, এ ব্যাপারে কঠোর হোন। পরিবারের যতœ নিন ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সকল স্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে ‘মাদকের বিরুদ্ধে মন’ তৈরীর কাজে সবাই আজই নেমে পড়–ন।
*প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান এবং  সামাজিক বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদ এবং ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস)-এর একজন গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top